২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রয়োজন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ

  • এমদাদ হোসেন মালেক

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৫-এর তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে (ফেব্রুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত) সার্বিকভাবে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.৪৩ লাখ মেট্রিক টন। এ সময়ে বেসরকারী খাতে খাদ্যশস্যের আমদানির পরিমাণ ২৭.৭১ লাখ মেট্রিক টন। সমীক্ষার তথ্য মতে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২৫ হাজার মেট্রিক টন মোটা চাল শ্রীলঙ্কায় রফতানি করা হয়েছে। আমদানি-রফতানির যোগ-বিয়োগ হিসাব কষলে দেখা যাবে, দেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার দাবির পরও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২৮.১৮ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হয়েছে। সম্প্রতি দেশের প্রভাবশালী একটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘১৯৭১-২০১৫ পর্যন্ত ৪৪ বছরে দেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ এবং এ সময়ে আবাদি জমির পরিমাণ ১৮ শতাংশ কমে গেছে। ষোলো কোটি মানুষের দেশে মোট কৃষি-অকৃষি মিলে জমির পরিমাণ মাত্র তিন কোটি ৩৮ লাখ ৩৪ হাজার একর। এরমধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দুই কোটি এক লাখ ৫৭ হাজার একর।

বর্তমানে মাথাপিছু জমির পরিমাণ .২০ শতাংশেরও কম, যা ১৯৬৯ সালে ছিল .৪১ শতাংশ।’ ১৯৬৯ সালে আমাদের দেশে জনসংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি আট লাখ, ২০১৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৬২ লাখ। এ হিসাবে গত ৪৬ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২.২৭ গুণ। গড়ে প্রতিবছর বেড়েছে ২৫ লাখ আট হাজার ৬শ’ ৯৬ জন। জনসংখ্যা বিষয়ে অন্য এক তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা বর্তমান হারে বাড়তে থাকলে দ্বিগুণ হবেই অর্থাৎ ৩২ কোটিতে পৌঁছাবে। পরিণতি কি ভয়াবহ!

জনসংখ্যা ও খাদ্যশস্য বৃদ্ধির বর্তমান গতিবিধির সার্বিক পর্যালোচনা করলে যে কোন বিবেকবান মানুষই শিউরে উঠবেন। কারণ আগামী ১০ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হলে এ বর্ধিত মানুষের খাদ্য চাহিদা কী করে আমাদের আবাদযোগ্য দুই কোটি এক লাখ ৫৭ হাজার একর জমিতে সংস্থান হবে। বিশেষজ্ঞদের হিসাবমতে, প্রতিবছর আবাদযোগ্য জমি থেকে যদি ১ শতাংশ হারে জমি কমে যায় তাহলে ১০ বছরে আবাদি জমি ১০ শতাংশ কমে দাঁড়াবে এক কোটি ৮১ লাখ ৪১ হাজার ৩শ’ একর। জমি কমবে, মানুষ বাড়বে দ্বিগুণ! এমনতর পরিস্থিতিতে খাদ্যশস্য আগামী ১০ বছরে কতটা বাড়ানো সম্ভব তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।

পঞ্চাশের দশকে দেশের বেশিরভাগ ফসলের চাষ হতো স্থানীয় জাত দিয়ে। ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের নামে উন্নত জাতের ধানের চাষ শুরু হয়। উফশী জাতের ধানচাষ, রাসায়নিক সার, কৃত্রিম সেচ ও কীটনাশকনির্ভর হয়ে পড়ায় ধানচাষের খরচের পরিমাণ বেড়ে গেছে। উফশী ধানচাষ বাড়ার সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অনেকগুণ বেড়েছে। রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ জমিতে জৈব উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কমে গেছে। সুষম স্বাস্থ্যের মাটিতে ৪ শতাংশ জৈব উপাদান থাকার কথা। ৬০ শতাংশ জমিতে ১ শতাংশ হারে জৈব উপাদান কমে গেছে। বাংলাদেশ একাডেমি অব এ্যাগ্রিকালচারের সাধারণ সম্পাদক গুল হাসানের মতে, মাটিতে জৈব উপাদান কমে যাওয়ায় তা আঠালো অথবা বালু হয়ে যাচ্ছে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে জমিতে সেচ বেশি দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ায় ফসলের উৎপাদন খরচ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ০.০৫ হেক্টর।

সম্প্রতি কৃষি উপযোগী বেশিরভাগ জমিতে উফশী জাতের ধানচাষ করায় ফসলের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। ফসল উৎপাদন একমুখী হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য সকল পণ্যের আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। এতে করে ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনা-কাঁচা মরিচ, হলুদ, জিরা, তেল, দুধ, আম-জাম, আপেল, কমলা, আঙ্গুর, বেদানাসহ বিভিন্ন খাদ্য ও মসলাজাতীয় পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৫ হিসাবমতে, দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১০৩৫ জন। জনসংখ্যার এতবড় চাপ কমিয়ে আনার কার্যকর কর্মপ্রচেষ্টা ছাড়া এত ছোট ভূমিতে অধিক খাদ্যপণ্য উৎপাদন কতটা বাস্তবসম্মত ও টেকসই হবে সে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখার দাবি রাখে।

একটা সময় বাড়ি-বাড়ি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরা উপস্থিত হয়ে পরিবার ছোট রাখা ও জš§ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কর্মতৎপর ছিলেন। আজকাল এ চিত্র অহরহ দেখা যায় না। এটা কেন ঝিমিয়ে পড়ল তা বুঝতে না পারলেও জন্মহার কী পরিমাণ বাড়ছে তা বুঝতে অঙ্ক কষার দরকার হয় না। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে অধিক জনসংখ্যা কেবল পুঁজিপতি ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতিকদের পুঁজি ও শক্তি বৃদ্ধি করে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৯৪ লাখ। জনসংখ্যা ক্রমান্বরে লাফিয়ে বাড়ার প্রবণতার বিষয়টি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার তিন বছরের মাথায় বুঝতে পেরেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের দেশে প্রত্যেক বছর ৩০ লাখ লোক বাড়ে তাহলে ২৫-৩০ বছরে বাংলার কোন জমি থাকবে না হালচাষ করার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সেজন্য আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল করতে হবে। ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুর জনসংখ্যা বিষয়ক ধারণা আমরা বর্তমান সময়ে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কিন্তু তাঁর নির্দেশনা সত্ত্বেও বাংলাদেশে জনসংখ্যা পরিস্থিতি সহনীয় মাত্রা অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আজ অবধি আমরা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছি না।

দেশময় ধানচাষের বিপ্লব সৃষ্টির পাশাপাশি জনসংখ্যার বিস্ফোরণ রোধে ব্যাপক জনসচেতনামূলক কার্যক্রম হাতে নেয়া একান্ত আবশ্যক। জনসংখ্যার বর্তমান ধারা রোধ না করে শুধু খাদ্য উৎপাদনের চেষ্টা ভেস্তে যাবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যপণ্য বাড়ানোর গতি বৃদ্ধিকে সরকারের সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। তবে অন্য দশটি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে খাদ্যপণ্যের বহুমাত্রিক উৎপাদনে যেমনি গুরুত্বারোপ জরুরী, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন জনসংখ্যার বর্তমান ধারা রোধে কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নেয়া।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কনজ্যুমার্স ফোরাম

consumers_foram@yahoo.com