২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফাঁসির দড়িতে ॥ দুই শীর্ষ নরঘাতক সাকা-মুজাহিদ

  • দম্ভ ভরা সাকা, মুজাহিদের শেষ পর্যন্ত প্রাণভিক্ষা;###;রাষ্ট্রপতির নাকচ;###;শুধু জাতি কলঙ্কমুক্ত নয়, যুদ্ধাপরাধীদের প্রাণভিক্ষা প্রামাণ করল এতদিন তারা মিথ্যা বলেছে

গাফফার খান চৌধুরী/মশিউর রহমান খান/আরাফাত মুন্না ॥ ৩০ লাখ শহীদ আর সাড়ে ছয় লাখ মা-বোনের আব্রুর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছরের প্রতীক্ষার পর আরও দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হলো। কুখ্যাত মানবতাবিরোধী অপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদকে ঝোলানো হলো ফাঁসির দড়িতে। গত চারদিনের নানা নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে শনিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে একমঞ্চে দুই শীর্ষ মানবতাবিরোধীর মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনীকে যে ফাঁসির মধ্যে ঝোলানো হয়েছিল, সেই একই মঞ্চে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয় সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদকে।

মৃত্যুদ- কার্যকরের পর এ্যাম্বুলেন্সে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর করা পাহারায় সাকা চৌধুরীর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের রাউজানের উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে, মুজাহিদের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। রাত একটা ৫০ মিনিটের দিকে সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির সাংবাদিকদের বলেন, রাত বারোটা ৫৫ মিনিটে একই সঙ্গে দু’জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অনেকেই বিভিন্ন সময়ের কথা বলছেন কিন্তু সময়টা হলো রাত বারোটা ৫৫ মিনিট বলে তিনি জানান। পরে রাত দুটা ৫১ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের লাশবাহী চারটি এ্যাম্বুলেন্স ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হয়। এ সময় কারাগারের সামনে উপস্থিত জনতা সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সে জুতা ছুড়ে মারে। পরে দুটি এ্যাম্বুলেন্স মুজাহিদকে নিয়ে রওনা হয় ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। অন্য দুটি রওনা হয় চট্টগ্রামের রাউজানের উদ্দেশ্যে সাকা চৌধুরীর লাশ নিয়ে। আজ রবিবার লাশ পৌঁছার পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় লাশ দাফন করা হবে বলে জানা গেছে। যদিও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এই দুই যুদ্ধাপরাধীর লাশ ফরিদপুর ও রাউজানে প্রবেশ করতে দেবে না বলেই জানিয়ে আসছিলেন।

এর আগে শনিবার সকালে দুই ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যাওয়ার পর নিজেদের দোষ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষার আবেদন করে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে কারাকর্তৃপক্ষ ওই মার্সি পিটিশন দুটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের মতামতসহ আবেদন দুটি পাঠায় আইন মন্ত্রণালয়ে। আইন মন্ত্রণালয় নিজেদের মতমত দিয়ে সাকা-মুজাহিদের প্রাণভিক্ষার দুটি আবেদন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠায়। পরে সাকা চৌধুরী এবং মুজাহিদ প্রাণভিক্ষা চেয়ে যে আবেদন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে তা নাকচ করে দিয়েছেন।

শনিবার রাত দশটার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কারাকর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনা সাবেক এই দুই মন্ত্রীর প্রাণভিক্ষার আবেদন নিয়ে আইন সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিব এক ঘণ্টা বঙ্গভবনে ছিলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী সাবেক এই দুই মন্ত্রীর আইনী লড়াই চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর তাদের শেষ সুযোগ ছিল দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া। তাদের এই আবেদনও নাকচ হওয়ায় পরই ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করে কারাকর্তৃপক্ষ। এর আগে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের সঙ্গে শেষ দেখা করেছেন সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের পরিবার।

গত বুধবার সুপ্রীমকোর্ট এই দুই যুদ্ধাপরাধীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে। এর পরই প্রাণভিক্ষা নিয়ে দুই যুদ্ধাপরাধী পরিবার নানা নাটকের জন্ম দিতে থাকে। ফাঁসিতে ঝোলার আগ মুহূর্তে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ নিজেদের দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করে নতুন নাটকের জন্ম দেন। সাকা-মুজাহিদ প্রাণভিক্ষার আবেদন করলেও তাদের পরিবার ও দলের (বিএনপি ও জামায়াত) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা প্রাণভিক্ষা চাননি। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ বিষয়ে বলেছেন, তারা প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছেন। যদি সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের অধীনে এই আবেদন না করা হতো তাহলে আবেদন দুটি বিবেচনার কোন কারণই থাকত না। প্রাণভিক্ষা না চাওয়ার যে দাবি নতুন করে করা হচ্ছে তা নিহায়ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করার, মন্তব্য আইনমন্ত্রীর।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে সুপ্রীমকোর্ট থেকে রিভিউ খারিজের রায় পাওয়ার পর তা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ। রায় হাতে পাওয়ার পর রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ইংরেজী থেকে বাংলা অনুবাদ করে পড়ে শোনানো হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা দেশের দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে। বৃহস্পতিবার দুই যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের সদস্যরাই সাক্ষাত করেছেন সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের সঙ্গে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে তিন দফা প্রাণভিক্ষার বিষয়টি জানতে চাওয়ার পরও স্পষ্ট করে কোন উত্তর দেয়নি এই যুদ্ধাপরাধীরা।

বৃহস্পতিবার থেকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। শনিবার সকাল থেকে জোরদার করা হতে থাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকার নিরাপত্তা। সন্ধ্যা নামতেই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয় কারাগার এলাকায়। নেয়া হয় তিনস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এদিকে, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাত সাড়ে তিনটার দিকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা আহসান হাবিব রাজবাড়ী থেকে জানান, মুজাহিদের লাশ গ্রহণের জন্য পাটুরিয়া ফেরিঘাটে অবস্থান করছিলেন রাজবাড়ী জেলার পুলিশ সুপার জিয়াদুল কবির, রাজবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ ঘোষ, জেলার এনডিসি মাহবুবুল আলমসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

যেভাবে ফাঁসি সাকা-মুজাহিদের ॥ কারাসূত্র জানায়, ফাঁসি দেয়ার আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের রজনীগন্ধা সেলের পাশাপশি দুইটি কনডেম সেলে রাখা হয়েছিল তাদের। একে একে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদকে গোসল করানোর জন্য কারাগারে নিয়োজিত রক্ষীরা কনডেম সেলে যায়। তাদের যাওয়া দেখে চমকে ওঠেন সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ। চরম আপত্তির পরও এক পর্যায়ে তারা জীবনের শেষ গোসল করতে বাধ্য হয়। গোসল শেষে তাদের আবার নিয়ে যাওয়া হয় কনডেম সেলে। এর পর যথারীতি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মনির হোসেন তাদের সেলে হাজির হন। তিনি তাদের একে একে তওবা পড়ান। এ সময় ইমাম প্রত্যেককেই বলেন, আজ আপনার শেষ রাত। এখন আপনাকে তওবা পড়তে হবে। আপনার কৃতকর্মের জন্য আদালত আপনাকে ফাঁসির রায় দিয়েছেন। আপনি একজন মুসলমান ব্যক্তি। এ কারণে আপনি আল্লাহর এই দুনিয়ায় কৃতকর্মের জন্য তওবা করেন। তওবা পড়ার সময় পেশ ইমামের হাত চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তারা। তওবা পড়ার কিছুক্ষণ পর দুই কনডেম সেলেই হাজির হন জল্লাদরা। জল্লাদদের দেখেই কারাগারের দেয়াল এবং সামনের দরজা ভেঙ্গে বের হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেন তারা। এর পর জল্লাদরা সেলের দরজা খুলে তাদেরকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তারা ফাঁসির মঞ্চে না যেতে কাকুতিমিনতি করতে থাকে। সেলের ভেতরে তারা উন্মাদের মতো জল্লাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে লিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে জল্লাদরা তাদের দুই হাত পিছমোরা করে বেঁধে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় পরিয়ে দেয় সেই যমটুপি (কালো রঙের একটি বিশেষ টুপি)। এর পর অনেকটা টেনেহিঁচড়েই তাদেরকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়। মঞ্চে তোলার পর কাঠের পাটাতনের ওপর দাঁড় করিয়ে তাদের দুই পা বাঁধা হয়। একই মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড় করানো হয় দুই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে। পরানো হয় ফাঁসির দড়ি। কারা কর্তৃপক্ষের দুই জনের হাতে ছিল দুটি রুমাল। রুমালটি হাত থেকে নিচে ফেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের লিভারে টান দেন। লিভারটি টান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঝুলে যান সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ। এতে মুহূর্তের মধ্যেই তাদের ঘাড়ের হাড় ভেঙ্গে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। মত্যৃ নিশ্চিত হলে শাল নামিয়ে এনে হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়। এর পর গরম পানিতে গোসল করানো হয় সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের লাশ। গোসল শেষে কাফন পরিয়ে কফিনে করে এ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। আগে থেকেই মঞ্চের পাশে রাখা ছিল মরদেহ বহনের জন্য কফিন ও এ্যাম্বুলেন্স।

এ সময় ফাঁসির মঞ্চের সামনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলার ডিসি তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন আব্দুল মালেক মৃধা, দুই ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান ও তানভির আহমেদ আজিম, অতিরিক্ত কারা মহা-পরিদর্শক কর্নেল ফজলুল কবির, ডিআইজি (প্রিজন্স) গোলাম হায়দার, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আছাদুজ্জামান মিয়ার প্রতিনিধি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম, পুলিশের লালবাগ জোনের উপকমিশনার মফিজ উদ্দিন আহাম্মেদ, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেলসুপার জাহাঙ্গীর কবির, জেলার নাসের মোল্লা, ছয় ডেপুটি জেলার এবং বারো সশস্ত্র কারারক্ষী। তাদের তদারকিতেই ফাঁসি কার্যকর হয়।

দুই পরিবারের শেষ দেখা

সাকা চৌধুরী: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তোড়জোড়ের মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করে যান এই দুই যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের সদস্যরা। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দুই পরিবারকে কারাকর্তৃপক্ষ সাক্ষাতের জন্য আহ্বান করে। কারাকর্তৃপক্ষ ডাকার পর সালাউদ্দিন কাদেরের পরিবারের সদস্যরা রাত ৯টায় কয়েকটি গাড়িতে করে কারাফটকে পৌঁছান। স্ত্রী, দুই ছেলে, মেয়েসহ পরিবারের ১৮ সদস্য ঢোকেন কারাগারের ভেতরে।

পৌনে এগারোটার দিকে দেখা করে বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সালাউদ্দিন কাদেরের ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি কি মার্সি পিটিশন করেছ? তিনি বলেছেন, এরকম বাজে কথা কে বলেছে? তখন আমি তাকে বলি, সরকার থেকে এটা বলা হয়েছে, জেল গেট থেকেও কাগজ গেছে। শুনে তিনি বলেন, তোমরা দেখ, এই সরকারের আমলে কত ধরনের কাগজই না বের হবে।

মুজাহিদ: মুজাহিদের পরিবারের সদস্যরা রাত সোয়া নয়টার দিকে কারাফটকে পৌঁছান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা কারাফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। তবে তারা দেখা করার সুযোগ পান সালাউদ্দিন কাদেরের স্বজনরা বেরিয়ে আসার পর। মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুরসহ ২৫ জন ভেতরে ঢোকেন। তারা বেরিয়ে আসেন রাত সোয়া বারোটার দিকে। মাবরুরও দাবি করেন, তার বাবা ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেননি।

রুদ্ধশ্বাস দিন

মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) করতে যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোঃ মুজাহিদের আবেদন খারিজের পর তাদের সুযোগ ছিল শুধু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার। বুধবার রিভিউ খারিজের পর বৃহস্পতিবার রায় পৌঁছায় কারাগারে। মাঝে একদিন আলোচনা চললেও কোন দণ্ড কার্যকরের বিষয়ে কোন অগ্রগতি আসেনি। শনিবার সকাল থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নিরাপত্তা জোরদারের পরও ঘটনাপ্রবাহ বেশিদূর গড়াচ্ছিল না। দুপুরের পরই ঘটতে থাকে একটির পর একটি ঘটনা। দুই যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের সংবাদ সম্মেলন, ক্ষমা চাওয়ার কথা আইনমন্ত্রীর জানানো, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ তাদের পরিবারের, ক্ষমার আবেদন নাকচÑ সবই ঘটে যায় দ্রুত।

সকাল ৯টা: আগের দিনের তুলনায় কড়াকড়ি বাড়ে নাজিমউদ্দিন রোডে কারাফটকের সামনে। ঢুকতে গেলে তল্লাশির মুখে পড়তে হয় সবাইকে। সকাল ১০টা: কারাগারে ঢোকেন ঢাকা জেলা প্রশাসনের দুজন ম্যাজিস্ট্রেট।

বেলা ১২টা: গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন সালাউদ্দিন কাদেরের স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী ও ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী। যুদ্ধাপরাধের ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিচারে সালাউদ্দিন কাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে অভিযোগ জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান তারা। ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে হুম্মাম বলেন, এই সিদ্ধান্ত তার বাবাই নেবেন।

বেলা ১২টা ১৫ মিনিট: সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন মুজাহিদের স্ত্রী ও সন্তানরা। শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখতে রাষ্ট্রপতির প্রতি আবেদন জানায় তারা। ক্ষমা চাওয়ার বিষয়েও স্পষ্ট কিছু বলেননি তারা।

দুপুর ১টা: এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সব বিষয় নিষ্পত্তি হওয়ার পর এখন বিভ্রান্তি তৈরি করতে দুই যুদ্ধাপরাধীর পরিবার রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনের কথা বলছে। এখন মার্সি পিটিশন ছাড়া আর কোন সুযোগ নেই।

বেলা ২টা: সালাউদ্দিন কাদের ও মুজাহিদ ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন বলে কারা সূত্র জানায়। বেলা ২টা ১৫ মিনিট: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তার কাছে এই বিষয়ে কোন ‘মেসেজ’ নেই। বেলা ২টা ৩০ মিনিট: আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, সালাউদ্দিন কাদের ও মুজাহিদ ক্ষমা চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন। ২টা ৩৫ মিনিট: কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ডেপুটি জেলার সর্বোত্তম দেওয়ানকে একটি রেজিস্ট্রার খাতা নিয়ে বের হতে দেখা যায়। কিসের ফাইল, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে মুখ খোলেননি তিনি। খাতাটির ওপর লেখা ছিল ‘গুরুত্বপূর্ণ পত্রাদি’। বেলা ২টা ৫৪ মিনিট: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ওই ফাইল নিয়ে পৌঁছেন ডেপুটি জেলার। তিনি স্বরাষ্ট্র সচিবের কক্ষে ছিলেন কিছুক্ষণ। বিকেল সাড়ে ৩টা: কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন দুই ম্যাজিস্ট্রেট। তবে তারা সাংবাদিকদের সামনে মুখ খোলেননি। বিকেল ৪টা: মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর বলেন, তার বাবা ক্ষমা চেয়েছেন এটা তার বিশ্বাস হচ্ছে না। একই সময় জামায়াতে ইসলামীর এক বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, মুজাহিদের প্রাণভিক্ষার আবেদনের খবরটি ‘সম্পূর্ণ অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’।

বিকেল সোয়া ৪টা: কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকার নিরাপত্তা সকালের তুলনায় বাড়ানো হয়। র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে কারাফটকের সামনে অবস্থান নেয় আর্মড পুলিশও। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট: আবেদন পৌঁছে দিতে বঙ্গভবনে যান সালাউদ্দিন কাদেরের স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী ও ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তবে চিঠি না নিয়ে তাদের জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই চিঠি দিতে হবে। বিকেল ৫টা: ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের সামনে সালাউদ্দিন কাদেরের ছেলে ফাইয়াজ কাদের চৌধুরী বলেন, ক্ষমা চেয়ে তার বাবা আবেদন করেছেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে তাদের। একটু পর হুম্মামও সেখানে আসেন, দুই জনই চলে যান।

সন্ধ্যা ৭টা: রাজধানীতে ২০ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে নামে ১০ প্ল্যাটুন এবং কক্সবাজারে নামে ৫ প্লাটুন বিজিবি সদস্য।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা: গুলশানের বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, প্রাণভিক্ষার নথি তিনি হাতে পেয়েছেন এবং নিজের মতামত দিয়েছেন। রাত ৭টা ৫৫ মিনিট: কারাগারের ভেতরে ঢোকেন অতিরিক্ত আইজি (প্রিজন্স) কর্নেল ফজলুল কবির। রাত ৮টা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে প্রাণভিক্ষার আবেদন বঙ্গভবনে পৌঁছায়। রাত সাড়ে ৮টা: কারাকর্তৃপক্ষ পরিবারের সদস্যদের ডেকেছে বলে জানান মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর। সালাউদ্দিন কাদেরের আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান আলফে সানীও একই কথা জানান। রাত ৯টা : কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছান সালাউদ্দিন কাদেরের পরিবারের সদস্যরা। রাত ৯টা ১৯ মিনিট: কারাগারের ফটকে পৌঁছান মুজাহিদের পরিবারের সদস্যরা।

রাত সাড়ে ৯টা: প্রাণভিক্ষার আবেদনে রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের মতামত নিয়ে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে যান আইন সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিব। সূত্র জানিয়েছে, প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হয়েছে। রাত ১০টা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আর বাধা নেই। রাত ১০টা ১৮ মিনিট: কারাগারের ভেতরে ঢোকেন আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন ও ঢাকার জেলা প্রশাসক। এর পর পরই কারাগারে প্রবেশ শুরু করেন ফাঁসি সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তারা। রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে একইসঙ্গে পৃথক দুই মঞ্চে ফাঁসি কার্যকর করা হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের।

দুই যুদ্ধাপরাধীর বিচার

মুজাহিদ ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম অভিযোগে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণের পর হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ওই দ- কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়েছিল। একই রায় এসেছিল সপ্তম অভিযোগে ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায়।

চূড়ান্ত রায়ে চলতি বছরের ১৬ জুন আপীল বিভাগ মুজাহিদের আপীল আংশিক মঞ্জুর করে প্রথম অভিযোগে আসামিকে খালাস দেয়া হয়। সপ্তম অভিযোগে তার সাজা কমিয়ে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদ-। আর ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে মুজাহিদের ফাঁসির আদেশ দেয় সুপ্রীমকোর্ট। তবে রিভিউ শুনানিতে মুজাহিদের আইনজীবী শুধু মৃত্যুদ-ের সাজা নিয়েই কথা বলেছেন। এটি আইনসম্মতভাবে হয়নি দাবি করে তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন মুজাহিদের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।

সাকা চৌধুরী ॥ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরীর রায় এসেছিল ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর। সেখানে প্রসিকিউশনের আনা ২৩টি অভিযোগের মধ্যে নয়টিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এর মধ্যে চার অভিযোগে তার মৃত্যুদ- এবং পাঁচ অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- হয়। এ বছর ২৯ জুলাই সুপ্রীমকোর্ট তার আপীল আংশিক মঞ্জুর করে আটটিতে দ-াদেশ বহাল রাখে, একটিতে সাকা চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়।

৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে চট্টগ্রামের রাউজানে কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ায় হিন্দু বসতিতে গণহত্যা এবং হাটহাজারীর এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ছেলেকে অপহরণ করে খুনের ঘটনায় তার সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখা হয়। ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ২০ বছরের কারাদ- বহাল থাকলেও ৭ নম্বর অভিযোগে ২০ বছরের সাজার ক্ষেত্রে আপীল মঞ্জুর করে তাকে খালাস দেয় আপীল বিভাগ। ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া পাঁচ বছর কারাদ-ের রায় বহাল রাখা হয় চূড়ান্ত রায়ে। সাকা চৌধুরীর দাবি, একাত্তরে ২৯ মার্চ তিনি ঢাকা ছেড়ে করাচী চলে যান আর ফেরেন ১৯৭৪ সালে। আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্লি অব এ্যালিবাই’। অর্থাৎ, অপরাধ সংগঠনের সময় ও স্থানে আসামির উপস্থিত না থাকা। রিভিউ আবেদনের শুনানিতে তার আইনজীবী তেমনই দাবি করে আসছিলেন। এ জন্য পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে আনা একটি সার্টিফিকেট তারা আদালতে তুলে ধরেন। তবে ওই সার্টিফিকেট ভুয়া প্রমাণ হওয়ায় আদালত তা গ্রহণ করেনি।