২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে দলগুলোই অপ্রস্তুত’

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কিন্তু আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনেই এমন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে খোদ রাজনৈতিক দলগুলোর যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে কি না- সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর গঠণতন্ত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে কিছু উল্লেখ নেই। পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে কোন দল কীভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে তা এখন পর্যন্ত অস্পষ্ট। এক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়নে বাণিজ্য ও পেশীশক্তির ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। দলীয় মেয়রের অনুপস্থিতিতে নির্দলীয় কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে প্যানেল মেয়র নির্বাচন প্রশাসনিক জটিলতা বাড়াবে। তাছাড়া বাস্তবতা বিবেচনায় মেয়র পদে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থীর দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও চ্যালেঞ্জিং হবে।

রবিবার রাজধানীতে স্থানীয় সরকার বিষয়ে বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তসমূহ এবং গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতি ও সমন্বিত আইনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় তারা এসব চ্যালেঞ্জের কথা জানান। জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এনজিও সংগঠন গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম (জিএফ) ও মানুষের জন্য যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। এতে জিএফ সমন্বয়কারী মহসীন আলী লিখিত মূল বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের ঘনঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সামগ্রিকভাবে প্রস্তুতিহীনতাকেই নির্দেশ করে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তো নয়ই, নিজেদের জোটসঙ্গী অন্যান্য দল, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। একেক সময়ে একেক উদ্যোগ এবং শেষ পর্যন্ত আধা-দলীয় ও আধা-নির্দলীয় ধরনের পৌরসভা নির্বাচনী আইন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জিএফের চেয়ারপার্সন ও পিকেএসএফের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমেদ। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন, অধ্যাপক ড. ফেরদৌস জাহান প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে ড. খলিকুজ্জমান বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনও বিশাল একটি জনগোষ্ঠী উন্নয়নের বাইরে রয়েছে। এই বাদ পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নে ফিরিয়ে আনতে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই। এজন্য বিভক্তির পথ থেকে বেরিয়ে স্বচ্ছতার দিকে আসতে হবে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্ট করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিষয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে ঐক্য প্রয়োজন।

ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও জেলাপরিষদের জন্য একটি একীভূত আইন প্রণয়নের জন্য ভারতে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার আইনটি বিবেচনা করার জন্য পরামর্শ দেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিদ্যমান নয়টি আইন এবং ২২০টি বিধি বিধান স্থানীয় সরকার পরিচালানায় কোনো কাজেই আসে না। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার চলে মূলত বিভিন্ন সময়ে জারি করা শত শত সার্কুলার দিয়ে। এই ‘সার্কুলারতন্ত্র’ থেকে বেরিয়ে একীভূত আইনের জন্য স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদেরই লড়াই করতে হবে।

অনুষ্ঠানে মিউনিসিপ্যাল এসোসিয়েশান অব বাংলাদেশের (ম্যাব) মহাসচিব শামিম আল রাজি বলেন, দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হতো। কিন্তু সেটি হয় নি। সরকার একদিকে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা বলছে, অন্যদিকে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে বরখাস্ত করছে। নওগাঁর মান্দা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জামিলা আক্তার ফেন্সি বলেন, উপজেলা পরিষদে নারী নেতৃত্ব চরম অবহেলার শিকার। নারী ভাইস চেয়ারম্যানদের কাজের ক্ষেত্র কী হবে তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। পরিষদীয় কাঠামোয় ভাইস চেয়ারম্যানকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। সভায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেয়া স্থানীয় সরকারের একাধিক প্রতিনিধি তাদের অভিজ্ঞতা ও পরার্মশ তুলে ধরে বলেন, তারাও দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন করার পক্ষে। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবাতায় আসন্ন নির্বাচনে মারপিট, টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব বাড়াবে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আরও ইতিবাচক হতো।