২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আরেকটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার ॥ কর্ণফুলীতে দেশের প্রথম টানেল

আরেকটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার ॥ কর্ণফুলীতে দেশের প্রথম টানেল
  • একনেকে উঠছে কাল সহায়তা দিচ্ছে চীন

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি হচ্ছে টানেল। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে এই টানেল তৈরিতে সহায়তা দিচ্ছে চীন। কর্ণফুলী নদীর অপর প্রাপ্তে আনোয়ারা উপজেলায় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঘটবে আমূল পরির্তন। এটিকে সরকারের আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত কনস্ট্র্রাকশন অব মাল্টি লেন রোড টানেল আন্ডার দ্য রিভার কর্ণফুলী শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এটি অনুমোদন দেয়া হতে পারে। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩ হাজার ৬৪৭ কোটি ২০ লাখ এবং চীনের ঋণ থেকে ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। একনেকে অনুমোদন পেলে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে এটি তৈরির কাজ শেষ করবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সম্প্রতি সাবেক হওয়া সদস্য আরাস্তু খান বলেন, কর্ণফুলী নদীতে টানেলটি নির্মিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থল হিসেবে চট্টগ্রামের ভূমিকা শক্তিশালী হবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-এর জাতীয় মহাসড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে, এশিয়া হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, কর্ণফুলী নদীর দুইপারে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, বর্তমানে চালু দুটি ব্রিজের ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের চাপ কমবে এবং সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এসব বিবেচনায় প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

সূত্র জানায়, দেশের ইতিহাসে প্রথম এই টানেলের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার। কনস্ট্রাকশন অব মাল্টি লেন রোড টানেল আন্ডার দ্য রিভার কর্ণফুলী’ শীর্ষক এ টানেল নির্মাণে প্রস্তাব পাঠায় সেতু বিভাগ। এর আগে টানেলটি তৈরিতে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। যেখানে চীন সরকার পক্ষ থেকে বড় অংকের ঋণ সহায়তা দেয়ার কথা ছিল। সেতু বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পাঠানোর পর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা ডাকে পরিকল্পনা কমিশণ। পিইসি সভায় উপস্থিত প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে দেয়ার প্রস্তাব করে সেতু কর্তৃপক্ষ। এটি নিয়ে কমিশন অসন্তোষ প্রকাশ করে বাড়তি ব্যয় সংবলিত নতুন ডিপিপি পাঠানোর আহ্বান জানায়। প্রকল্পটির সম্ভাবতা যাচাইকারী চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিসি) সঙ্গে ইতোমধ্যে কমার্শিয়াল চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এ চীনা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা অনুসারেই নতুন এই ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানাগেছে। নির্মাণ ব্যয় ও নতুন কম্পোনেন্ট যুক্ত করে এসব ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রস্তাবনায় যেসব অংশের বরাদ্দ বেশি বলে পরিকল্পনা কমিশন মনে করেছিল সেগুলো হচ্ছে, ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি খাতে ১০১ কোটি ও প্রাইস কন্টিনজেন্সি খাতে ৪০৭ কোটি টাকা। প্রকল্প প্রস্তাবনায় সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণকালীন সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে। অথচ এখনও ঋণ চুক্তি হয়নি। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ১৫৫ দশমিক ১৭ একর জমি অধিগ্রহণে ২৩৩ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। অথচ সেতু প্রকল্পের ডিপিপিতে এ খাতে ৩১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। এ অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন মনে করছিল কমিশন। সেতু বিভাগের পাঠানো নতুন প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, টানেল নির্মাণ কল্পে প্রকল্পটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাবদ ২ কোটি টাকা, অডিও ভিডিও ফিল্ম মেকিং খাতে ২ কোটি, বিজ্ঞাপন বাবদ সাড়ে ৩ কোটি, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি ও বিশেষজ্ঞদের সম্মানী প্রদান নামে ৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের অধীনে সব নতুন গাড়ি কেনার প্রস্তাব করা সত্ত্বেও মেরামত বাবদ ১ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের আওতায় বন্দর ও আনোয়ারা উপজেলায় নির্মিতব্য টানেল নির্মাণে নতুন প্রস্তাবনা অনুসারে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৩ হাজার ৬৪৭ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে, ৩ দশমিক ৪০ কিলোমিটারা টানেল নির্মাণ, ৪ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার এ্যাপ্রোচ টানেল নির্মাণ, ৮০০ মিটার সেতু নির্মাণ, ৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার টোল প্লাজা তৈরি, ৬২ দশমিক ৮২ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, পরামর্শক সেবা, জেটি নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করা হবে।

সূত্র জানায়, চীনের প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই বাংলাদেশ সফরে আসছেন। এর আগে দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ঢাকা আসবেন। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, চলতি বছরের মধ্যেই চীনের শীর্ষ পর্যায়ের এ নেতা বাংলাদেশ সফর করবেন, এটা নিশ্চিত। এ ব্যাপারে দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। চীনের প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বাংলাদেশে চীনের প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের জুন মাসে চীন সফরকালে চীনের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। চীনের প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের উন্নয়নে ব্যাপক সহায়তা বাড়াচ্ছে চীন। এর আগে বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের ৬ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করতে সম্মত হয় দেশটি। এসব প্রকল্পের মধ্যে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র সংক্রান্ত একটি এবং বাকি ৫টি গ্যাস সরবরাহ সংক্রান্ত প্রকল্প রয়েছে। ইতোমধ্যেই এসব প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়েছে। চীনের সহায়তার বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন এর আগে বলেছিলেন, ‘চীন এ দেশের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি বিভিন্ন বিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশাল অঙ্কের ঋণ পাওয়া যাচ্ছে চীন থেকে। ফলে দেশের অগ্রগতিতে এসব বিদ্যুতকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।