২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কঠোর নিরাপত্তায় সাকা মুজাহিদের দাফন ॥ জানাজায় ছিলেন না বিএনপি নেতারাও

আহমেদ হুমায়ুন, রাউজান থেকে ফিরে ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শনিবার দিবাগত রাতে কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর করার পর রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সাকার নিজ বাড়িতে কুখ্যাত এ যুদ্ধাপরাধীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এতে রাউজানের পাড়ায় পাড়ায় আনন্দ মিছিল হয়েছে। তবে এখনও এলাকার সংখ্যালঘু পাড়ায় বিরাজ করছে অজানা আতঙ্ক। অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় রাউজান ও উত্তর চট্টগ্রামজুড়ে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দাফনের পর থেকে সাকার গহিরার বাড়ি প্রাঙ্গণে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

লাশ গ্রহণ করলেন হুম্মাম কাদের ॥ র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে সাকার লাশ চট্টগ্রামে তার নিজ বাড়ি রাউজানের গহিরায় নিয়ে আসা হয়। সকাল ৮টার দিকে সীতাকু- পার হয়ে ভাটিয়ারি এলাকায় আসে। সেখান থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে না গিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাস হয়ে বড়দীঘির পাড় হয়ে তার নিজ বাড়ি রাউজানের গহিরায় নিয়ে আসা হয়। বাসায় আনার পর সকাল ৯টা ১০ মিনিটে সাকার ছোট ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর নিকট লাশ বুঝিয়ে দেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মাজহারুল ইসলাম। এ সময় তার সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানসহ ডিএমপির বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

লাশ নিয়ে নাটকীয়তা ॥ সাকার লাশ বাড়িতে আনার পরপরই শুরু হয় লাশ নিয়ে নাটকীয়তা। সকাল ৯টা ৫মিনিটে বাড়িতে প্রবেশ করার সময় সাকার দুই ছেলে ফায়াজ কাদের ও হুম্মাম কাদের লাশবাহী গাড়ি সামনে দাঁড়িয়ে যান। লাশকে তাদের ঘরে নিয়ে যেতে পুলিশকে জোর প্রয়োগ করেন। পুলিশ তাদের কথায় কর্ণপাত করে পূর্ব থেকে নির্ধারিত সাকার পৈত্রিক ঘরের সামনে খোলা জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পর পুলিশের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় শুরু হয় বাকবিত-া। সাকার পরিবারের পক্ষ থেকে তার লাশ পুনরায় গোসল দিতে পুলিশের নিকট অনুমতি চাওয়া হয়। পুলিশ তাতে অনুমতি না দিলে হুম্মাম কাদের আরেকটি শর্তজুড়ে দেন। তিনি বলেন, গোসল করাতে না দিলে লাশ তাদের বাসার সামনে নিতে দিতে হবে। এ নিয়ে কিছুক্ষণ পুলিশের সঙ্গে হুম্মাম কাদেরের বাকবিত-া হয়। এক পর্যায়ে ফজলে করিম চৌধুরীর বড় ভাইয়ের ছেলে হুমাম্মকে এক মিনিট অপেক্ষা করার অনুরোধ জানান। এর মিনিট দুয়েক পরে পুলিশ লাশটি বাসার সামনে নেয়ার অনুমতি দেন। তবে সেখানে অবস্থান না করতে দিয়ে সোজা মসজিদের সামনে নিয়ে যায়। সেখানে দ্রুত জানাজা শেষ করতে বাধ্য করেন। পুলিশে চাপাচাপিতে সকাল ৯টা ২২মিনিটে জানাজা সম্পন্ন হয়।

জানাজা পড়ালেন হেফাজত নেতা বাবু নগরী ॥ যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়া সাকার ইচ্ছা অনুযায়ী হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমির মুহিব উল্লাহ বাবু নগরী তার জানাজা পড়িয়েছেন। রবিবার সকাল ৯টা ২২মিনিটে তার নিজ বাড়ির মসজিদের উত্তর পাশে খোলা জায়গায় ছোট পরিসরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি নিকটাত্মীয়রা অংশ নেন।

জানাজায় ছিলেন আপন ভাই ॥ সাকার জানাজায় তার আপন ভাই বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন না। নিজ ভাইয়ের অন্তিম শয়নে উপস্থিত না থাকায় এ বিএনপি নেতাকে নিয়ে সমালোচনা করেছেন উপস্থিত অনেকে। তবে সাকার ছোট ভাই জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরী জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি নেতারাও ছিলেন না জানাজায় ॥ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ার পরও সাকা চৌধুরীর জানাজায় বিএনপির কোন নেতাকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এমনকি রাউজান উপজেলা বিএনপির কোন নেতাও অংশ নেননি। জানাজায় শুধুমাত্র সাকার পরিবারের সদস্য এবং নিকটাত্মীয়রা উপস্থিত ছিলেন। তবে সাকার চাচাতো ভাই রাউজান আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ফজলে করিম এবং চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন জানাজায় উপস্থিত ছিলেন না।

সংখ্যালঘু পাড়ায় এখনও আতঙ্ক ॥ রবিবার সকালে সাকার লাশ দাফন করা হলেও রাউজানের সংখ্যালুঘু পাড়ায় এখন আতঙ্ক কাটেনি। এলাকার সংখ্যালুঘুরা আতঙ্কে ভুগছেন। লাশ দাফন করার রবিবার দুপুর ১২টার দিকে জগৎমল্ল পাড়া ও ঊনসত্তর পাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ঘরগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। বাড়িতে কোন পুরুষ লোক নেই। অনেক ঘরে নারীরাও নেই। জগৎমল্ল পাড়ায় দুই ঘরে দুই গৃহিনীর দেখা মিললেও তারা ভয়ে সাকার ফাঁসির বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে ঊনসত্তর পাড়ায় গিলে একাত্তরে সাকার নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার নতুন চন্দ্র সিংহের নাতিন রাজিব সিংহর সঙ্গে দেখা হয়। এ সময় সাকার ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, ’৭১ সালে সাকা আমার দাদাসহ আমাদের পাড়ার অসংখ্য নারী-পুরুষকে হত্যা করেছে। তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় আমরা অনেক খুশি। তার মৃত্যুদ- কার্যকরে রাউজান কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।

পাড়ায় পাড়ায় আনন্দ মিছিল ॥ যুদ্ধাপরাধী সাকার মৃত্যুদ- কার্যকর করার পরপরই চট্টগ্রামের রাউজানে আনন্দ মিছিল শুরু হয়। শনিবার রাত আড়াইটার দিকে পূর্ব গহিরায় রাউজান পৌরসভার মেয়রের নেতৃত্বে আনন্দ মিছিল বের হয়। রবিবার সকালে সকল পাড়ায় পাড়ায় আনন্দ মিছিল বের করেন উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন। কু-েশ্বরী ভবনেও ছিল আনন্দ উল্লাস। সেখানে একাত্তরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভে এলাকার বিভিন্ন বসয়ী লোকজন পুষ্পমাল্য অর্পণ করেছেন।

রাউজানের কলঙ্ক যুদ্ধাপরাধী সাকার মৃত্যুদ- কার্যকর করায় উচ্চ আদালতকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাউজান পৌরসভার প্যানেল মেয়র উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক বশির উদ্দিন খান বলেন, একাত্তরে সাকা চৌধুরী এখানে তাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তার ইশারায় এখানে অসংখ্য নিরীহ মানুষ খুন হয়েছে। তার মৃত্যুদ- কার্যকর করায় আমরা অত্যন্ত খুশি। এ ঘটনায় উপজেলার প্রতিটি পাড়ায় আনন্দ মিছিল বের হয়েছে বলে জানান তিনি।

বাবা প্রাণভিক্ষা চাননিÑ হুম্মাম কাদের ॥ লাশ দাফনের দেড় ঘণ্টা পর সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে সাকার নিজ বাড়ি বাইতুল বিল্লালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন হুম্মাম কাদের। এ সময় তিনি আবারও দাবি করেন তার বাবা প্রাণভিক্ষা চাননি। হুম্মাম কাদের বলেন, শনিবার রাতে শেষ বারের মতো দেখা করতে গেলে প্রাণভিক্ষার বিষয়ে বাবা আমাকে বলেন, ‘৬ ফুট ২ ইঞ্চি তোমার বাবা, কারও কাছে মাথা নত করে না। বাবাকে (সাকা) মানুষ বাংলার বাঘ হিসেবে চিনে। তিনি কখনও প্রাণভিক্ষা চাইবেন না।

তিনি আরও বলেন, আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছি। দেশের এখন অনেক খুন-গুম হচ্ছে। অনেকে আপনজনের মরদেহ খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা ভাগ্যবান যে সম্মানের সঙ্গে বাবাকে দাফন করতে পেরেছি।

গহিরা বাজারে আওয়ামী লীগের অবস্থান ॥ এদিকে রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে সাকার লাশ প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেও লাশ বাড়িতে আনার আগ মুহূর্তে রাউজানে আওয়ামী লীগের কোন নেতাকর্মীকে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। তবে লাশ দাফনের পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গহিরা বাজারে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। এ সময় সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

টিভি চ্যানেলের গাড়িতে হামলা ॥ সাকার লাশ দাফনের ঘটনায় বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সংবাদ সংগ্রহের পর নগরীতে ফেরার পথে মোহনা টিভির গাড়িতে হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা। এতে ওই টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার রাজিব সেন প্রিন্স আহত হন। কারা এবং কি কারণে এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা নিশ্চিত করে কোনপক্ষ কিছুই জানাতে পারেনি।

শহরে গায়েবানা জানাজা ॥ চট্টগ্রাম প্যারেড ময়দানে রবিবার বিকেলে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মূলত কর্মসূচীটি জামায়াতের কেন্দ্র ঘোষিত হলেও এতে সাকা চৌধুরীর ভাই বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। গায়েবানা জানাজাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের একটি শোডাউনের প্রয়াস ছিল জামায়াতের। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এতে যোগ দেন। এই কর্মসূচীকে কেন্দ্র করেও নগরীতে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শেষ পর্যন্ত কোন অঘটন ছাড়াই কর্মসূচী সমাপ্ত হয়েছে।

ফরিদপুরে মুজাহিদের দাফন ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর, থেকে জানান, ঘড়ির কাঁটা তখন রবিবার ভোর ৭টা ১৫মিনিট, শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী আল বদর কমান্ডার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে দাফন করা হলো। এর মাধ্যমে জাতি একটি দায় মুক্তি পেল। ফরিদপুরবাসী কলঙ্ক মোচনের সুযোগ পেল। মুজাহিদের ফাঁসিতে খুশী হয়ে গভীর রাতেই ফরিদপুরে আনন্দ মিছিল বের হয়।

ফরিদপুরে অভূতপূর্ব নজিরবিহীন কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে দাফন দেয়া হয়েছে। রবিবার সকাল সাতটা ১৫ মিনিটে ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুর মহল্লার আব্দুল আলী ট্রাস্ট পরিচালিত আদর্শ একাডেমির (আইডিয়াল মাদ্রাসা) সামনের ফটকের ডানপাশে তাকে কবর দেয়া হয়। এর আগে রোববার সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে মুজাহিদের মরদেহ বহন করে নিয়ে আসে একটি গাড়ির বহর। এ বহরে দুটি এ্যাম্বুুলেন্স, র‌্যাব ও পুলিশের নয়টি গাড়ি ও একটি ট্রাক ছিল।

শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টা থেকে পুলিশ, আর্ম পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাবের শত শত সদস্য মুজাহিদের বাড়ি, বাড়ি থেকে আনুমানিক চারশ’ গজ পশ্চিমে অবস্থিত দাফনস্থল এবং মুজাহিদের বাড়ি থেকে আনুমানিক দুইশ’ গজ পূর্বে অবস্থিত ঢাকা-বরিশাল সড়ক পর্যন্ত সম্পূর্ণ জায়গায় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী রচনা করে। ওই সময় মুজাহিদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও জামায়াতের নেতাকর্মী ছাড়া আর কাউকে ওই এলাকায় যেতে দেয়া হয়নি।

মুজাহিদের জানাজা হয় আদর্শ একাডেমির ভিতরের মাঠে। জানাজা পড়ান তার ভাই ফরিদপুর পৌর জামায়াতের নায়েবে আমীর আলী আফজল মোঃ খালেচ। এর আগে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মোঃ বদরউদ্দিনের পরিচালনায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতের আমীর আবদুত তাওয়াব, আঞ্চলিক আমীর দেলোয়ার হুসাইন ও মুজাহিদের বড় ছেলে আলী আহমদ তাজদিদ। শনিবার ভোর থেকে নিরাপত্তা আরও জোরাল করা হয়। মুজাহিদকে বহনকারীসহ বহরের দুটি এ্যাম্বুলেন্সসহ মোট ছয়টি গাড়ি ভিতরে ঢুকতে দেয়া হয়। এছাড়া কোন গাড়ি, কোন দর্শনার্থী এবং কোন সংবাদকর্মীকে ভিতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি।

জেলা জামায়াত আগে থেকে মুজাহিদের দাফন শহরের আলীপুর গোরস্থানে না আদর্শ একাডেমিতে দেবে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। শনিবার দুপুরে আদর্শ একাডেমি জানাজার স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও ঠিক কোন জায়গায় তাকে দাফন দেয়া হবে তা শেষ দেখার সময় তিনি (মুজাহিদ) কবরের জায়গাটি আদর্শ একাডেমির মূল ফটকের সামনে নির্ধারণ করে দেন।