১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুই নরঘাতকের ফাঁসি

নানা জল্পনা-কল্পনার পর শনিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে কার্যকর হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায়। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একই মঞ্চে পাশাপাশি ঝুলিয়ে এই দুই অপরাধীর দ- কার্যকর করা হয়। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, এই দু’জনই একাত্তরে সংঘটিত ঘৃণ্য ও পৈশাচিক মানবতাবিরোধী নানা অপকর্মের অন্যতম হেভিওয়েট আসামি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী এরশাদের আমলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন ছাড়াও পরবর্তীকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খালেদা জিয়ার আইন ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। অন্যদিকে আলী আহসান মুজাহিদ ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর এই দু’জন ঘৃণিত ব্যক্তির রাজনীতিতে পুনরুত্থান ঘটে এবং তারা ক্ষমতার মসনদে যেতে সমর্থ হন। স্বভাবতই এই দু’জনের বিচার প্রক্রিয়া ও দ- কার্যকর নিয়ে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ-সংশয় ছিল। দেশে-বিদেশে বিপুল অর্থ ব্যয় করে লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় তারা পদে পদে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়, আপীলের সুযোগসহ আন্তর্জাতিকমানের বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালায়। নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণসহ শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা নিয়েও মিথ্যাচার করতে ছাড়েনি। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে এই দু’জন নরঘাতকের লিখিত আবেদনের খবর কারা কর্র্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলেও, তাদের পরিবারের পক্ষে এবং বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকেও বলা হয় যে, তারা প্রাণভিক্ষা চাননি। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৯-এ মহামান্য রাষ্ট্রপতির যে ক্ষমা করার ক্ষমতা, সেই ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য তারা আবেদন করেছেন।

সাকা চৌধুরীকে চার অপরাধে মৃত্যুদ- দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ঊনসত্তরপাড়া গণহত্যা, বণিকপাড়ায় গণহত্যা, নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা এবং শেখ মোজাফফর ও শেখ আলমগীরকে হত্যা। অন্যদিকে আলী আহসান মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধকালে আলবদর বাহিনী কর্তৃক বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, উস্কানি ও সহযোগিতার অভিযোগে। তবে এ দু’জনের অপরাধ আরও অনেক ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। সাকা চৌধুরী তার কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি ও অশালীন কথাবার্তার জন্য রীতিমতো কুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকেও মানতেন না। এর পাশাপাশি শিপিং ব্যবসার আড়ালে তিনি অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, তথা চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আলী আহসান মুজাহিদ প্রায়ই দম্ভোক্তি করে বলতেন, বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী নেই এবং ছিল না। এই উক্তিও প্রকারান্তরে বাংলাদেশের সুমহান মুক্তিযুদ্ধকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। জামায়াতে ইসলামীর হরতাল ডাকাও ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে।

এই দুই নরঘাতকের ফাঁসির দ-াদেশ কার্যকরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পরে হলেও দেশ ও জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ এবং সাড়ে ছয় লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ দায়মুক্ত হলো। কৃত অপরাধের দায় স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষাসহ অনুকম্পা প্রার্থনা করায় আইনগত স্বীকৃতি পেল তাদের অপরাধ। এর ফলে জামায়াতে ইসলামীকে আগামীতে যুদ্ধাপরাধী মানবতাবিরোধী দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিও প্রশস্ত হলো। সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের দ-াদেশ কার্যকর হওয়ায় স্বভাবতই শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ উল্লাস প্রকাশ করেছে। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ফেলেছে স্বস্তির নিশ্বাস। সর্বোপরি তরুণ প্রজন্ম ও নবপ্রজন্ম উজ্জীবিত হয়েছে।