২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জীবনের রৌদ্রছায়ায় নিজেরে খুঁজে ফিরি...

  • সমুদ্র হক

কবি পিবি শেলীর কবিতার একটি পঙ্ক্তি ‘ইফ উইন্টার কামস ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড...’ মানবজীবনের রৌদ্রছায়ায় হেমন্ত শেষে অগ্রহায়ণে শীতের আবাহনে মনে উঁকি দেয় কেমন করে কাটবে শীত, সামনের বসন্তের বেলা। যেখানে সকালের মিষ্টি রোদের প্রকৃতির রোমান্টিকতার সঙ্গে ব্যক্তিজীবন এক হয়ে মিশে যায় কোন এক সুন্দরের পথে! কত ছন্দই না কাছে চলে আসে। মধুময়তার পরশ বুলিয়ে দেয় ঝিরিঝিরি ধ্রপদী লয়ে বয়ে আসা বাতাস। হৃদয়ের গভীর কোণে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম ও সুপ্ত জায়গাটিতে ভিড় করে কতই না কথা...যা জমিয়ে থাকে বছরের পর বছর ধরে। প্রত্যেক মানুষ জীবনভর তার এই স্পর্শকাতর জায়গাটিকে সযতনে লালন করে।

মানুষের জীবনের একেকটি সময়কে মনে হয় একেকটি অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে রয়ে যায় কতই না স্মৃতি। যে স্মৃতি ভোলার নয়। স্মৃতির ভেলায় চড়লে অতল জলে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। এই স্মৃতি যেন ব্যক্তিজীবনের ইতিহাসের পাতা। যে পাতা আবির মেখে রং ছড়ায়। যেন বিবর্ণ হতে দেবে না মণিকোঠায়। সেই মণিকোঠায় দৃষ্টি দিলে মানুষ ফিরে পেতে চায় সেই দিনগুলো যা সে হারিয়ে ফেলেছে। হারানো সেই দিনগুলোর অনেক অংশই জড়ো হয়ে থাকে হৃদয়ের সেই সুপ্ত জায়গাটিতে। বহমান জীবনের ধারায় তা পাখা মেলে ধরে। উড়তে চায়।

ছেলে বেলা থেকে কিশোর বেলা, তা পেরিয়ে যৌবনের পথ ধরে তারুণ্যের দিনগুলো মধ্য বয়স পর্যন্ত টেনে নেয়। তারপর জীবনের শেষ অধ্যায়ে কেউ মনের দিক দিয়ে তরুণ থেকে যায়। মনের জানালায় উঁকি দেয় অনেক কিছু...। তারুণ্যকে সঙ্গে নিয়েই রয়ে যায় শেষ দিন পর্যন্ত। কেউ পারে কেউ তা পারে না। এই সময়ের কোন না অধ্যায়ে তার চেনা জানা দিন, কোন দৃশ্য, কোন স্থান.... কোন বন্ধু, হৃদয়ের বন্ধু কাছের বন্ধু নিকটের সঙ্গী সাথী সবই একে একে চলে আসে হৃদয়ের লুকানো জায়গাটিতে। এই ধারাতেই প্রকৃতির প্রতিটি দিন পেরিয়ে যায়। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, ফাল্গুন, হেমন্ত, শরত, বসন্ত... ঋতুবৈচিত্র্যে যাই থাক মনের বৈচিত্র্যে সবই তখন অবগাহনের পালা। মনের চোখ দিয়ে দেখা। মনের চোখে এক হৃদয় আরেক হৃদয়ের সঙ্গে মিলে কথা বলা, যে কথা ধ্রুপদী লয়ে কথা ও সুরে বেজে ওঠে হৃদয়ের সেই গভীর কোণে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রওজা তুল জান্নাত লিখেছেন, বুকের মাঝে চাপা কষ্ট ভাললাগার সেখানে জায়গা হয় না, মানুষ জীবনে ঠকে যতখানি জেতে তার চেয়ে ঢের কম। লাভ-লোকসান হিসাব করলে কখনই তা সমান হয় না। সুখ আর দুঃখ পাশাপাশি, কিন্তু সুখকে ছিনিয়ে আনতে হয়। সাফল্য পেতে হলে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়। জীবনের অঙ্কের হিসাব কি কেউ মেলাতে পেরেছে! তাই তো আমাদের করতে হয় পাটিগণিত বীজগণিত আরও উচ্চতর গণিত...। এর উত্তরে আরেকজন লিখেছেন, সরল অঙ্ককে যতই সরল বলা হোক তা কখনই সরল নয়। আর জীবনের যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের সরল অঙ্কের প্রকৃত ফলাফল হয় শূন্য না হয় এক। তবুও আমরা জীবনকে সরল করে নেই। জীবনের সরলে যা কিছু ভাল লাগে তা মনে নেই যা ভাল লাগে না তা মেনে নেই। বহমান জীবন এভাবে এগিয়ে যায় দূর বহুদূর...।

শীতের আবাহনে এই সময়টায় ভোরের কুয়াশা সকালের রোদের ঝিলিক ধরে গোধূলির পর পড়ন্ত বেলায় শিশির ঝরার পালায় রাত নেমে আসে। তারপর ঘরে শীতের আমন্ত্রণে বৈদ্যুতিক পাখার ঘূর্ণন কমে যায়। যাদের ঘরে এয়ার কন্ডিশনার আছে তারাও তা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রেখে মধ্যবিত্তের ঘরের ফ্যানের সঙ্গে যোগ দেয়। রেফ্রিজারেটরের খাবারও হিমপ্রবাহ থেকে কিছুটা রেহাই পায়। তাজা শাকসবজি ডালাতেই থাকে। তবে ওভেন ও গ্যাসের চুলাকে বাড়তি ডিউটি পালন করতে হয়। নগরে যাদের ঘরে গিজার আছে তাদের কোন সমস্যা হয় না। যাদের নেই তাদের কাছে গরম জলের জন্য চুলা ও খাবার গরম রাখতে ওভেন আছে। শীতের দিনগুলো এতই ছোট যে রাত পোহাতে না পোহাতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তারপর কখন যে সন্ধ্যা নেমে আসে। আর শীতের সন্ধ্যা মানেই মহা রাতের আমন্ত্রণ। রাত যে কাটতেই চায় না। রাজধানী ও মহানগরীর জীবনে গ্রীষ্মের মধ্য রাত যখন কেবল সন্ধ্যা শীতের মধ্য রাত তখন গভীর অচেতন এক নগরী। বর্তমানের বিদ্যুতায়িত গ্রামীণ জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। সন্ধ্যার ঝিঁঝিঁ পোকা ভুলে গিয়েছে কখন ডাকতে হবে। জোনাকিও ভুলে গেছে কখন মিটিমিটি করে ঝাউবনে গৃহস্থ ও কৃষক বাড়ির আঙিনার কোনায় কোন চুপিসারের ছোট তরুলতার মাঝে আলো জ্বালিয়ে জানান দেবে শীতে ওরাও বের হয়েছে মধুর আধার ভুবনে। শীতের এমনই আমন্ত্রণে ঘর ছেড়ে বের হয়ে মিষ্টি রোদের বিকেলে কোথাও যেতে কার না মন চায়। অবশ্য যাদের হৃদয়ের সুপ্ত জায়গা তো দূরে থাক মন বলতে কিছু নেই তাদের কথা আলাদা। তাদের কাছে শীত, গ্রীষ্ম, শরত, বর্ষা কোনটিই মনে ধরে না। এরা অঙ্কের কঠিন এ্যালজেবরার মানুষ। এমন অতৃপ্ত আত্মার মানুষ জগত সংসারে অনেক আছে। হয়ত আমাদের আশপাশেই আছে। চিনতে পারি না। অনেক সময় চিনে নিতেও কষ্ট হয়। শীতের সময়টায় তাদের অনেককে দেখা যায় স্যুটেড বুটেড হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়িতে চেপে। কেউ সফেদ পাঞ্জাবি ও চার ধারে এমব্রয়ডারি করা বকের পালকের মতো সাদা শাল কী সুন্দর করে গায়ে চরিয়ে জানান দিচ্ছে শীতের আকুলতার।

খোঁজ নিলে দেখা যাবে কী চমৎকার এক বহুরূপী। এমন মানুষেরও খোঁজ মেলে এই সময়টায়।

এত সবের মধ্যে যারা হৃদয়ের দুয়ারে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে চায় তারা জীবনের সময় থেকে কিছুটা সময় ধার করে বের হয় মনের সুন্দর ভুবনকে আলোকিত করতে। মিষ্টি হলদেটে রোদেলা বিকেলে কোন ঝাউবনে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে খোঁজে হৃদয়ের সূক্ষ্ম সুপ্ত আসনে থাকা কিছু। মনে পড়তে পারে কোন এক দিনের কোন এক ক্ষণের কথা। যাকে মনের মুকুরে ধরে রেখেছে একান্ত আপনে। মানুষের বহমান জীবনে কম্পিউটারের সফ্টওয়্যারের মতো এঁটে দেয়া প্রোগ্রামগুলোর মতো প্রতিদিনের রুটিন কাজের মাঝে কিছুটা সময় বের করে ওই সময়টুকু নিজের করে ধরে রাখতে পারলে হৃদয়ের সুপ্ত জায়গাটি হয়ত কিছুটা ভরে যায়! প্রতিদিন সব পাখি উড়ে তো ঘরে ফেরে। প্রত্যেক মানুষও কাজ শেষে ঘরেই ফেরে। এর মধ্যে কিছুটা সময় যদি হৃদয়ের সুপ্ত জায়গায় মনটি রাঙিয়ে দিতে পারে, একাকিত্বের অবসাদ থেকে কোন ছোঁয়ায় যদি ভরে ওঠে হৃদয় তাহলে জীবনের কল্পতরু সজীব হয়ে উঠতেও পারে। এর মধ্যেই হয়ত ফিরে পাওয়া যায় মণিকোঠার দিনগুলো... ।