২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্থাপত্য সংরক্ষণ

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র একদা আক্ষেপ করে লিখেছিলেন বাঙালীর কোন ইতিহাস নেই। এ ক্ষেত্রে তিনি নিশ্চয়ই লিখিত ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে একথাও সত্য যে, বাঙালীর ইতিহাস লেখার জন্য যথোপযুক্ত উপকরণের বড়ই অভাব। এই জল-কাদা, মারি-মড়ক-মন্বন্তরের দেশে- ঝড়-ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প, বৃষ্টি-বাদল, বন্যা, নদ-নদীর একূল ভাঙ্গা ওকূল গড়ার দেশে ইতিহাসের সপক্ষে প্রাথুরে প্রমাণ বুঝি বেশিদিন টেকসই হয় না। মহাকালের গহ্বরে প্রায়ই হারিয়ে যায় অথবা চাপা পড়ে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গাগড়ার খেলায়। সময়ের আবর্তে শাসক আসে, শাসক যায়। নতুন শাসক ক্ষমতার মসনদে বসে লিখতে চায় নিজের মনমতো ইতিহাস। পুরনো শাসকদের ছুড়ে ফেলতে চায় আঁস্তাকুড়ে, ভেঙ্গে ফেলে পুরনো পুরাকীর্তি, গড়ে তোলে নিজের স্থাপনা। হায়, সে নিজেও জানে না কালের প্রবাহে একদিন অনিবার্য তাও ধূলিসাত হবে! এর পাশাপাশি আরও একটি কথা বোধকরি প্রণিধানযোগ্য- বাঙালী বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি। ইতিহাসের সবকিছু তারা অতি দ্রুত ভুলে যায়; যার যা প্রাপ্য যতটুকু প্রাপ্য, ততটুক দিতে কেন যেন বড়ই কৃপণ ও কুণ্ঠিত।

সতত প্রবহমান ধীরে বহে বুড়িগঙ্গার তীরে রাজধানী ঢাকার ইতিহাস কমবেশি চার শ’ বছরের পুরনো। তবে এর আগেও নিশ্চয়ই এই পলিবিধৌত গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে ব্যাপক জনপদের অস্তিত্ব অনিবার্য ছিল। মধ্যযুগের কাব্যসাহিত্য, শিল্পকলা, যৎসামান্য প্রাপ্ত প্রতœসামগ্রী ও শিলালিপিতে আদি নিদর্শন যতটুকু পাওয়া যায় তাতে বেশ বোঝা যায় যে, ঐতিহাসিক বিক্রমপুর পরগনা অথবা একদার রাজধানী সোনারগাঁয় সমৃদ্ধ জনপদ ও বাণিজ্য কেন্দ্র একদিনে গড়ে ওঠেনি। সেই বুড়িগঙ্গা থেকে ঢাকায় আসার নৌপথে যে দুটি সুদৃশ্য ও সুরম্য ভবন সকলের চোখে পড়ত তার একটি আহসান মঞ্জিল আর দ্বিতীয়টি রূপলাল হাউস। দুটিই অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের ইংরেজ উপনিবেশ আমলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ও বিলাসবহুল স্থাপনা তথা বাসভবন। কালের আবর্তে দুটি সুরম্য প্রাসাদের অধিবাসীরাই বর্তমানে বিস্মৃতির অন্তরালে। প্রয়োজনীয় দেখভাল, যতœআত্তি, সর্বোপরি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুটি ভবনই কালক্রমে হয়ে পড়ে জরাজীর্ণ, ধূলিমলিন এবং বেদখলে বিধ্বস্ত প্রায়। অনেক লেখালেখি ও তর্ক-বিতর্কের পর আহসান মঞ্জিলের কিয়দংশ উদ্ধার করে সংস্কার করা গেলেও রূপলাল হাউসের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বুড়িগঙ্গামুখী সুবিশাল বিস্তৃত ভবনটির অধিকাংশই ইতোমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে, গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট, মসলা ও তরিতরকারির আড়ত। অথচ আহসান মঞ্জিলের মতো এই ঐতিহাসিক ভবনটিও নানা ঘটনার সাক্ষী; পুরাকীর্তির আকর ভবন তো বটেই। এটি মূলত ব্রিটিশ ও ভারতীয় মিশ্র ঘরানার নিও-ক্লাসিক্যাল স্থাপনা। সত্য বটে, আহসান মঞ্জিল ও রূপলাল হাউস- এ দুটিই অন্তত ঢাকায় ব্রিটিশ আমলে সুনির্মিত সুরম্য ভবন ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। বিক্ষিপ্তভাবে রাজধানী ও অন্যত্র এরকম কিছু দুর্লভ স্থাপত্য নিশ্চয়ই আছে। তবে কোনটিরই রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভালের বালাই নেই। সরকারের স্থাপত্য ও পুরাকীর্তি বিভাগ একটি থাকলেও তারা এর খোঁজখবর রাখে বলে মনে হয় না। আর রাজউকের কথা তো বলাই বাহুল্য। ফরাশগঞ্জ লালকুটির প্রায় পুরোটাই চলে গেছে ডেকোরেটর ও ক্যাটারারদের দখলে। অনুরূপ শোচনীয় অবস্থা চোখে পড়ে সূত্রাপুর, চকবাজার, লালবাগসহ শাঁখারীবাজার এবং ঐতিহাসিক সোনারগাঁওয়ের পানামনগরে। ঐতিহাসিক ও নজরকাড়া এসব স্থাপনার অধিকাংশই বর্তমানে অবহেলিত, অনাদৃত, ভগ্নদশাপ্রাপ্ত ও বেদখলে। তবে সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। কিছু সুরম্য ভবন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা বিশেষজ্ঞ প্যানেল দিয়ে চিহ্নিত করে জরুরী ভিত্তিতে উদ্ধার, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে করে ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা বাড়বে বৈ কমবে না।