১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগামীর প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্যই সবুজ ঢাকা

‘গ্রীন ঢাকা’র পরিকল্পনা কিভাবে এলো?

জামাল উদ্দিন : আমি জাপানে পড়াশোনা করেছি এবং সেখানেই চাকরি করতাম, সংসার পেতেছিলাম। পরে ২০০৪ সালের দিকে আমরা দেশে চলে আসি। তখন আমার সঙ্গে ছিল স্ত্রী ও ছোট ছোট দুটি মেয়ে। বড় মেয়ে হঠাৎ বলল, ‘বাবা সবাই এভাবে হর্ন দিচ্ছে কেন? এরা কী পাগল? যখন বিশ্বরোড পেরিয়ে খিলক্ষেতে এলাম সে বলে উঠল, ‘বাবা, তোমার দেশ এত নোংরা কেন?’ আমার মেয়ে বুঝতে পারল যে আমি তার কথাবার্তায় কষ্ট পেয়েছি। সে তখন আমার দুটি হাত ধরে বলল, ‘বাবা মন খারাপ করছ কেন? আমরা সবাই মিলে কী এই দেশটাকেও জাপানের মতো সুন্দর করতে পারি না?।’ আমার মেয়ের সেই কথাটা আজীবনের মতো মনে গেঁথে গেল। বাসায় ফিরে ভাবলাম সত্যি কিছু করা দরকার। আমার মেয়ের জন্য, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঢাকায় সবুজায়ন, শৃঙ্খলা, শান্তি, পরিচ্ছন্নতা ফিরিয়ে আনা জরুরী। তখন থেকেই আমি যেখানে যাই বিশেষ করে স্কুল-কলেজে গেলে সবাইকে বলি ‘ক্লিন ঢাকা-গ্রীন ঢাকা’র।

আপনার এই ভাবনার বাস্তবায়ন কিভাবে হলো?

জামাল উদ্দিন : সবুজ ঢাকা আসলে একটি সামাজিক আন্দোলন। আমি শুরু থেকেই ভেবেছি হুট করে এত সমস্যার রাজধানীকে আমি বদলে দিতে পারব না। এর জন্য প্রয়োজন জনমত, সচেতনতা। তাই আমি এই দশ বছর ধরে সবুজ ঢাকার প্রচারের চেষ্টা চালিয়েছি নিজের মতো করে। তবে সবুজ ঢাকার আজকের যে প্রসার ও জনপ্রিয়তা সেটি এসেছে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র আনিসুল হক সাহেবের হাত ধরে। তিনিই সবুজ ঢাকার যে প্রচেষ্ঠা সেটিকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেছেন। কিন্তু মেয়রের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের।

আজকের তরুণদের দিয়ে ঢাকাকে বদলানো কি সম্ভব?

জামাল উদ্দিন : কষ্ট হবে। কিন্তু সম্ভব। আমি জাপানে দেখেছি তারা তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগিয়ে আজকের জাপানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে তরুণদের আমরা ভাল কাজগুলোতে সম্পৃক্ত করতে পারছি না। অথচ আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের দেখে ব্যক্তিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি বিশ্বের যে কোন তরুণদের চাইতে তারা অনেক বেশি সহনশীল, উদ্ভাবনী গুণসম্পন্ন, কর্মঠ এবং মেধাবী। কিন্তু এদের নিয়ে উন্নয়নের চূড়ায় ওঠার কোন পরিকল্পনা আমাদের নেই। যেহেতু বিষয়টা অনেক বেশি ভবিষ্যৎমুখী তাই এর সঙ্গে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব বা প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত হতেই হবে।

তারুণ্যের সম্ভাবনাকে এক্ষেত্রে কী কাজে লাগানো যেতে পারে?

জামাল উদ্দিন : প্রথমেই তাদের বুঝাতে হবে তোমার অনেক কিছু করার ক্ষমতা আছে, তুমি অনেক কিছু করতে পারো এবং তোমাকে অনেক কিছুই করা উচিত। তাদের যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে পরিবার থেকে শুরু“ করে রাষ্ট্র পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রচেষ্টা চাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন জাপান পরাজিত হলো তখন তারা খুঁজে বের করল তাদের হারের কারণ বেশি বেশি লবণ খাওয়া। লবণ মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যার কারণে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। জাপানীরা এবার ঠিক করল লবণ খাওয়া কমিয়ে দেবে। জাপানীদের ধারণা, দীর্ঘ ৪৫ বছর লবণ কম খাওয়ার পর তাদের একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছে যারা অনেক বেশি পরিশ্রমী, মেধাবী, উদ্ভাবক, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখে।

‘গ্রিন ঢাকা’ প্রোজেক্টে আপনার সঙ্গে কারা যুক্ত আছেন?

জামাল উদ্দিন : প্রথমেই তো মেয়র আনিসুল হক সাহেবের কথা বলতে হয়। পাশাপাশি আমার নিজের কর্মস্থল শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন, প্রকৃতি সচেতন কিছু মেধাবীদের নিয়ে সংগঠন ‘প্রকৃতি বাংলা’ ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছে। অসংখ্য তরুণ শিক্ষার্থীরা রয়েছেন আমাদের সঙ্গে। পাশাপাশি কিছু এনজিও আছেন।

‘গ্রিন ঢাকা’ বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে?

জামাল উদ্দিন : আমরা প্রথমেই নজর দিচ্ছি ঢাকার রাস্তার দিকে। রাস্তার দুই পাশে ও মাঝের লেনে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করছি। বৃক্ষ রোপণে ঢাকাবাসীকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করা, পরিবারের জন্য তাজা শাক-সবজি, ফল ও ফুলের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো তৈরিতে যে পরিমাণ জমি নষ্ট হয় ছাদে বাগানের মাধ্যমে তার কিছু অংশ পুষিয়ে নেয়া, অবসর সময় কাটানোর জন্য ছাদে সবুজ সৌন্দর্য বর্ধন ও বিনোদনের সুবিধা সৃষ্টি, ছাদে বাগান কার্যক্রমে মহিলা ও ছেলে মেয়েদের সম্পৃক্ত করা।

আমাদের ভ্রাম্যমাণ গাড়ি থাকবে, লোকবল থাকবে। একটি অনলাইন কলসেন্টার সেবার ব্যবস্থা থাকবে। গ্রাহক বিনামূল্যে যখন প্রয়োজন গাছের সমস্যার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। আমরা তাদের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করব।

আপনার উদ্ভাবিত ‘নন্দিনী’ ফুল সম্পর্কে জানতে চাই

জামাল উদ্দিন : আমি জাপানে যখন পিএইচডি করতে যাই তখন আমার শিক্ষক এই ফুলটি নিয়ে আমাকে কাজ করতে দেন। আমি যখন গবেষণার মাধ্যমে ফুলটিকে ফুটাতে সমর্থ হই। নিজেই ভেবেচিন্তে নন্দিনী নামকরণ করলাম। বৈজ্ঞানিক নাম ঊঁংঃড়সধ এৎধহফরভষড়ৎঁস। জাপানী এই ফুলটি নিজ দেশে ‘তরুকোগিকিও’ নামে পরিচিত। নন্দিনী একটি উন্নতমানের কাট-ফ্লাওয়ার। হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে গোলাপ। আবার খাড়া পাতাসহ ডগা দূর থেকে অনেকটা টিউলিপের মতো দেখায়। রঙেরও ছড়াছড়ি। প্রায় ৪৫টি রঙের এ ফুলটি গাছ থেকে তোলার পর ১৫ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। বাংলাদেশেও এই ফুলের চাষ ও উৎপাদন বাড়াতে ১৭ বছর ধরে গবেষণা করেছি। জাপান থেকে বীজ ও মাটি নিয়ে আসার পর সেই মাটিতে ২০০৭ সালে ফুটেছিল ফুলটি। বাংলাদেশে ৮ প্রজাতির নন্দিনী ফুটেছে।