১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পপসঙ্গীতের নানা কথা

  • এনামুল হক

ক্ল্যাসিক্যাল বা চিরায়ত সঙ্গীত বলতে আমরা চিনি মোজার্টকে। তেমনি জ্যাজ সঙ্গীত বলতে চিনি আর্মস্ট্রং ও পার্কারকে। রক সঙ্গীত বলতে ডিলান ও বিটলসকে এবং হিপ-হপ সঙ্গীত বলতে বিগি ও টুপাককে। শুধু পপসঙ্গীতের এমন কেউ নেই যাকে সঙ্গীতের এই ধারার প্রতিভূ বা মূর্তরূপ বলা যায়। পপসঙ্গীতকে বাব্্ল গাম বা টিনি বপ টিউনও বলা হয় এবং তা নাইট ক্লাবের ড্যান্স ফ্লোরে ও টপ ৪০ রেডিওতে পরিবেশন করা হয়। ক্ল্যাসিক্যাল বা অন্যান্য সঙ্গীতের মতো সমালোচনাধর্মী, মূল্যায়ন ও উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা এই সঙ্গীতের বেলায় করা হয় না। পপসঙ্গীতের কোন প্রতিভূ বা ব্যক্তির মূর্তরূপ নেই। মাইকেল জ্যাকসন অতি জনপ্রিয় পপসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন বটে। তবে তাকে এই সঙ্গীতের মূর্তরূপ বলা চলে না। কারণ এই সঙ্গীতে তার অবদান পুরোপুরি মূল্যায়ন করে দেখার মতো সময় পাওয়া যায়নি। তার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল।

সম্প্রতি আমেরিকান জন সিব্রুকের ‘দি সং মেশিন’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ৩৩৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে পপসঙ্গীতের ২০ বছরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে দুটো ধারণাকে স্বতসিদ্ধ বলে ধরে নেয়া হয়েছে। দুটো ধারণার অতি মৌলিক দিকটা হলো এই যে কান ঝালাপালা করা আধুনিক পপসঙ্গীত হলো এক উঁচুমানের শিল্পিত রূপ যা অন্য যে কোনো সঙ্গীতের মতোই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। যেমন সিব্রুকের মতে, কেলী ক্লার্কসনের ‘সিনস্্ ইউ বিন গণ’ সঙ্গীতটি অসাধারণ, সুন্দর এবং রিহান্নার আমব্রেলার ‘হুকুস’ গানগুলো চমৎকার ও সুমিষ্ট তার দ্বিতীয় বক্তব্য হলো লোকে এ ধরনের অসাধারণ গানগুলোকে অন্যায়ভাবে খারিজ করে ফেলে। কারণ পপসঙ্গীত নিয়ে তাদের যে প্রত্যাশা সেটা ‘রক এন রোল’ আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। যখন গায়ক ও গীতিকাররাই ছিল এই সঙ্গীতের আদর্শ।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জনপ্রিয় সঙ্গীতের সবচেয়ে খ্যাতিমান ব্যক্তিদের অনেকেই কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন গীতিকার। এরা থাকতেন নিউইয়র্কের ওয়েস্ট ২৮তম স্ট্রিট এলাকায় যা টিন প্যান এ্যালি নামে পরিচিত। কোল পোর্টার ও ইরভিং বার্লিনের মতো একক কণ্ঠের গানের গীতিকার হোন কিংবা জর্জ ও ইরা গান উইন কিংবা রিচার্ড রজার্স এ অস্কার হ্যামার স্টেইনের মতো দ্বৈত কণ্ঠের গীতিকারই হোন এসব হিটমেকাররা তাদের রচিত গানে যারা কণ্ঠ দিতেন সেই শিল্পীদের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত ছিলেন। প্রথমদিকের রক গানের অনেকগুলো যার মধ্যে এলভিস প্রিসলীরও বেশকিছু ক্ল্যাসিক গান আছে সেগুলো ম্যানহাটানের মধ্যভাগের থ্রিল বিল্ডিংয়ের আশপাশে বসবাসরত গীতিকাররাই রচনা করেছিলেন। ফোক রক শিল্পী ও বিটলরাই প্রথম নজির স্থাপন করে দেখান যে কণ্ঠশিল্পীদের নিজেদের গান নিজেদেরই রচনা করা উচিত।

‘দি সংমেশিন’ এর নায়ক বা প্রধান চরিত্রগুলো টেইলর সুইকটের মতো শিরোনাম কাড়া কোন ব্যক্তি নন। বরং এরা হলেন সঙ্গীতের আড়ালে বা পিছনে থাকা ব্যক্তিবর্গ যারা সঙ্গীত রচনা করেছেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা হলেন পুরুষ। সিব্রুক তাদের ঊর্ধ্বে আরোহণকে বৃহত্তর সামাজিক ধারার ফসল বা পরিণতি হিসেবে দেখেন। তার কাহিনীজুড়ে যে বিষয়টি সর্বক্ষণ বিদ্যমান তা হলো প্রযুক্তিগত ব্যাঘাত।

১৯৭০-এর দশকে কম্পিউটারাইজড মিউজিক সফট্্ওয়্যারের আবির্ভাবের ফলে বাস্তবত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ও গান গাওয়ার ব্যাপারটা বাহুল্য বা তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। প্রযোজকরা এখন তাদের চাহিদামতো যে কোন ধরনের ধ্বনি কৃত্রিম উপায়ে লাভ করতে পারেন এবং বিপুলসংখ্যক টেক্্ থেকে সেরা একক সিলেবলগুলোকে কাজে লাগিয়ে এবং সেগুলোকে একটা পিচ্্ কালেক্টরের মধ্য দিয়ে চালিয়ে ভোকালগুলোকে একত্রে গ্রথিত করতে পারেন। পরবর্তীকালে এসেছে ইন্টারনেট ডাউনলোডিংয়ের মাধ্যমে মিউজিক্যাল কনজামশনের প্রধান ইউনিটট যা এলবাম থেকে সিঙ্গেলে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে। এতে করে মেলোডিক হুকের চাহিদা বহুলাংশে বেড়ে গেছে।

এসব আবিষ্কারের ফলে ক্ষমতার ভারসাম্যটা পারফর্মারদের হাত থেকে চলে গেছে প্রোডাকশন টিমের হাতে। আজ সঙ্গীতের প্রক্রিয়াটা প্রযোজকদের বিট ও কর্ড স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এরপর তারা রিক্রুট করেন ‘উপলাইনারদের’ যারা প্রায় ক্ষেত্রেই হয়ে থাকেন মহিলা। উদ্দেশ্য, তাদের দিয়ে সুর ও কণ্ঠের টুকিটাকি বিষয়গুলো ঝালিয়ে নেয়া এবং দেখা এগুলোর মধ্যে কোনটি আবেদন সৃষ্টি উপযোগী। লিরিক বা গান হলো পরবর্তী ভাবনার বিষয়। এভাবে তৈরি পণ্যটি তখন তারকা কণ্ঠশিল্পীদের কাছে ফেরি করা হয়।

সিব্রুকের বইটি পাঠকদের এ যুগের সবচেয়ে হাই প্রোফাইল কতিপয় সাংস্কৃতিক পণ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক জগতের ভিতরে নিয়ে যান সেখানে নারী-পুরুষের বিভাজনের এক অবিশ্বাস্য রকমের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বর্তমান। সিব্রুক বলেন, সে এক অদ্ভুদ জগত। পপ মিউজিকের জগতে শ্রম বিভাজনটা এত বেশি লিঙ্গ পার্থক্য নির্ভর যে এমনটা অন্য আর কোথাও কল্পনাও করা যায় না।

দি সং মেশিনে বর্ণিত পরিবর্তনের দ্বিতীয় চালিকাশক্তি হলো সংস্কৃতির বিশ্বায়ন। আজকের দি কোল পোর্টার ব্যান্ডের সদস্যরা প্রধানত হন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মানুষ। যেমন সুইডিশ সঙ্গীত প্রযোজক ম্যাক্স মার্টিন বিটলসদের চাইতে বেশি সংখ্যক হিট সঙ্গীত রচনা করেছেন সেগুলো জনপ্রিয়তার চার্টে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে। সিব্রুক মনে করেন আমেরিকান শ্রোতারা যে বিদেশের সঙ্গীতের সুরের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন এটা কোন দৈব-দুর্ঘটনার ব্যাপার নয়। শ্বেতাঙ্গ শিল্পীরা রক সঙ্গীতের প্রথম দিকে আফ্রিকান-আমেরিকানদের ব্লুজ সঙ্গীত থেকে উপাদান ধার করে নিলেও ১৯৯০-এর দশকের মধ্যে ব্ল্যাক মিউজিক চলে এসে বিট প্রধান হিপ-হপ সঙ্গীতের ধারায়। আর নির্ভানার মতো শ্বেতাঙ্গ ব্যান্ডগুলো বেসুরো রকের সুরেন ধারায় হারিয়ে যায়।

পক্ষান্তরে সুইডেনের মতো দেশ যেখানে এ্যাবার জন্ম, কখনই উঁচুমানের সুরের তৃষ্ণা হারিয়ে ফেলেনি। সুইডিশ সরকার বিনামূল্যে সঙ্গীত শিক্ষা দিয়ে থাকে। সে দেশের শিল্পীরা আমেরিকান সঙ্গীতের র‌্যাডিকেল সীমারেখায় আবদ্ধ থাকেনি। তারা নানা ধরনের মিশ্র সঙ্গীতের জন্ম দিতে পেরেছে। যেহেতু ইংরেজী তাদের প্রথম ভাষা নয় তাই তারা ইংরেজী সঙ্গীতের চর্চাটা অতি হেলাফেলায় এবং সেই সঙ্গে স্বচ্ছন্দে করেছে।

সিব্রুক পপসঙ্গীত নিয়ে লেখালেখির কাজটাকে স্পষ্টতই উপভোগ করেছেন। দি সং মেশিনে তিনি পাঠকদের একটু একটু করে হিট সঙ্গীতগুলোর মধ্য দিয়ে বিচরণ করিয়েছেন। তিনি তার গ্রন্থের প্রধান চরিত্রগুলোকে নিখুঁতভাবে চিচিত্র করেছেন। সিব্রুক পরিষ্কারভাবেই বলেছেন যে ক্লাসিক রক সঙ্গীতই হচ্ছে তার প্রথম প্রেম এবং সেটা তাই রয়ে গেছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট