১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাউফলে আজও থামছে না বাল্যবিয়ে- বছর ঘুরতেই সন্তান

বাউফলে আজও থামছে না বাল্যবিয়ে- বছর ঘুরতেই সন্তান
  • চন্দ্রদ্বীপের শিশুবধূরা

কামরুজ্জামান বাচ্চু ॥ বাউফলের চন্দ্রদ্বীপের করিম জান বিবি। বয়স ত্রিশের বেশি নয়। অথচ তাকে দেখলে মনে হয় ৬০ বছরের এক বুড়ি। ৬ কন্যা সন্তানের জননী তিনি। চন্দ্রদ্বীপের ব্যারেড গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক মোল্লার সঙ্গে যখন বিয়ে হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। এরপর বছর না ঘুরতেই করিমজানের কোলে আসে প্রথম সন্তান হাজেরা। এভাবে একের পর এক তার গর্ভে জন্ম হয় ফেরদৌসি, হেলেনা, রাহিমা, জান্নাত ও রহিমা নামের ৬ কন্যা সন্তানের। হাজেরা, ফেরদৌসি ও হেলেনাকে তাদের মা করিম জানের মতোই ভাগ্য বরণ করে নিতে হয়েছে। তারাও বাল্য বিয়ের শিকার হন। এদের মধ্যে আবার হাজেরা এখন দুই সন্তানের জননী, ফেরদৌসির এক সন্তানের জননী আর হেলেনা সন্তান সম্ভাবা। যে বয়সে ওদের সহপাঠীদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় খেলা করার কথা সেই বয়সে তাদের সামলাতে হচ্ছে ঘরকন্যার কাজ। এভাবেই পটুয়াখালীর এই চন্দ্রদ্বীপের কন্যাদের শিশুদের বয়সেই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। এরপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই গর্ভবতী হন তারা। দারিদ্র্য আর কুসংস্কারের কারণে গর্ভাবস্থায় এসব শিশুবধূর ভাগ্যে জোটে না কোন স্বাস্থ্য পরিচর্যা।

প্রসবকালেও পাশে থাকে না কোন প্রশিক্ষিত দাই।

ডাক্তার-নার্স তাদের কাছে স্বপ্নের মতোই। এই চন্দ্রদ্বীপে এখনও মরিচ পুড়ে তা প্রসূতি মায়েদের নাকের কাছে ধরে হাঁচি দিয়ে বাচ্চা প্রসব করানো হয়। পোড়া মরিচের ঝাঁঝে হাঁচি দিলে দ্রুত সন্তান প্রসব হয় এমন ধারণা এখনও বিরাজ করছে তাদের মধ্যে। তাই এ দ্বীপ ইউনিয়নের শিশুবধূদের স্বপ্ন তেঁতুলিয়া নদীর লোনা পানিতে ভেসে যায় দূর বহু দূরে। চন্দ্রদ্বীপের চর ফেডারেশনের আলম ফকিরের স্ত্রী ফেরোজা বেগম (২৫) জানান, তার বিয়ে হয় ১০ বছর আগে। তিনি এখন ৩ মেয়ে ১ ছেলের জননী। তার স্বামী আরও সন্তান নিতে চান। এ চরের গৃহবধূ শাহিনুরের ৬ সন্তান, হেলেনার ৫ সন্তান, হাসিনার ৪ সন্তান। এদের প্রত্যেকের স্বামী আরও সন্তান নিতে চান। তাদের স্বামীদের ধারণা বেশি সন্তান হলে ভূমিদস্যু লাঠিয়ালদের হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে পারবে। পাশাপাশি আয় রোজগারও বেশি হবে। এ চরের শতকরা ৬০ জন কৃষক ৩০ জন জেলে ও ১০ জন লোক নিয়মিত কোন পেশায় নেই। পাঁচ সন্তানের জননী চরমিয়াজানের রেহেনা বেগম (৩৫) বলেন, আল্লাহর দেয়া সৃষ্টিতে বাধা দিলে তিনি গোস্সা হন। ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েছেন তারা। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নেই। তাই তারা প্রকৃতির নিয়মেই সন্তান জন্ম দেন। এ ছাড়াও অধিক সন্তান অধিক উপার্জন। এই বিশ্বাসের কারণে এ দ্বীপের বাসিন্দারা সহজে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার করেন না। তাই বছরের পর বছর বাড়ছে মানুষ। বাড়ছে নতুন বাড়িঘর। কমছে আবাদি জমি। চরের মানুষ নিয়ে কাজ করেন এমন একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রোজেক্ট ম্যানেজার হেমায়েত উদ্দিন জানান, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ থাকলেও পটুয়াখালী জেলার বাউফলে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে জনবল সঙ্কট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলগুলো দুর্গম এলাকা হওয়ায় পরিবার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলোর মুখ দেখছে না। সেখানে পৌঁছায় না জন্ম নিয়ন্ত্রণের সেøাগান ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়।’ এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। কৃষি কাজ ও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা কেউই শিক্ষিত নন। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের কারণে এখানে অধিকাংশ মানুষ জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্বতি অবলম্বন করেন না। তাই একটি পরিবারে অধিক সন্তান থাকায় বাল্য বিয়ে বেশি হচ্ছে। অচিরে ওই ইউনিয়নে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও বাল্য বিয়ে রোধে জনসচেতনতার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেয়া হবে।