২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিজ দেশের মৃত্যুদণ্ড ও রদ করতে পারেনি

  • বিশ্বের ৫২ দেশে দশটি পন্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে

শংকর কুমার দে ॥ যুদ্ধাপরাধীদের নির্লজ্জ পক্ষাবলম্বনকারী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউসি), যুক্তরাজ্যের এ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের নিজ দেশসহ বিশ্বের ৫২ দেশে মৃত্যুদণ্ড বন্ধ বা রহিত করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৫২ দেশে ১০টি পন্থায় এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে ১০টি পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় তার মধ্যে কোন কোন পদ্ধতি রয়েছে যা খুবই বীভৎস পন্থা। অথচ এসব মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিজের দেশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর রহিত করতে না পারলেও বাংলাদেশের বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদ- কার্যকরের বিরুদ্ধে নাক গলায়। পুলিশ সদর দফতর সূতে এ খবর জানা গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন যে ১০টি পন্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে দড়িতে ঝুলিয়ে ফাঁসি, লেথাল ইনজেকশন, ফায়ারিং স্কোয়াড, ফায়ারিং, শিরñেদ, বৈদ্যুতিক চেয়ার, গ্যাস চেম্বার, পাথর ছোড়া, উঁচু জায়গা থেকে ফেলে দেয়া। বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেই ৫২ দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভিয়েতনামে ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়াসহ আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, ইরাক, জাপান, মালয়েশিয়া ও কুয়েত প্রভৃতি।

মৃত্যুদ-, অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি। এই শাস্তির বিধান পৃথিবীতে যতগুলো আইনী শাস্তির বিধান আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরানো। অতিতে বীভৎস পন্থায় মৃত্যুদণ্ড শাস্তি কার্যকর করা হতো। যুগের আধুনিকতার সঙ্গে অনেক দেশেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায়ও আধুনিকতার ছাপ দেখা যায়। বিশ্বের সব দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া এক নয়। কোন কোন দেশে কিভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তা তুলে ধরা হলো।

দড়িতে ঝুলিয়ে ফাঁসি ॥ বাংলাদেশসহ আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, ইরাক, জাপান, মালয়েশিয়া ও কুয়েতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচলন রয়েছে? মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত ব্যক্তিকে দড়িতে ঝুলিয়ে (ফাঁসি দিয়ে) রাখা হয় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। দড়িতে ঝুলন্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময় পরে নামিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার হাত পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়।

ইনজেকশন ॥ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য একটি উপায় হচ্ছে ইনজেকশন। তিনটি রাসায়নিক উপাদানে তৈরি এই ইনজেকশন মানবদেহে পুশ করলে তার মৃত্যু ঘটে। এ্যানেস্থেশিয়ার জন্য সোডিয়াম পেন্টোনাল, সম্পূর্ণ অক্ষম করার জন্য প্যানকিউরোনিয়াম ব্রোমাইড আর হৃদযন্ত্র থামিয়ে দেয়ার জন্য পটাশিয়াম ক্লোরাইড নামের তিনটি রাসায়নিক উপাদান ইনজেকশন তৈরি হয়। এই ইনজেকশন মানবদেহে ঢুকিয়ে যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তার মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভিয়েতনাম ইত্যাদি।

ফায়ারিং স্কোয়াড ॥ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আরেকটি উপায় হচ্ছে ফায়ারিং স্কোয়াড। মৃত্যুদণ্ডে দ-িত কয়েদিকে একটি ঘরের মধ্যে একটি চেয়ারে বসানো হয়। তার হাত পা মুখ বাঁধা অবস্থায় থাকে। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদির থেকে ২০ ফুট দূরে একটা দেয়াল থাকে যাতে ফাঁকা জায়গা করা থাকে। এখান থেকেই গুলি করা হয়। পরপর পাঁচ বার গুলি করা হয়। এ জন্য থাকে পাঁচটি রাইফেল। পাঁচটি রাইফেলের চারটিতে থাকে তাজা গুলি। আর একটিতে ফাঁকা গুলি। অর্থাৎ নিহত ব্যক্তি চারটি গুলির আঘাতে মারা যায়। অন্যদিকে পাঁচজন শুটারের মাঝে একজন শুটার তার হত্যাকারী নয়। কে হত্যাকারী নয় তা নির্ণয় করাও সম্ভব নয়। ফলে সবাই দাবি করতে পারে নিহত ব্যক্তি অন্তত তার গুলিতে মারা যায়নি। এটা যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরনো পদ্ধতি।

গুলি ॥ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আরেক পদ্ধতি হচ্ছে গুলি। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির চোখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে তাকে বসিয়ে বা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এরপর সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য একের পর এক গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। চীন, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বৈদ্যুতিক চেয়ার ॥ বৈদ্যুতিক চেয়ার হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আরেক পদ্ধতি। এতে কাঠের চেয়ার ব্যবহার করা হয়, যাতে বিশেষ পদ্ধতিতে ইলেকট্রিক লাইন দেয়া থাকে। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতকে সে চেয়ারে বসিয়ে হাত পা বুক ফিতা দিয়ে বাঁধা হয়। তার মাথায় মেটালিক হেলমেট পরানো হয়। ১০০০ থেকে ২৩০০ ভোল্ট বিদ্যুত প্রবাহিত করা হয়। প্রতিবার ৩০ সেকেন্ড করে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কয়েকবার এভাবে বিদ্যুত প্রবাহিত করা হয়? এই পদ্ধতিটা প্রচলিত আছে যুক্তরাষ্ট্রে।

গ্যাস চেম্বার ॥ গ্যাস চেম্বারে আবদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির মৃত্যু কার্যকর করার একটি পদ্ধতি। গ্যাস চেম্বার দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য আবদ্ধ ঘরের মতো যাতে একটি চেয়ার ও একটি সিলিন্ডার থাকে। সিলিন্ডারে সায়ানাইডের বড়ি থাকে এবং নিচে একটি পাত্রে সালফিউরিক এসিড থাকে। চেয়ারে বসিয়ে দ-িতের হাত পা বেঁধে দেয়া হয়। এবার বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে সিলিন্ডারের সায়ানাইড, সালফিউরিক এসিডে পড়ে। মুহূর্তেই বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়, যা মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যে অচেতন করে ফেলে। খিঁচুনি শুরু হয় এবং মৃত্যু ঘটে। আসামির মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর সেই চেম্বার বিষাক্ত গ্যাস মুক্ত করা হয়। ৩০ মিনিট পর সেই চেম্বার খুলে মৃত দেহ বের করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি রাষ্ট্রের মধ্যে কয়েকটি রাষ্ট্রে এই ধরনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

শিক্ষদ ॥ কয়েক হাজার বছর ধরেই শিক্ষকদের মাধ্যমে মৃত্যুদক্ষ কার্যকরের পদ্ধতি প্রচলিত আছে? তবে বর্তমানে শুধু সৌদি আরবে এই পদ্ধতিটি চালু রয়েছে। সাধারণত শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে ধরাল অস্ত্র দিয়ে প্রকাশ্যে শিরñেদ করা হয়। এই পদ্ধতিতে একবারে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এটা নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া, তবে ধর্মীয় বিধান থেকে এই ধরনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

পাথর ছুড়ে মারা ॥ মৃত্যুদ- কার্যকর করার জন্য মাটিতে পুঁতে বা কোন কিছুর সঙ্গে বেঁধে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার পদ্ধতি। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরানে এই পদ্ধতি আংশিকভাবে চালু আছে। মৃত্যুদ- কার্যকরের এই পদ্ধতিকেও কার্যকরকারীরা ধর্মীয় বিধান বলেই প্রচার করেন।

উঁচু থেকে ফেলে দিয়ে ॥ মৃত্যুদ- কার্যকর করার উপায়ের মধ্যে উঁচু থেকে ফেলে দেয়া একটি পদ্ধতি। অনেক উঁচু থেকে অভিযুক্তকে নিচে ফেলে দেয়ার মাধ্যমেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতিটি খুবই পুরাতন। এই পদ্ধতির কথা ইরানে প্রচলিত থাকার কথা জনশ্রুতি আছে।

হত্যার বদলা হত্যা ॥ কাউকে হত্যা করা হলে তার বদলে অনুরূপভাবে হত্যা করাটা হচ্ছে মৃত্যুদ- কার্যকর করার একটি পদ্ধতি। কাউকে যেভাবে হত্যা করা হয়, অভিযুক্তকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই পদ্ধতিটির প্রচলন আছে সুদানে।

পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড বিধানের প্রচলন আছে এমন দেশের সংখ্যা ৫২টি। তবে মৃত্যুদ- বিধান থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ নেই, এমন দেশের সংখ্যা ৪২টি। এ্যামনেস্টির ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে অনুযায়ী বিশ্বে কতটি দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই, কতটি দেশে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে, কতটি দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে আবার কতটি দেশে মৃত্যুদ- প্রয়োগ নেই, এমন ধরনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ যা ফায়ারিং স্কোয়াড, ইলেট্রিক চেয়ার, গ্যাস চেম্বার- এই তিন পদ্ধতিই ব্যবহার করে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার নিজের দেশে তিন ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি আছে যেটা বন্ধ করতে পারে না। হিউম্যান ওয়াচ রাইটস, এ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্বগণ নিজ দেশে মৃত্যুদ- রহিত করতে না পারলেও বাংলাদেশের বেলায় বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের নির্লজ্জ পক্ষবালম্বন করে তাদের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে তারাই ঘৃণা, বিদ্বেষ, রোষানলের শিকারের পরিণত হয়েছে।