২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নাক গলাবেন না ॥ পাকিস্তানকে সাফ জানিয়েছে বাংলাদেশ

নাক গলাবেন না ॥ পাকিস্তানকে সাফ জানিয়েছে বাংলাদেশ
  • সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানোয় পাক হাইকমিশনের মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানাল বাংলাদেশ;###;যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের লেখাতেও বলা হলো সাকা ছিল বাংলাদেশ আইএসআইর মূল স্তম্ভ

তৌহিদুর রহমান/আরাফাত মুন্না ॥ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে নাক গলাতে নিষেধ করা হলো পাকিস্তানকে। এছাড়া দেশটিকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে- যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাংলাদেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পুরোপুরি সমর্থন রয়েছে। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধী বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদ-ের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার প্রতিবাদে পাকিস্তানকে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে এসব বলেছে বাংলাদেশ সরকার। সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করে এসব জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এদিকে পাকিস্তানের দেয়া প্রতিক্রিয়ার প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ। বিভিন্ন মহল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিও উঠেছে। পাকিস্তানী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র বাংলাদেশের এই মূল স্তম্ভের জন্য পাকিস্তানের অবস্থান নেয়ায় ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। যুদ্ধাপরাধীর পক্ষ অবলম্বনকারী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানও তার লেখায় সাকাকে বাংলাদেশে আইএসআই’র মূল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে। এছাড়া কয়েকটি বিদেশী গণমাধ্যমে এ বিষয়ে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনে সমালোচনা করেছেন সংসদ সদস্যরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তলব করা হয়। এ সময় ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মিজানুর রহমান পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে কড়া প্রতিবাদপত্র তুলে দেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তলবের পর জানিয়ে দেয়া হয়েছে- পাকিস্তান সরকার সরাসরি এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তান সরকার কোনভাবেই যেন আর হস্তক্ষেপ না করে, সে বিষয়ে তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়। ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রতি বাংলাদেশে সাধারণ নাগরিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন রয়েছে বলেও জানানো হয় পাকিস্তানী হাইকমিশনারকে। তবে এ বিচার নিয়ে পাকিস্তান যা বলছে, সেটা অগ্রহণযোগ্য ও অনাকাক্সিক্ষত বলেও উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পাকিস্তানকে দেয়া প্রতিবাদপত্রে উল্লেখ করা হয়- বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিচার নিয়ে পাকিস্তান বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তবে এ গণহত্যার বিচারে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা প্রবল। পাকিস্তান এ বিষয়ে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চালালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয়- বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিচার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে এ বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। কোন পক্ষ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রেক্ষিতে এ বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে না বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবাদপত্রে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে প্রতিবাদপত্র তুলে দেয়ার পর দেশটির হাইকমিশনার সুজা আলম বলেন, পাকিস্তান সরকারকে এ বিষয়ে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে অবহিত করবেন। এদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য দেয়া হতে পাকিস্তান যেন বিরত থাকে।

সোমবার দুপুরে প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে ডাকা হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ভবন পদ্মায় ডেকে আনা হয় পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে। এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মিজানুর রহমান তার সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন। বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদপত্র তুলে দেয়া হয় পাকিস্তানী হাইকমিশনারকে।

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে নিয়মবহির্ভূত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছিল পাকিস্তান। সর্বশেষ রবিবার রাতে ঢাকায় বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এই দুই নেতাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর পর এক বিবৃতিতে উদ্বেগের কথা জানায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কাজী এম খলীকুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুদ- কার্যকরে আমরা গভীর উদ্বেগ ও বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করলাম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর দোসর কয়েকজনের সাজার পর এই দুজনের মৃত্যুদ- কার্যকরের ঘটনায় ইসলামাবাদের নাখোশ হওয়ার কথাও বলা হয়েছে বিবৃতিতে। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের এ বিচারকে ‘প্রহসন’ আখ্যায়িত করে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার কথাও বলেছে পাকিস্তান। ১৯৭১ সালের বাঙালীর ইতিহাসের মর্মান্তিক অধ্যায়কে পাশে রেখে ১৯৭৪ সালের ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ চুক্তির আলোকে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ঢাকার প্রতি আহ্বান রেখেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এই বিবৃতির প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করা হয়।

এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল বিবৃতির পর দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খানও বাংলাদেশের চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে ইঙ্গিত করে নেতিবাচক বক্তব্য দেন। তিনি দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির দ-কে পাকিস্তানের সমর্থকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে মন্তব্য করেন।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরের পর পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল জিয়ো টিভির এক প্রতিবেদনে বলা উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান বলেছেন, পাকিস্তানের সমর্থক কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ বন্ধ করার এটাই উপযুক্ত সময়। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণ অতীতের তিক্ততা পেছনে ফেলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তার মতে, পাকিস্তানের সমর্থক কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ বন্ধ করার এটাই উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দ- কার্যকর হলেও বিশ্ব নীরব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো বিশ্ব বিশেষ করে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নীরবতায় তিনি বিস্মিত। এছাড়া সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির পর পাকিস্তানের ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়Ñ ‘বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরা এ বিচারপ্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ এ বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদ- রক্ষা করতে পারেনি।’

সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির পর পাকিস্তান সরকারের পাশাপাশি সেদেশের জামায়াতে ইসলামীও নিন্দা জানায়। তাদের ফাঁসি কার্যকরের সমালোচনা করে দেশটির জামায়াতে ইসলামীর আমির সিরাজুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে জামায়াত নেতাকে ফাঁসি দেয়া যথেষ্ট নিন্দনীয়। অপর এক জামায়াত নেতা লিয়াকত বিলুচ বলেন, বাংলাদেশ সরকার ভারতের ইঙ্গিতে বিরোধী দলকে প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এভাবে পাকিস্তান সরকারের পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন দলও এ বিচারের সমালোচনা করে। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে এমন ধরনের বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র দেয়া হয়।

এদিকে সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদ-ের বিষয়ে পাকিস্তানকে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানানোর জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে নির্দেশনা দেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। তারা যেন কোনভাবেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে। প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের ভূমিকায় ক্ষোভও প্রকাশ করেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা বলছেন, নিজামী, মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, সাকা চৌধুরীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র ধরেছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে। লাখ লাখ বাঙালী হত্যা করে তাদের ‘মনিব’ পাকিস্তানীদের সুদৃষ্টি অর্জনের চেষ্টায় রত ছিলেন যুদ্ধের নয় মাস। দোসরদের এই কীর্তির কারণে ৪৪ বছর পরও কৃতজ্ঞ পাকিস্তান। এ কৃতজ্ঞতা থেকেই পাকিস্তান সরকার নানা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদ- নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল থেকেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়ে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক জনকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে পাকিস্তান বিবৃতি দেয়াই প্রমাণ করে ওই যুদ্ধাপরাধীরা কখনই এদেশের নাগরিক ছিল না। তারা সব সময়ই পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করেছে। পাকিস্তান এ বিবৃতি দিয়ে চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, ভিয়েনা কনভেনশনের ৪১ অনুচ্ছেদে বলা আছেÑ কোন কূটনীতিক যে দেশে থাকে ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন মন্তব্য করা যাবে না। পাকিস্তানের ওই মন্তব্য ভিয়েনা কনভেনশনের খেলাপ। জাতিসংঘ সনদের ২-এর(৭) অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছেÑ কোন রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন কথা বলবে না, হস্তক্ষেপ করবে না। পাকিস্তান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। তাই পাকিস্তানের বিষয়টি জাতিসংঘে উঠানো উচিত বলেই আমি মনে করি।

বিচারপতি মানিক আরও বলেন, দেশে যখন বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় থাকে তখন পাকিস্তান কোন কথা বলে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই পাকিস্তানের মাথা গরম হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে আর সেই গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে সাকা, মুজাহিদ, গোলাম আযম, কাদের মোল্লারা। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যাকারীদের ক্ষমা করার বিধান আন্তর্জাতিক আইনেও নেই। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানাচ্ছি।

পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির জনকণ্ঠকে বলেন, পাকিস্তান এ বিচারের শুরু থেকে নানা ধরনের আপত্তিকর ও ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করে আসছে। সব রকম কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেই তারা এসব কাজ করছে। শুধু যুদ্ধাপরাধ বিচার বানচাল করতেই তারা এসব কাজ করছে। তিনি বলেন, এর একটাই কারণÑ বিচারের প্রতিটি রায়ে গণহত্যার জন্য বার বার পাকিস্তানকে দায়ী করা হচ্ছে। যাদের বিচার করা হচ্ছে তারাও নিজেদের বাঁচাতে পাকিস্তানীরা গণহত্যা চালিয়েছেÑ এসব কথা বলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এ খবর ফলাওভাবে প্রচার করা হয়। এটা তারা মেনে নিতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, যাদেন বিচার করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই জামায়াতে ইসলামীর নেতা। আর জামায়াতের প্রধান কার্যালয় হচ্ছে পাকিস্তানে।

শাহরিয়ার কবির বলেন, সাকা চৌধুরীর বিষয়টি হচ্ছেÑ তিনি ছিলেন বাংলাদেশে আইএসআই’র (পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা) প্রধান এজেন্ট। এদেশে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিকসহ সকল স্বার্থই দেখত সাকা চৌধুরী। তাই পাকিস্তানের কাছে তাদের বন্ধুদের বিচার প্রত্যাশিতও নয়। এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীরা যে তাদের বন্ধু তারই প্রমাণ দিয়েছে তারা। তিনি আরও বলেন, এখন বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে কঠোরভাবে পাকিস্তানের এসব ঔদ্ধত্য প্রতিহত করা।

সাকা চৌধুরী পাকিস্তানের আইএসআই’র বাংলাদেশে প্রধান এজেন্ট ছিলেন বলে এমন তথ্য উঠে এসেছে যুদ্ধাপরাধের পক্ষে অবস্থান নেয়া সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের একটি ব্লগে। বাংলাদেশ ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল নামে ওই ব্লগে ‘সাকা চৌধুরী বিচারের বিষয়ে ১০টি উদ্বেগ’ শিরোনামে ওই লেখায় বলা হয়Ñ ‘একাধিক সূত্র জানায়, ১৯৭৫ সালের পর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার জন্য প্রধান এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় (২০০১-২০০৬) সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। সেসময় সাকা চৌধুরী বাংলাদেশে ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির বিনিয়োগ বন্ধ করে দেন। এর মধ্যে ভারতের টাটা গ্রুপের ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্রকল্প ছিল। সাকা চৌধুরীর আইএসআই’র সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রত্যাশা করছিল, স্বাধীনতা যুদ্ধের ভূমিকায় তাকে যেন মৃত্যুদ- দেয়া হয়।’

মৃত্যুদ-ের আগে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য পাঁচ পাকিস্তানী নাগরিক সাফাই সাক্ষী দিতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মিয়া সুমরো, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইসহাক খান খাকওয়ানি, ডন মিডিয়া গ্রুপের চেয়ারপার্সন আম্বার হারুন সাইগল, স্থপতি মুনিব আরজুমান্দ খান ও ভিকারুন্নেসা নূনের নাতি রিয়াজ আহমেদ নূন। এই পাঁচ পাকিস্তানী নাগরিক আইএসআই’র সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুানালের মাধ্যমে যে বিচার হয়েছে তা ছিল স্বচ্ছ। যেখানে আসামিকেও পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেয়া হয়। তাই এ স্বচ্ছ বিচার নিয়ে কে কি বলল সেটা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের নাক গলানোর কিছু নেই। প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, ’৭১ সালের পাকিস্তানের চিহ্নিত যে ১৯৪ জন যুদ্ধাপরাধী ছিল, যাদের নিজ দেশে বিচার করবে বলে চুক্তি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান তাদের বিচার করেনি। আমি তাদের বিচারের দাবি করছি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবেÑ এসব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু করতে পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে।

এর আগে গত বছর নবেম্বর মাসে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচার নিয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেদেশের জামায়াতে ইসলামীর দেয়া নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার আহমদ হোসেইন দায়োকে তলব করে সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের একজন মন্ত্রিসভার সদস্যের দেয়া বিবৃতির জের ধরে সে সময় তাকে তলব করা হয়।

এছাড়া ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের পরে পাকিস্তান সরকার একটি নেতিবাচক বিবৃতি দিয়েছিল। সে ঘটনায়ও ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের তৎকালীন হাইকমিশনার মিয়া আফরাসিয়াব মেহেদী হাশমি কোরেশীকে তলব করে সরকার। সে সময় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকরের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। পাকিস্তান জামায়াতের সাংসদ শের আকবর খান তখন প্রস্তাব উত্থাপন করলে তাতে সমর্থন জানায় সরকারী দল মুসলিম লীগ। এ ছাড়া ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কায়েদে আজম) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এই প্রস্তাবে সমর্থন জানায়।

গত বছরের ২৯ অক্টোবর আলবদর বাহিনীর প্রধান ও জামায়াতের নেতা নিজামীকে মৃত্যুদ- দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের খবরে ওই বছরের পহেলা নবেম্বর এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী গভীরভাবে শোকাহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। আরেক যুদ্ধাপরাধী আজীবন কারাদ-ের সাজাপ্রাপ্ত গোলাম আযমের মৃত্যুতে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে গায়েবানা জানাজা পড়েন সে দেশের জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে ‘আজীবন বন্ধু’ স্বীকৃতি দেয় দেশটি। গোলাম আযমের গায়েবানা জানাজা পড়ান পাকিস্তান জামায়াতের আমির সিরাজুল হক। জানাজার সময় তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক গোলাম আযমের শাহাদাতে আমরা গর্ববোধ করি। ঢাকার কারাগারে নির্যাতনমূলক পরিবেশে গোলাম আযমের শাহাদাত বরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরাউন শেখ হাসিনা ওয়াজেদের সরকারের স্থায়ী পতনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গেছে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ॥ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোন দেশের বিরূপ মন্তব্য গ্রহণ করার মতো পর্যায়ে বাংলাদেশ এখন আর নেই। সোমবার পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে ডেকে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বিষয়ে ‘কড়া প্রতিবাদ’ জানানোর পর প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, শুধু পাকিস্তান কেন, পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রের কাছ থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের, মানবতাবিরোধী বিচারের প্রশ্নে আমরা কোন নেতিবাচক মন্তব্য গ্রহণ করব না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন, প্রথম যখন ফাঁসি কার্যকর হয়, তখন যে ধরনের আন্তর্জাতিক মতামত ছিল। আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে, গত দুই বছরে এর অনেকখানি পরিবর্তন হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম যে এবার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং মুজাহিদের ফাঁসির আগে এবং পরে কোন রাষ্ট্র আলাদাভাবে আমাদের কাছে কোন নেতিবাচক মন্তব্য করবে না। কারণ এই প্রশ্নে কোন রাষ্ট্রের নেতিবাচক মন্তব্য গ্রহণ করার অবস্থায় বাংলাদেশ এখন আর নেই। সেই জায়গা থেকে বলব যে, আমরা অবশ্যই কিছুটা হতাশ যে, আমাদের প্রতিবেশী একটি দেশ- তারা এ ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন, যার কোন প্রয়োজন ছিল না। পাকিস্তান ওই বিবৃতি দিয়ে ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ’ করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ একটি বিষয়ে তারা মতামত দিয়েছেন। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়ার জন্য হাইকমিশনারকে আজকে আমরা আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি। এ বিষয়ে তাদের সরকারের যে অবস্থান এতদিন ছিল, আশা করি এখন তার পরিবর্তন হবে।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৩ সালে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাার মৃত্যুদ- কার্যকরের পরও উদ্বেগ জানিয়েছিল পাকিস্তান। সেই প্রসঙ্গে টেনে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার বলেন, পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সে সময় প্রস্তাব গ্রহণ করলেও তারা কিন্তু তখন বাংলাদেশ সরকারকে তা কনভে করেনি। আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম যে সেখানেই বোধ হয় এটা শেষ। কিন্তু পররাষ্ট্র দফতর যখন একটি কথা বলে সেটা রাষ্ট্রের অবস্থানকেই তুলে ধরে।

পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার যে দাবি গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের অবস্থান আমি এখনই বলতে পারব না। তবে দেশপ্রেমিক জনগণ, দেশের তরুণ সমাজ এ দাবি করতেই পারে। এ দাবি তারা কেন করছেন তা বোধগম্য। তারপরও একটি ঘটনা একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন বা পুনর্স্থাপনের মাপকাঠি হতে পারে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমি আশা করি, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না, তাদের (পাকিস্তান) শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

সংসদ রিপোর্টার জানান, যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদ-াদেশ কার্যকর নিয়ে পাকিস্তানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য এবং আলজাজিরাসহ কিছু বিদেশী গণমাধ্যমে সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদকে বিরোধী দলের নেতা উল্লেখ করে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের কড়া সমালোচনা করেছেন সংসদ সদস্যরা। তাঁরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জড়িতদের দ্রুত তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানানোর দাবি জানিয়ে বলেন, বিদেশী প্রভুরা এখানে কর্তৃত্ব করতে চায়। এরা আমাদের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও আইনের প্রতি হস্তক্ষেপ করতে চায়। কিন্তু বাংলার জনগণ কারোর কর্তৃত্ব বা প্রভূত্ব কখনোই মেনে নেবে না। স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সোমবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তাঁরা এসব কথা বলেন।