২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশকে অভিশাপমুক্ত করছি

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশকে অভিশাপমুক্ত করছি
  • সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীরা যে অপরাধ করেছে, তার কোন সীমা নেই। এদের বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে দেশ কখনই অভিশাপমুক্ত হবে না। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ এই অভিশাপ বইয়ে বেড়াচ্ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের আমরা বিচার ও রায় কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের ফলে একাত্তরের স্বজনহারা পরিবারগুলো কিছুটা হলেও সান্ত¡না পাচ্ছে। আমরা দেশকে অভিশাপমুক্ত করছি বলেই বাংলাদেশ আজ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে। তাই যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করা হোক না কেন, বাংলাদেশের এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে কেউ রুখতে পারবে না।

সোমবার রাতে স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে দশম জাতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করে আরও বলেন, বাংলাদেশে কোন আইএস বা জঙ্গীবাদের স্থান না হয় এ জন্য আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করি। বাংলাদেশ নিরাপদ বা অনিরাপদ এ নিয়ে আমাদের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। অনেকেই জোর-জবরদস্তি করে বাংলাদেশে আইএস বা জঙ্গী আছে এ কথা বলানোর চেষ্টা করেছে। যেসব দেশ একসঙ্গে বসে এসব কথা বলানোর চেষ্টা করছে, তাদের দেশের অবস্থা কী?

এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছি, বাংলাদেশে কোন আইএস কিংবা জঙ্গীদের স্থান হতে দেব না। পৃথিবীতে প্রতিটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশে কিছু না কিছু গোলমাল লাগানো হচ্ছে। কিন্তু সেদিক থেকে বাংলাদেশকে আমরা নিরাপদ রাখতে সক্ষম হয়েছি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিরাপত্তা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই রিপোর্টেই স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশ থেকেও নিরাপদ। এই শান্তিপূর্ণ অবস্থা যাতে ধরে রাখা যায় সে ব্যাপারে তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রায় ৪০ মিনিটব্যাপী সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, দেশীয়-আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্র, বিএনপি-জামায়াত জোটের নাশকতা-সন্ত্রাস-মানুষ হত্যাসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদও সমাপনী বক্তব্যে রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে শেষে স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী রাত ৯টায় অষ্টম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যারা দেশে জঙ্গী বা আইএস বলে বলার চেষ্টা করছে, তারাই পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির দোষ দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পায়নি। আমরা নিজেরাই পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি। তিনি বলেন, আমরা দুর্নীতি কিংবা নিজেদের ভাগ্যে গড়তে ক্ষমতায় আসিনি, আমরা জনগণের ভাগ্যে গড়তে ও তাদের কল্যাণে ক্ষমতায় এসেছি। বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। বাংলাদেশ যে উন্নয়নের গতিশীলতা ধরে রেখে এগিয়ে চলেছে, যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করা হোক না কেন, সেই উন্নয়নের গতিধারা কেউ রুখতে পারবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অর্ডিন্যান্স জারি ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। অনেক যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার এবং তাদের বিচার শুরু হয়েছিল। অনেক যুদ্ধাপরাধীর শাস্তিও হয়েছিল। বিচারের ভয়ে একাত্তরের গণহত্যাকারী অনেক যুদ্ধাপরাধী পালিয়ে পাকিস্তানে গিয়ে সে দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিল। কিন্তু ’৭৫-এর পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়া সে সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেয় এবং তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল। যুদ্ধাপরাধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী এবং কুখ্যাত গণহত্যাকারী আবদুল আলিমকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল এই জিয়াউর রহমান।

তিনি বলেন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার জিয়াউর রহমান বন্ধ করে দিয়েছিল, আমরা তাদের বিচার করে দেশকে অভিশাপমুক্ত করছি। বিচারের রায় কার্যকর দেখে একাত্তরের স্বজনহারা পরিবারগুলো অন্তত কিছুটা শান্তি পাচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু যুদ্ধাপরাধীদেরই নয়, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদেরও এই জিয়া প্রতিষ্ঠিত ও পুরস্কৃত করেছে। পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদের সময়ও বঙ্গবন্ধুর খুনী ফারুককে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হয়েছিল, রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। আর খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনী রশিদকে প্রহসনের নির্বাচনে বিজয়ী করে এনে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসিয়েছিল। আমরা ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করেছি, রায়ও কার্যকর করেছি। জেলহত্যার বিচারের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করেছি।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন ঠেকানোর নামে খালেদা জিয়া শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। আবার ২০১৫ সালে আন্দোলনের নামে তিনটি মাস নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থেকে দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন। সরকারকে উৎখাত না করে ঘরে ফিরবেন এ কথা বলে দলীয় কার্যালয়ে স্বেচ্ছায় অবরুদ্ধ থেকে হরতাল অবরোধের নামে প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে হত্যাসহ ৫০৮ জন মানুষকে পুড়িয়েছেন। আন্দোলনের নামে এমন হত্যাযজ্ঞ দেশের মানুষ অতীতে কখনও দেখেনি। তিনি জানুয়ারিতে যে অবরোধ ডেকেছিলেন, তা এখনও প্রত্যাহার করেননি। এখনও খালেদা জিয়ার ডাক অবরোধ চলছে।

সংসদ নেতা বলেন, আন্দোলনের নামে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার পর কিছুই করতে না পেরে বিএনপি নেত্রী বিদেশে গেলেন। আর তখনি আমাদের দেশে দুজন বিদেশী নাগরিককে হত্যা করা হলো। আর এক বিদেশীকে হত্যার চেষ্টা চালনো হলো। তিনি বলেন, বিদেশী নাগরিককে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের আমরা শনাক্ত করেছি, অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব হত্যাকা-ের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দেশের কোথাও জঙ্গী-সন্ত্রাসী দেখলে তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করতে দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন মাসের অবরোধ-হরতাল ও ধ্বংসযজ্ঞের পরেও আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী। প্রবৃদ্ধিও ৬ দশমিক ২ ভাগের ওপরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। দারিদ্র্যতা ৫৭ ভাগ থেকে ২২ ভাগে নেমে এসেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার কারণে দেশে আয় বৈষম্য কমে গেছে, দেড় কোটি বেকারকে আমরা চাকরি দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা সমগ্রকে দেশকে উন্নতি করতে এক শ’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলেছে, উন্নয়নের গতিধারা ধরে রাখতে আমরা সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নি¤œ মধ্যবিত্তের দেশে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আমরা নিম্নে থাকতে চাই না, বিশ্বের মধ্যে উচ্চ মর্যাদায় দেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে যারা অতীতে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত, তারাই এখন বলছে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি, আমরা বীরের জাতি। আমরা কেন পরের কাছে হাত পেতে চলব? দেশের জনগণকে উপলব্ধি করতে হবে, এ দেশটা আমাদের। বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা কারোর কাছে মাথানত করতে পারি না। করবও না। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি, যা বঙ্গবন্ধু আমাদের শিখিয়ে গেছেন, পথ দেখিয়ে গেছেন। সেই পথেই আমরা দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবই ইনশাল্লাহ।

বাংলাদেশ বিদেশীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশ- রওশন এরশাদ ॥ বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ সমাপনী ভাষণে অংশ নিয়ে বলেন, হঠাৎ করেই দেশে তাজিয়া মিছিলে হামলা, বিদেশী নাগরিক হত্যাসহ নানা ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের হামলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর হামলা। কারা করেছে, কে করেছে- তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তিনি বলেন, সরকার উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাক, আমরা বিরোধী দল সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি, আগামীতেও দেব।

তিনি বলেন, এসব ঘটানো হচ্ছে যাতে অনেকেই মনে করে বাংলাদেশ বিদেশীদের জন্য নিরাপদ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে সবার হাতে অস্ত্র আছে, প্রতিদিন পাখির মতো মানুষ মরছে। সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেউ অনিরাপদ বলে না, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে না। এসব ঘটনায় কারোর বিবেক জাগে না? কেন আমাদের দেশে দু’-একটা ঘটনা ঘটলেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে? বরং আমি বলব, বাংলাদেশ বিদেশীদের জন্য বিশ্বের মধ্যে অন্যতম নিরাপদ দেশ। এ দেশে বিদেশীদের যে সম্মান দিয়ে আমরা রাখি, পৃথিবীর কোন দেশে তা দেয়া হয় না।

মন্ত্রীরা শুধু নিজের এলাকার নন, গোটা দেশের মন্ত্রী উল্লেখ করে রওশন এরশাদ বলেন, আমরা দেখি না মন্ত্রীরা সমস্যাসঙ্কুল এলাকায় যেতে। মন্ত্রীরা শুধু ঢাকায় কিংবা নিজের এলাকায় যান, অন্য কোথাও যান না। তাই মন্ত্রীদের অনুরোধ করব, ঘুরে ঘুরে দেখুন দেশের মানুষ কেমন আছে, কী কী সমস্যা তাদের। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও বলব, সারাদেশে ঘুরে দেখুন মাদকের ছোবলে কীভাবে নতুন প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই মাদকের জন্য আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। সন্ত্রাসের পাশাপাশি এই মাদককেও নির্মূল করতে হবে। তিনি বলেন, রাস্তায় যত্রতত্র হকার ও হাট-বাজার, দোকানপাট খোলা বন্ধ, রাস্তায় নির্মাণ সামগ্রী রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং পার্কিং বন্ধ করা যায়, তবে রাজধানীর যানজট অবশ্যই বহুলাংশে কমে যাবে। তিনি ময়মনসিংহে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর ও শান্তিময় দেশ হিসেবে গড়ে তুলি।