২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পিএইচডি ডিগ্রীর মান রক্ষা করা যাচ্ছে না

  • মূল্যায়নে সামান্যই অর্থ পান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা;###;ফি বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

নাজনীন আখতার/বিভাষ বাড়ৈ ॥ সর্বোচ্চ ডিগ্রী পিএইচডিতে অধ্যয়নরতদের থিসিস মূল্যায়নে সামান্যই অর্থ পাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। নগণ্য অর্থ হওয়ায় বিশেষজ্ঞ এ শিক্ষকরা থিসিস মূল্যায়নে ক্রমেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। যার ফলে পিএইচডিতে অধ্যয়নরতদের থিসিস সঠিকভাবে মূল্যায়িতও হচ্ছে না। নগণ্য অর্থ দিয়ে পিএইচডির মান রক্ষা করাও কঠিন বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা পিএইচডির মান রক্ষায় থিসিস মূল্যায়ন ফি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা কমিটির বাইরের ব্যক্তিরা থিসিস মূল্যায়ন করতে পারলেও বাংলাদেশে সে সুযোগ নেই। সুপারভাইজারের অধিন পরীক্ষা কমিটির সদস্যরাই কেবল থিসিস মূল্যায়ন করতে পারেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির শিক্ষার্থীদের থিসিস মূল্যায়নসহ প্রোগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবস্থান সম্পর্কে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থিসিস মূল্যায়ন ফি দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই নগণ্য। ভারতে পিএইচডি করতে আগ্রহীদের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। সম্প্রতি ভারতের একটি গণমাধ্যম তার এক প্রতিবেদনে পিএইচডি ডিগ্রীর মান নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছে। যেখানে বলা হয়েছে, নগণ্য অর্থ দিয়ে মূল্যায়নের জন্য দিল্লীতে পিএইচডিতে অধ্যয়নরতদের থিসিস বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। মূল্যায়ন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাত্র এক হাজার থেকে আড়াই হাজার রুপী পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেয় বলে থিসিসগুলো যেনতেনভাবে দেখা হয়। থিসিস পেপার দেখতে নিয়েই পাস নম্বর দিয়ে দেন বিশেষজ্ঞরা। এটাকে ‘টাচ এ্যান্ড পাস’ উল্লেখ করে এ মন্তব্য করেছেন ভারতের কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের সাবেক বিজ্ঞানী বিমল কান্তি সেন। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডির থিসিস মূল্যায়নের জন্য ওই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। সেক্ষেত্রে ফ্যাকাল্টির শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ও গবেষণা কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে বেশিরভাগ থিসিস মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছে।

এ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘ইউনিভার্সিটি নিউজ’ এ বিমল কান্তি সেন লিখেছেন, থিসিস মূল্যায়নের জন্য ১৫ কার্যদিবস প্রয়োজন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত একজন শিক্ষক মাসে ৮০ হাজার রুপী আয় করেন। সেখানে ১৫ কার্যদিবসের জন্য একটি থিসিস মূল্যায়নে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সর্বোচ্চ আড়াই হাজার রুপী পেতে পারেন। আর এই নগণ্য পারিশ্রমিকের কারণে ‘টাচ এ্যান্ড পাস’ নীতি অনুসরণ করতে পারেন তারা। এর ফলে দেখা যায়, থিসিসের রেফারেন্স, পরিসংখ্যানজনিত এবং পর্যালোচনা ঠিকভাবে না থাকলেও তা চোখ এড়িয়ে অনুমোদন দিয়ে দেন তারা। সেন জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি এই মূল্যায়ন ফি বাড়িয়ে আড়াই হাজার রুপী করেছে। তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ১ হাজার রুপী দিয়ে থাকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ শ’ রুপী থেকে বাড়িয়ে আড়াই হাজার রুপী করেছে এক মাস আগে। জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ২ হাজার রুপী এবং দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় ১৫শ’ করে পারিশ্রমিক দিচ্ছে থিসিস প্রতি।

গুরু গোবিন্দ সিং ইন্দ্রপ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক এন রঘুরাম বলেছেন, খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ই বাইরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কঠোরভাবে থিসিস মূল্যায়ন করে। বেশিরভাগই এ কাজে অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগ করেন যাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের কাছে থিসিস পেপারগুলো পাঠানো হয় না।

এত গেল ভারতের অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে থিসিস মূল্যায়ন ভারতের তুলনায় কিছুটা বেশি। যদিও তার পরিমাণও বেশি নয়। এ পরিমাণ তিন থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বাংলাদেশে সুপারভাইজার ও পরীক্ষা কমিটির বাইরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা অন্য কাউকে দিয়েই থিসিস মূল্যায়নের কোন সুযোগ নেই। পিএইচডি করতে আগ্রহীদের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এ স্বচ্ছতা আরও বেশি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর বলছিলেন, নগণ্য অর্থ দিয়ে পিএইচডির মান রক্ষা করা কঠিন। পিএইচডির মান রক্ষায় থিসিস মূল্যায়ন ফি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের অত্যন্ত বড় একটি কাজের জন্য তো অবশ্যই সেভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। নগণ্য ফি দিলে শিক্ষকরা স্বাভাবিকভাবেই সে কাজে আগ্রহী হবেন না। তাতে কাজের মানও খারাপ হতে বাধ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে থিসিস মূল্যায়ন ফি সবচেয়ে বেশি আছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে। এখানে শিক্ষার্থীর থিসিস প্রতি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পান সাত থেকে ৮ হাজার টাকা। বুয়েটের শিক্ষকরা বলছেন, একজন পিএইচডি প্রার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে অনেক কাজ করতে হয়। সে হিসেবে সেভাবে মূল্যায়ন করা জরুরী। বুয়েটে পিএইচডির সুপারভাইজারের অধীনে থিসিস মূল্যায়নে গঠন করা হয় ‘বোর্ড অব এক্সামিনার্স’। যেখানে ৫ থেকে ৭ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা থাকেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস মূল্যায়নে শিক্ষক পান সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা। এখানেও পিএইচডির সুপারভাইজারের অধীনে থিসিস মূল্যায়নে গঠন করা হয় ‘বোর্ড অব এক্সামিনার্স’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলছিলেন, পিএইচডির থিসিস মূল্যায়ন ফি আমাদের দেশে নগণ্যই। তবে থিসিস মূল্যায়নে কমিটির বাইরের কারও কোন হাত থাকার সুযোগ নেই আমাদের দেশে। আসলে ভারতেও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা হয়। এ শিক্ষাবিদ বাংলাদশে পিএইচডির ভাল মান নিশ্চিত করার বিষয়টি উল্লেখ করে আরও বলেন, পিএইচডি প্রোগ্রামে অস্বচ্ছতার কোন সুযোগ নেই। বিষয়টি এতই কঠোরভাবে দেখা হয় যে, সংশ্লিষ্ট তিন শিক্ষক প্রার্থীর থিসিসকে পজেটিভ না বললে তাকে ভাইভার জন্যই ডাকা হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, শিক্ষকদের থিসিস মূল্যায়ন ফিসহ তাদের মর্যাদা বাড়ানো জরুরী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস মূল্যায়নে কমিটির শিক্ষকরা পান থিসিস প্রতি মাত্র তিন হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষকরা বলছিলেন, একটি থিসিস পেপারের জন্য অনেক কাজ করতে হয় শিক্ষককে। থিসিস মূল্যায়ন ফি বাড়ানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে বহুবার বলা হয়েছে কিন্তু এটার বিষয়ে কোন কর্তৃপক্ষই মনোযোগী নয়। কর্র্তৃপক্ষ সব সময়েই বলে, গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ কম। তবে বর্তমান উপাচার্য শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে আন্তরিক বলে বলছেন শিক্ষকরা। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আফসার আহমদ হতাশা প্রকাশ করে বলছিলেন, আমাদের থিসিস মূল্যায়ন ফি খুব কম। মাত্র তিন হাজার টাকায় এমন একটি বড় কাজ করা সম্ভব হয় না। এই টাকা কম পক্ষে ১০ হাজার টাকা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষক। কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও একই অবস্থা। কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, এই ফি বাড়ানো দরকার। কিন্তু বাজেটে গবেষণা খাতে টাকা বরাদ্দ কম থাকায় চাইলেই করা সম্ভব হয় না।

স্বচ্ছতার মাঝেও আছে অভিযোগ ॥ দেশে থিসিস মূল্যায়নে স্বল্প ফি নিয়েও শিক্ষকদের স্বচ্ছতা যেমন আছে তেমনি থিসিস নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগও ওঠে মাঝে মাঝেই। কিছুদিন আগেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজাদী পারভীনের বিরুদ্ধে ছাত্রের পিএইচডি থিসিসের প্রায় ৯০ ভাগ হুবহু নকলের অভিযোগ ওঠে। টাকার বিনিময়ে বিভাগের এক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে আজাদী পারভীন এ অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের অভিযোগ। ঘটনাটি চারুকলা বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানাজানি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিজেই তার পিএইচডি থিসিস বাতিলের জন্য রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করেন।

এর আগে গেল বছর ‘মিথ্যা ও ভুয়া’ তথ্য দিয়ে থিসিস পেপার দিয়ে পিএইডি ডিগ্রী অর্জন করায় তদন্ত কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক প্রভাষকের পিএচইডি ডিগ্রী বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে তদন্ত কমিটির কোন সুপারিশ না থাকায় গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক ও থিসিস মূল্যায়ন কমিটির কারও বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা বলছেন, পিএইচডি গবেষণা একটি সংগঠিত প্রক্রিয়া। ওই শিক্ষক ‘মেথোডলজি’ ব্যবহার করেছেন।

ওই শিক্ষক লিখেছিলেন, গবেষণা করতে গিয়ে বিশ্বের ৮০টি দেশের ১২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭ জনের সাক্ষাতকার নিয়েছেন তিনি। সাক্ষাতকারটি তিনি নিয়েছেন ইয়াহু ও হটমেইলের মাধ্যমে। তাকে সাক্ষাতকারদাতাদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার। সাক্ষাতকার নিতে বিভিন্ন দেশে তিনি ২১ জন সহকারীও নিযুক্ত করেছেন বলে দাবি করেছেন। তিন বছরেরও কম সময়ে পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন এক হাজার ১৬৪ জনের সাক্ষাতকার নিয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন ওই শিক্ষক। পিএইচডি ডিগ্রীর

(প্রথম পৃষ্ঠার পর)

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা পিএইচডির মান রক্ষায় থিসিস মূল্যায়ন ফি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা কমিটির বাইরের ব্যক্তিরা থিসিস মূল্যায়ন করতে পারলেও বাংলাদেশে সে সুযোগ নেই। সুপারভাইজারের অধিন পরীক্ষা কমিটির সদস্যরাই কেবল থিসিস মূল্যায়ন করতে পারেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির শিক্ষার্থীদের থিসিস মূল্যায়নসহ প্রোগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবস্থান সম্পর্কে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থিসিস মূল্যায়ন ফি দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই নগণ্য। ভারতে পিএইচডি করতে আগ্রহীদের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। সম্প্রতি ভারতের একটি গণমাধ্যম তার এক প্রতিবেদনে পিএইচডি ডিগ্রীর মান নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছে। যেখানে বলা হয়েছে, নগণ্য অর্থ দিয়ে মূল্যায়নের জন্য দিল্লীতে পিএইচডিতে অধ্যয়নরতদের থিসিস বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। মূল্যায়ন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাত্র এক হাজার থেকে আড়াই হাজার রুপী পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেয় বলে থিসিসগুলো যেনতেনভাবে দেখা হয়। থিসিস পেপার দেখতে নিয়েই পাস নম্বর দিয়ে দেন বিশেষজ্ঞরা। এটাকে ‘টাচ এ্যান্ড পাস’ উল্লেখ করে এ মন্তব্য করেছেন ভারতের কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের সাবেক বিজ্ঞানী বিমল কান্তি সেন। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডির থিসিস মূল্যায়নের জন্য ওই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। সেক্ষেত্রে ফ্যাকাল্টির শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ও গবেষণা কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে বেশিরভাগ থিসিস মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছে।

এ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘ইউনিভার্সিটি নিউজ’ এ বিমল কান্তি সেন লিখেছেন, থিসিস মূল্যায়নের জন্য ১৫ কার্যদিবস প্রয়োজন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত একজন শিক্ষক মাসে ৮০ হাজার রুপী আয় করেন। সেখানে ১৫ কার্যদিবসের জন্য একটি থিসিস মূল্যায়নে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সর্বোচ্চ আড়াই হাজার রুপী পেতে পারেন। আর এই নগণ্য পারিশ্রমিকের কারণে ‘টাচ এ্যান্ড পাস’ নীতি অনুসরণ করতে পারেন তারা। এর ফলে দেখা যায়, থিসিসের রেফারেন্স, পরিসংখ্যানজনিত এবং পর্যালোচনা ঠিকভাবে না থাকলেও তা চোখ এড়িয়ে অনুমোদন দিয়ে দেন তারা। সেন জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি এই মূল্যায়ন ফি বাড়িয়ে আড়াই হাজার রুপী করেছে। তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ১ হাজার রুপী দিয়ে থাকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ শ’ রুপী থেকে বাড়িয়ে আড়াই হাজার রুপী করেছে এক মাস আগে। জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ২ হাজার রুপী এবং দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় ১৫শ’ করে পারিশ্রমিক দিচ্ছে থিসিস প্রতি।

গুরু গোবিন্দ সিং ইন্দ্রপ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক এন রঘুরাম বলেছেন, খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ই বাইরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কঠোরভাবে থিসিস মূল্যায়ন করে। বেশিরভাগই এ কাজে অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগ করেন যাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের কাছে থিসিস পেপারগুলো পাঠানো হয় না।

এত গেল ভারতের অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে থিসিস মূল্যায়ন ভারতের তুলনায় কিছুটা বেশি। যদিও তার পরিমাণও বেশি নয়। এ পরিমাণ তিন থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বাংলাদেশে সুপারভাইজার ও পরীক্ষা কমিটির বাইরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা অন্য কাউকে দিয়েই থিসিস মূল্যায়নের কোন সুযোগ নেই। পিএইচডি করতে আগ্রহীদের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এ স্বচ্ছতা আরও বেশি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর বলছিলেন, নগণ্য অর্থ দিয়ে পিএইচডির মান রক্ষা করা কঠিন। পিএইচডির মান রক্ষায় থিসিস মূল্যায়ন ফি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের অত্যন্ত বড় একটি কাজের জন্য তো অবশ্যই সেভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। নগণ্য ফি দিলে শিক্ষকরা স্বাভাবিকভাবেই সে কাজে আগ্রহী হবেন না। তাতে কাজের মানও খারাপ হতে বাধ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে থিসিস মূল্যায়ন ফি সবচেয়ে বেশি আছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে। এখানে শিক্ষার্থীর থিসিস প্রতি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পান সাত থেকে ৮ হাজার টাকা। বুয়েটের শিক্ষকরা বলছেন, একজন পিএইচডি প্রার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে অনেক কাজ করতে হয়। সে হিসেবে সেভাবে মূল্যায়ন করা জরুরী। বুয়েটে পিএইচডির সুপারভাইজারের অধীনে থিসিস মূল্যায়নে গঠন করা হয় ‘বোর্ড অব এক্সামিনার্স’। যেখানে ৫ থেকে ৭ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা থাকেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস মূল্যায়নে শিক্ষক পান সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা। এখানেও পিএইচডির সুপারভাইজারের অধীনে থিসিস মূল্যায়নে গঠন করা হয় ‘বোর্ড অব এক্সামিনার্স’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলছিলেন, পিএইচডির থিসিস মূল্যায়ন ফি আমাদের দেশে নগণ্যই। তবে থিসিস মূল্যায়নে কমিটির বাইরের কারও কোন হাত থাকার সুযোগ নেই আমাদের দেশে। আসলে ভারতেও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা হয়। এ শিক্ষাবিদ বাংলাদশে পিএইচডির ভাল মান নিশ্চিত করার বিষয়টি উল্লেখ করে আরও বলেন, পিএইচডি প্রোগ্রামে অস্বচ্ছতার কোন সুযোগ নেই। বিষয়টি এতই কঠোরভাবে দেখা হয় যে, সংশ্লিষ্ট তিন শিক্ষক প্রার্থীর থিসিসকে পজেটিভ না বললে তাকে ভাইভার জন্যই ডাকা হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, শিক্ষকদের থিসিস মূল্যায়ন ফিসহ তাদের মর্যাদা বাড়ানো জরুরী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস মূল্যায়নে কমিটির শিক্ষকরা পান থিসিস প্রতি মাত্র তিন হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষকরা বলছিলেন, একটি থিসিস পেপারের জন্য অনেক কাজ করতে হয় শিক্ষককে। থিসিস মূল্যায়ন ফি বাড়ানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে বহুবার বলা হয়েছে কিন্তু এটার বিষয়ে কোন কর্তৃপক্ষই মনোযোগী নয়। কর্র্তৃপক্ষ সব সময়েই বলে, গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ কম। তবে বর্তমান উপাচার্য শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে আন্তরিক বলে বলছেন শিক্ষকরা। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আফসার আহমদ হতাশা প্রকাশ করে বলছিলেন, আমাদের থিসিস মূল্যায়ন ফি খুব কম। মাত্র তিন হাজার টাকায় এমন একটি বড় কাজ করা সম্ভব হয় না। এই টাকা কম পক্ষে ১০ হাজার টাকা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষক। কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও একই অবস্থা। কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, এই ফি বাড়ানো দরকার। কিন্তু বাজেটে গবেষণা খাতে টাকা বরাদ্দ কম থাকায় চাইলেই করা সম্ভব হয় না।

স্বচ্ছতার মাঝেও আছে অভিযোগ ॥ দেশে থিসিস মূল্যায়নে স্বল্প ফি নিয়েও শিক্ষকদের স্বচ্ছতা যেমন আছে তেমনি থিসিস নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগও ওঠে মাঝে মাঝেই। কিছুদিন আগেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজাদী পারভীনের বিরুদ্ধে ছাত্রের পিএইচডি থিসিসের প্রায় ৯০ ভাগ হুবহু নকলের অভিযোগ ওঠে। টাকার বিনিময়ে বিভাগের এক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে আজাদী পারভীন এ অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের অভিযোগ। ঘটনাটি চারুকলা বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানাজানি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিজেই তার পিএইচডি থিসিস বাতিলের জন্য রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করেন।

এর আগে গেল বছর ‘মিথ্যা ও ভুয়া’ তথ্য দিয়ে থিসিস পেপার দিয়ে পিএইডি ডিগ্রী অর্জন করায় তদন্ত কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক প্রভাষকের পিএচইডি ডিগ্রী বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে তদন্ত কমিটির কোন সুপারিশ না থাকায় গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক ও থিসিস মূল্যায়ন কমিটির কারও বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা বলছেন, পিএইচডি গবেষণা একটি সংগঠিত প্রক্রিয়া। ওই শিক্ষক ‘মেথোডলজি’ ব্যবহার করেছেন।

ওই শিক্ষক লিখেছিলেন, গবেষণা করতে গিয়ে বিশ্বের ৮০টি দেশের ১২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭ জনের সাক্ষাতকার নিয়েছেন তিনি। সাক্ষাতকারটি তিনি নিয়েছেন ইয়াহু ও হটমেইলের মাধ্যমে। তাকে সাক্ষাতকারদাতাদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার। সাক্ষাতকার নিতে বিভিন্ন দেশে তিনি ২১ জন সহকারীও নিযুক্ত করেছেন বলে দাবি করেছেন। তিন বছরেরও কম সময়ে পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন এক হাজার ১৬৪ জনের সাক্ষাতকার নিয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন ওই শিক্ষক।