২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকা-মীর কাশেমরা টাকার কুমির, মুক্তিযোদ্ধারা পথের ফকির

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ দেশের প্রিয় স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব হারিয়ে অসংখ্য স্বাধীনতাকামী হয়েছেন পথের ফকির। আর এ স্বাধীনতার শুধু বিরোধিতা নয়, নির্বিচারে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও পোড়াওসহ পুরো দেশকে রক্তাক্ত জনপদে পরিণতকারীদের অনেকে হয়েছেন টাকার কুমির। অগাধ বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলে এরা স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও একই কায়দায় সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যা, গুমসহ হেন কোন অপকর্ম নেই যা করেনি। এসব স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আলবদর আল শামস নেতৃত্বদানকরীদের অন্যতম একজন হলেন মৃত্যুদ-ে দ-িত বিএনপি নেতা সাকাচৌ। সাকাচৌ ছাড়াও মৃত্যুদ-ে দ-িত আরেক মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাশেম আলীও হয়েছেন শত শত কোটি টাকার মালিক। চট্টগ্রামের কুখ্যাত ফকা চৌধুরীর গুডস হিলের বাড়ি এবং আন্দরকিল্লা কাটা পাহাড় লেনের ডালিম হোটেলটি ছিল সাকাচৌ ও মীর কাশেম আলীর টর্চার কেন্দ্র। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষগুলোকে ধরে এনে নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। এদের অনেকে এখনও নির্যাতন নিপীড়নের গ্লানি নিয়ে, পঙ্গুত্বের নিদারুণ কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছেন। আর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করার সঙ্গে জড়িতদের অনেকে পথের ফকির। অনেকে ভিক্ষা করে দিনযাপনও করেন। এ সংখ্যা দেশজুড়ে ভূরি ভূরি। তবে বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা চালু করেছেন। আগামীতে তা আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন।

চট্টগ্রামে দুই শীর্ষ নরঘাতক সাকাচৌ ও মীর কাশেম আলী স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে নানাপথে অঢেল বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এককথায় এরা টাকার কুমির বনে গেছেন। কি দুর্ভাগ্য এদেশের স্বাধীনতাকামী ও মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াইকারী সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। দেশের জন্য রক্ত দিয়ে এদের অধিকাংশ অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছেন আর স্বাধীনতার প্রকাশ্য বিরোধিতা করে মানুষ খুনকারীদের অনেকেই হয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকার নগদ অর্থ ও ধন সম্পদের মালিক। এদের ব্যাংক ব্যালেন্স বিলাস বহুল গাড়ি, অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট বাড়ি, বিদেশী ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের কোন হিসাবও নেই।

দেশে কিউসি গ্রুপ নামে যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে সেটি যুদ্ধাপরাধী সাকাচৌ ও তার পরিবারের মালিকানাধীন। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও খুলনায় এ গ্রুপের অফিস রয়েছে। শুধু শিপিং সেক্টরে রয়েছে এদের বিভিন্ন নামে ৫টি প্রতিষ্ঠান। ঢাকায় রয়েছে অন্যতম বৃহত ঢাকা ডায়িং নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে এই কিউসি গ্রুপের ছোট বড় প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুধু শিপিং সেক্টরে ১০টি বিদেশী শিপিং সংস্থার এজেন্টও এই কিউসি গ্রুপ। চট্টগ্রামে গুডস হিল, রাউজানের গহিরায় জমিজমা, ঢাকায় ফকার চার পুত্র সাকাসহ চার ভাইয়ের পৃথক পৃথক বাড়ি এবং অভিজাত এলাকা বারিধারা, গুলশান, বনানী, ধানম-িসহ বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ফ্ল্যাট রয়েছে এদের। কিউসি গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে কিউসি শিপিং, কিউসি ট্রেডিং, কিউসি লজিস্টিক, কিউসি মেরিটাইম, কিউসি মাল্টি ফুড লিমিটেড। এগুলো শুধু শিপিং ব্যবসায় জড়িত। এক সময় এ কিউসি গ্রুপের কয়েকটি জাহাজও ছিল। ২০০৫ সালে পারিবারিক কোন্দল সৃষ্টি হলে গ্রুপের ব্যবসার পাশাপাশি এরা নিজ নিজ মালিকানায় আরও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।

অপরদিকে মীর কাশেম আলী কেয়ারি গ্রুপ নামের প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। ব্যাংক বীমা, রিয়েল এস্টেট, ক্লিনিক ব্যবসাসহ পর্যটন খাতেও এ গ্রুপের বিনিয়োগ হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ, স্বাধীনতার আগে এরা কি ছিল। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করে, মুক্তিযোদ্ধাদের অকাতরে হত্যা করে এরাই হয়েছে এদেশের ধনাঢ্য ব্যক্তি। মীর কাশেম আলী চট্টগ্রামের না হলেও এ শহরে ওই সময়ে লেখাপড়া করতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠন করেছিল আলবদর বাহিনী। ডালিম হোটেলটিতে স্বাধীনতাকামীদের নির্যাতনের মাস্টারমাইন্ড ছিল সে। যা ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়ে তাকে মৃত্যুদ-াদেশ দেয়া হয়েছে। যা বর্তমানে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত আদেশের অপেক্ষায়।

দেশে এ ধরনের স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আলবদরের সংখ্যার শেষ নেই। যারা কোটি কোটি টাকার অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছে। বিশেষ করে ’৭৫ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পর এরা রাতারাতি অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য হাতিয়ে নিয়ে অচিন্তনীয় বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধ করে যারা দেশ স্বাধীন করেছেন তারা এবং যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারগুলো স্বাধীনতা লাভের চার দশক পরও অনেকে কপর্দকহীন অবস্থায় কোন রকমে প্রাণটি বাঁচিয়ে রেখেছেন। এ দুঃখ গ্লানির শেষ নেই, শেষ হবেও না। বর্তমান সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করে বিচারের রায়ও কার্যকর করে চলেছে। কিন্তু এসব যুদ্ধাপরাধীরা বিত্তের যে পাহাড় গড়ে তুলেছে, অগাধ ধন সম্পদের মালিক হয়ে এখনও যে এদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সময়ও এসে গেছে বলে বোদ্ধা মহলের অভিমত। ইতোমধ্যেই সাকা পরিবারের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনপুরার গুডস হিল ও ডালিম হোটেলটি মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতি হিসাবে জাদুঘরে পরিণত করার দাবি উঠেছে। কিন্তু এদের অবৈধভাবে অর্জিত অন্যান্য ধন সম্পদ ও নগদ অর্থ বাজেয়াফতের বিষয়টি নিয়েও চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন বলে দাবি উঠতে শুরু করেছে। কেননা, মুক্তিযুদ্ধকালীন যেমন এরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে স্বাধীনতাকামী বাঙালীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মুক্ত ছিল তেমনি বর্তমানে বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোর ইন্ধনে স্বাধীনতার বিরুদ্ধচারণকারীরা কাড়ি কাড়ি টাকা বিতরণ করছে সহিংস সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটানোর জন্য। ইতোমধ্যেই এ জাতীয় বহু প্রমাণ উদঘাটিত হয়েছে। এদের জন্য বিদেশ থেকেও অর্থ আসার তথ্য রয়েছে ব্যাংকিং লাইন ও হুন্ডিসহ অবৈধ পথে হিসাব ছাড়া যে অর্থ প্রতিনিয়ত আসছে এপথ কোন অবস্থাতেই রোধ করা যাচ্ছে না। সঙ্গত কারণে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে শুধু শাস্তি নয়, তাদের অর্জিত অর্থ সম্পদও সরকারী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার দাবি উঠতে শুরু করেছে।