২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের সূচনা

(২৪ নবেম্বরের পর)

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবার প্রথম দিকে সলিমুল্লাহ হলে একটি মনোগ্রাহী বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এই বিতর্কের বিষয় ছিল “ঘধঃরড়হধষরংধঃরড়হ ড়ভ ঔঁঃব ওহফঁংঃৎু রং ঊংংবহঃরধষ”। এর পক্ষে বিতর্কে নেতৃত্ব দেন অর্থনীতির বামপন্থী অধ্যাপক আখলাকুর রহমান এবং বিপক্ষে নেতৃত্ব দেন রাজনীতির অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ। ২১ আগস্ট এই প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে পাস হয়। তার কিছুদিন পর ৮ এবং ৯ সেপ্টেম্বর সলিমুল্লাহ হলে সংখ্যাতত্ত্বের অধ্যাপক সাহিত্যিক আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। একই সময়ে জাতীয় অঙ্গনে বেশকিছু আলোড়ন জাগে। ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বক্তৃতাকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। দুর্ভাগ্যবশত তার আততায়ীও পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। সম্ভবত এই কারণে লিয়াকত হত্যার রহস্য কখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। অক্টোবর মাসেই পূর্ব বাংলায় এক মারাত্মক লবণ সঙ্কট দেখা দেয়। সম্ভবত পাঁচ পয়সা সেরের লবণের দাম হয় ১৬ টাকা এবং পয়সা দিয়েও লবণ যোগাড় করা ছিল খুব কষ্টকর। ২৬ অক্টোবর আমরা লবণ ছাড়া খাবার খেলাম। আমরা এর প্রতিবাদে শোভাযাত্রা করে প্রাদেশিক সচিবালয়ে ধাওয়া করলাম। তখন প্রাদেশিক সচিবালয়ের একটি দালান যেখানে প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্য সচিব বসতেন সেটি ছাড়া আর কোন দালান বা ব্যারাক সংরক্ষিত ছিল না। সচিবালয়ে সামান্য কটি দালান ছিল এবং অনেকগুলো টিন ছাদের ব্যারেক তৈরি করা হয়। দুটি ১১ তলা দালান হয় ৬০-এর দশকের শেষ দিকে। আমরা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দালানের সামনে গিয়ে আমাদের প্রতিবাদ জানালাম। খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আফজাল আমাদের কথা শুনলেন এবং সমস্যা নিরসনের অঙ্গীকার করলেন। রাজনীতিতে তখন সত্যিই মেরুকরণ তেমন প্রবল ছিল না।

এ সময়ে আমাদের হলের প্রাক্তন ছাত্র রাজনীতিবিদ বগুড়ার হাবিবুর রহমান যিনি তখন ইতালীতে রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি এসে একটি বক্তৃতা দিলেন। তার বক্তৃতা শুনতে সারা এসেম্বলি হলটি একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। এ সময়ে আমরা কতিপয় বন্ধু একটি অত্যন্ত আনন্দময় দিন কাটাই ৮ নবেম্বর। আমরা টিকাটুলিতে বলধা বাগানে যাই। যেটি ছিল একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর ও বিভিন্ন উদ্ভিদ সংগ্রহের বাগান। এ বাগানটি পরবর্তীকালে আমাকে সবসময়ই বিশেষভাবে আকর্ষণ করত এবং সেখানে ১৯৫৫ সালে জানুয়ারি মাসে আমার অনার্স পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর আমি একটি বড় উৎসবের আয়োজন করি। আমার চাকরিজীবনেও বলধা বাগানে বিশেষ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হয়। ‘ঐক্যতান’ নামে একটি বিশেষ সঙ্গীত গোষ্ঠী মাঝে মাঝে এখানে গানের আসরও জমাত। এখন নাকি কোন অনুষ্ঠান এ বাগানে হয় না। অক্টোবর মাসে সাধারণত বর্ষা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সেবার ঐ সময়ই খুলনায় বর্ষার প্রকোপে খাদ্যশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং সেখানে বড় ধরনের ত্রাণকার্য পরিচালিত হয়। এ কাজে শিক্ষা জগতের দু’জন মহাপুরুষ আমাদের ইংরেজী বিভাগের অধ্যক্ষ টার্নার সাহেব এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ প্রাক্তন প্রশাসক আখতার হামিদ খান নিজেরাই ত্রাণকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নেন। টার্নার সাহেবের হুকুমে আমিও কিছু ত্রাণসামগ্রী ও অর্থ সংগ্রহ করি। সরকার এ দু’জনকে ত্রাণকার্য পরিচালনার জন্য সাময়িকভাবে ত্রাণ কমিশনার হিসেবে নিযুক্তি দেয়।

ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে প্রায় প্রতি বছর প্রত্যেকটি হলে ইনডোর খেলাধুলা এবং এ সাহিত্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। প্রায় পুরো একটি মাস এসব কাজে সবাই ব্যস্ত থাকত। এ সময়ে মাহবুব আলী ইন্সটিটিউটেও নাটক অভিনীত অথবা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন হতো। এসব আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীরাই প্রধান ভূমিকা পালন করত। এক কথায় তাই বলা যায় যে, সে সময় ৫০-এর দশকে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই মুখ্য ভূমিকা পালন করত। আমি বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহশীল ছিলাম বলে এ সময় আমাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হতো। ফজলুল হক হলে ১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাহিত্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আমি সেই সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি এবং ঢাকায় আগত নতুন মুখ হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করি। আমি ফজলুল হক হলের দু’টি প্রতিযোগিতায় ভালভাবে পুরস্কৃত হই। তার একটি ছিল ইংরেজী প্রস্তুত বক্তৃতা এবং অন্যটি ছিল ইংরেজী তাৎক্ষণিক বক্তৃতা। কয়েক দিন পর সলিমুল্লাহ হলেও সেই প্রতিযোগিতা শুরু হলো এবং আমার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকল। নবেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। শেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকটি মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে মঞ্চায়ন হবে মাহবুব আলী ইন্সটিটিউটে এবং এটা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান বলে বিবেচিত হবে না। এ নাটকে অংশগ্রহণ করার জন্য আমি ছিলাম একজন প্রতিযোগী এবং আমি তাতে বাসানীয়র ভূমিকায় নির্বাচিত হই। ঢাকার ছাত্রজীবনে এটিই ছিল আমার কোন নাটকে অভিনয়ের সুযোগ। এই পঞ্জিকা বছরে আরও তিনটি ঘটনা আমার জীবনে খুব উল্লেখযোগ্য ছিল। প্রথমটি হলো ১১ নবেম্বর কার্জন হলে নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর একটি অনুষ্ঠান। সেখানে আফরোজা বুলবুলের ‘চাঁদ সুলতানা’ নাচটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। বুলবুল চৌধুরীর নাচ উপভোগ করার দ্বিতীয় আর কোন সুযোগ পাইনি। কারণ তিনি অকস্মাৎ ১৯৫৪ সালের ১৭ মে ইন্তেকাল করেন। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ঘটনাটি ছিল সিলেটে। তখন সিলেটে আলী হাসান নামে একজন সিএসপি প্রশাসক ছিলেন। তিনি সিলেটের গোবিন্দ পার্কটি ধ্বংস করার উদ্যোগ নেন এবং সেটাকে নিলামে তোলার ব্যবস্থা করেন। তার এই উদ্যোগটিতে আপত্তি তোলেন সিলেটের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব আমার আব্বা আবদুল হাফিজ। তিনি আমার আব্বার আপত্তিতে কোন কান দিলেন না। সেজন্য আমার আব্বা আদালতে এই নিলামের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ জারি করালেন। আলী হাসান অবশ্য পার্কটি ধ্বংস সাধন করেন এবং সেখানে একটি জঘন্য বাজার গড়ে তোলেন। এই বাজারটি আমার মতে সিলেটে একটি অভিশাপ হিসেবে এখনও বজায় আছে। গোবিন্দ পার্কটি ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার সব সভা-সমিতির জায়গা। প-িত নেহরু এ পার্কে ১৯৪৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর বক্তৃতা দেন। মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দ এখানে প্রচারকার্য চালান। শুধুমাত্র মহাত্মা গান্ধী ১৯২০ সালের ২৯ আগস্ট এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৬ সালের ৩ মার্চ ঈদগাহ ময়দানে বক্তব্য রাখেন। তৃতীয় ঘটনাটি হলো মোটামুটি ব্যক্তিগত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই আমি টেনিস মাঠের নিয়মিত সদস্য হয়ে যাই এবং তখনকার শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের ভাল ছাত্র আবদুল ওয়াদুদ সামসুল আলম (পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিভিন্ন দেশে চাকরি করেন) ছিলেন সবচেয়ে ভাল টেনিস খেলোয়াড়। আর একজন ভাল খেলোয়াড় ছিলেন সুসাহিত্যিক বরকত উল্লাহর ছেলে এমএ ক্লাসের ছাত্র আসাদ উদ্দিন। আর একজন ভাল খেলোয়াড় ছিলেন ঢাকার মুরাদ খায়রি (পরবর্তীকালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে হিজরত করেন)। আর একজন ছিলেন লুৎফর রহমান। তারা ঠিক করলেন যে, তারা সিলেটে টেনিস খেলতে এবং শিলং ভ্রমণে যাবেন। সিলেটে তখন ভাল টেনিস খেলা হতো। সিলেটের স্টেশন ক্লাব এবং মুরারীচাঁদ কলেজে দু’টি মাঠেই খেলা জমত। তারা ডিসেম্বর মাসে আসলেন এবং আমাকে তাদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হলো। দু’টি মাঠেই তারা টেনিস খেলেন এবং দর্শকদের প্রশংসা আহরণ করেন। আমি তাদের সঙ্গে শিলং যাইনি; কিন্তু তারা ফিরে এসে তাদের ভ্রমণের অত্যন্ত আনন্দদায়ক বিবরণ প্রদান করেন। চলবে...