২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার কড়া ও সঠিক বার্তা ॥ একের পর এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর

নাজনীন আখতার ॥ সরকারের শক্ত অবস্থান, অতিরিক্ত সতর্কতা এবং সাধারণ মানুষের বিপুল সমর্থনে এবার যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশব্যাপী কোন ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটেনি। এমন কী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নিজের এলাকা চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরেও কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এক বিবৃতির মধ্য দিয়ে দায় সেরেছে বিএনপি। আর বিএনপির শরিক জামায়াতে ইসলামী নামকাওয়াস্তে দুই দিন হরতাল আহ্বান করলেও তাতে সাড়া দেয়নি কোন মানুষ। যান চলাচল ও জীবনযাত্রা ছিল নিত্যদিনকার মতোই স্বাভাবিক। যুদ্ধাপরাধের রায় কার্যকর নিয়ে সরকারের এমন শক্ত অবস্থানের প্রশংসা হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজী দৈনিক দি টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে বলেছে, এ রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদা, আইএস এবং স্থানীয় জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মতো গোষ্ঠীকে সম্প্রতি মুক্তমনাদের হত্যার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছেন। সরকারের এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে যে কোন ধরনের সন্ত্রাস ও নাশকতার বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এর আগে জামায়াতের দুই নেতা কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ভয়াবহ নাশকতা করেছিল বিএনপি-জামায়াত। সে সময় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে ভয়াবহ আহত করা হয়। কারও মাথা থেঁতলে দেয়া হয়। এর মধ্যে জামায়াতের আরেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদ-ের রায়ের পরে তাকে চাঁদে দেখা গেছে এ ধরনের কাল্পনিক অবাস্তব তথ্য ছড়িয়ে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো হয়। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর দেশব্যাপী তা-ব চালায় জামায়াত। ওই সময় শুধু সাতক্ষীরাতেই বিএনপি-জামায়াতের শক্তি প্রদর্শন ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। জেলায় আওয়ামী লীগের ১৭ জন নেতা-কর্মীকে কুপিয়ে, গলাকেটে হত্যা করা হয়। শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়, ভাংচুর করা হয়। পরবর্তীতে আপীল বিভাগে সাঈদীর রায় কমিয়ে আমৃত্যু দেয়া হয়।

বিষয়গুলো মাথায় রেখে এবার সরকার বিএনপি সমর্থনপুষ্ট এলাকার চেয়ে জামায়াত আধিপত্যের এলাকাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামে বাড়ানো হয় নজরদারি। গতবার রাজশাহীকে রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন করে জামায়াত সহিংস তা-ব চালায়। আর এবার সরকার জামায়াতের ত্রাসের রাজত্ব সাতক্ষীরাকে প্রায় ‘বিচ্ছিন্ন’ করে ফেলে কেন্দ্র থেকে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাইবার, হোয়াটস এ্যাপ ও ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা থাকায় তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর সুযোগ পায়নি বিএনপি-জামায়াত। সরকারের এ কৌশলও কাজে দিয়েছে নাশকতা প্রতিহতে। প্রক্সি সার্ভারের মাধ্যমে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার শুরু করলেও ব্যাপকতা না থাকায় সাধারণরা বিষয়টি থেকে দূরেই থেকেছেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য খোলা ‘জাস্টিস ফর চৌধুরী’ পেজটিও উল্লেখযোগ্য আবেদন ছড়াতে পারেনি।

রায় কার্যকরের পরদিন ২২ নবেম্বর প্রকাশিত টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বিরোধীদলীয় দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর মধ্য দিয়ে জঙ্গীবাদী ও চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা পাঠিয়েছেন।

জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সঙ্গে যুক্ত অনুসারীরা বেশ কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে মুক্ত চিন্তাশীল, ধর্ম নিরপেক্ষ ব্লগার এবং প্রকাশকদের যেভাবে হত্যা করে আসছে তাতে বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর ধর্ষণ, হত্যাসহ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে ২০১৩ সালে ওই দুই নেতাকে অভিযুক্ত করে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ওই দুই জনের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দেয়ার পরপরই ২১ নবেম্বর মধ্যরাতে তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিরোধিতা করে আসলেও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ছিল। আইন অনুসারে অভিযুক্তরা রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দাখিল, উচ্চ আদালতে আপীল এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করারও সুযোগ পেয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদের সঙ্গে টেলিফোন আলাপচারিতার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, জঙ্গীদের হিটলিস্টে থাকার কারণে তিনি তার অবস্থান সম্পর্কে কোন তথ্য দেননি। তবে এ রায় কার্যকরে তার সন্তুষ্টির কথা তুলে ধরে প্রতিবেদককে বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের রায় যেন কার্যকর হতে না পারে সেজন্য দেশের বাইরে এবং দেশের অভ্যন্তরের শক্তি সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসব চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে রায় কার্যকরের ব্যবস্থা নিয়েছেন।

একই মত প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিক। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার এ পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল এ বিচারও তেমনই এক চ্যালেঞ্জ। ওই সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে একটি শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। ওই সময় বাংলাদেশের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো লোকদের সহায়তায় এদেশে তাদের রাজনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছিলো। শেখ হাসিনা এ রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে এর একটি উল্লেখযোগ্য সমাধান করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত সময়গুলোতে দেশটিতে মুক্তমনাদের হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়েছে তার কার্যালয়েই। তিনি এর আগে ফেব্রুয়ারিতে হত্যাকা-ের শিকার অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক ছিলেন। আনসারুল্লাহ বাংলাটিমসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল অনেককেই জীবন নাশের হুমকি দিয়েছে। অনেকে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিনযাপন করছেন। লেখক, প্রকাশক, ব্লগার হত্যায় তদন্তের তেমন কোন অগ্রগতি না থাকলেও পুলিশ ও রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে যেন কোন মন্তব্য করা না হয়। এই অবস্থায় সরকার প্রধান শেখ হাসিনা মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রতি নমনীয় ভূমিকা রেখে চলেছেন এমন অভিযোগও রয়েছে।

তবে লেখক ও মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন তিনি কোন কিছুতেই ভীত নন। কোন শক্তিশালী পক্ষের কাছে তিনি মাথা নোয়াবার নন।

প্রতিবেদনে রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ না নেয়ায় দেশে নাশকতার কোন ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে বলা হয়, এর আগে জামায়াতের দুই নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের পর দেশব্যাপী নাশকতার সৃষ্টি হয়। সেই ঘটনাকে মনে রেখে এবার রায় কার্যকরের আগে ও পরে সংবেদনশীল স্থানগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। হরতাল প্রতিহতেও ব্যাপক ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এ বিষয়ে প্রতিবেদনে একাত্তর টেলিভিশনের চীফ এডিটর মোজাম্মেল বাবুর মন্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেখ হাসিনা এখন বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মোজাম্মেল বাবু বলেন, বাংলাদেশের মতো ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। এ রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই চ্যালেঞ্জের বেশিরভাগটাতেই জয়ী হলেন। তিনি প্রমাণ করলেন যে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আছেন তা এ রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। সামনে বিরোধী পক্ষের প্রতিরোধ প্রতিহত করা এবং ক্রমেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা মৌলবাদী শক্তিকে দমন করার জন্য এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। আওয়ামী লীগে যদিও খ্যাতিমান কয়েকজন নেতা রয়েছেন। এরপরও দলটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতি তত আগ্রহী নয়। যেভাবে যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে রায় কার্যকর করে শেখ হাসিনা তার দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন সেভাবে মুক্তমনা ব্লগার হত্যার বিচার করতে তার দেয়া অঙ্গীকারও তাকে রাখতে হবে। কারণ এমনও বলা হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে শেখ হাসিনা তার ব্যক্তিগত বিদ্বেষও মিটিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে, বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধী ১৯৭৫ সালে তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন।