১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কর্ণফুলীতে টানেলসহ একনেকে ১২ প্রকল্প অনুমোদন

  • বেহাত হওয়া সরকারী জলাধার উদ্ধারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ কর্ণফুলি নদীতে টানেল নির্মাণসহ ১২ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ১৬ হাজার ৯৭৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ১১ হাজার ৭২৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৫ হাজার ২৪৮ কোটি ৬৯ কোটি এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল। এ সময় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হুমায়ুন খালিদ ও পরিকল্পনা সচিব মোহাম্মদ সফিকুল আজমসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এখন থেকে যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে জলাধারের জায়গা রাখতে হবে। তাছাড়া ইতোমধ্যেই বেহাত হয়ে যাওয়া সরকারী খাল ও জলাধার উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, এখন থেকে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সেই বিষয়ে যিনি বিশেষ দক্ষতাকেই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাছাড়া নতুন কলেজগুলো লম্বায় না বাড়িয়ে ওপরের দিকে বিল্ডিং বাড়ানোর কথা বলেছেন। সেই সঙ্গে নতুন করে কোন কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর না করার নির্দেশাও দিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কলেজ থাকবে কলেজের মতো আর বিশ্ববিদ্যালয় হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। কলেজের পরিবেশ বাদ দিয়ে সেখানেই আর বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে না।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, কর্ণফুলি নদীতে টানেলটি নির্মিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থল হিসেবে চট্টগ্রামের ভূমিকা শক্তিশালী হবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের জাতীয় মহাসড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে, এশিয়া হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, কর্ণফুলি নদীর দুইপারে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, বর্তমানে চালু দুটি ব্রিজের ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের চাপ কমবে এবং সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

অনুমোদিত অন্যান্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে, ৪০টি উপজেলায় ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও চট্টগ্রামে একটি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি স্থাপন, এর ব্যয় হবে ১ হাজার ৩৩১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধি, ব্যয় হবে ১২২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রথম পর্যায়, ব্যয় হবে ১২২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের আওতায় ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক প্রি-পেইড মিটার স্থাপনÑ প্রথম পর্যায়, ব্যয় হবে ৪৩৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুত সরবরাহ, ব্যয় হবে ৪০ কোটি টাকা। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ভ্রƒণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়নÑ তৃতীয় পর্যায়, ব্যয় হবে ২৬৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ইন্দ্রপুর হতে চক্রশালা পর্যন্ত বাঁক সরলীকরণ, ব্যয় হবে ৭৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। কনস্ট্রাকশন অব এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং এ্যান্ড সেইলরস ব্যারাক ফর কোস্ট গার্ড, ব্যয় হবে ৩৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। খুলনা শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, ব্যয় হবে ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ঢাকা, ব্যয় হবে ৫২২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং তথ্য প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নিবাচিত বেসরকারী কলেজসমূহের উন্নয়ন প্রকল্প, বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৫ হাজার ৫৪৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

প্রকল্পের বিস্তারিত হচ্ছে, কনস্ট্রাকশন অব মাল্টি লেন রোড টানেল আন্ডার দ্য রিভার কর্ণফুলি’ শীর্ষক এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩ হাজার ৬৪৭ কোটি ২০ লাখ এবং চীনের ঋণ থেকে ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে এটি তৈরির কাজ শেষ করবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।

দেশের ইতিহাসে প্রথম এই টানেলের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৩ দশমিক ৪০ কিলোমিটার। প্রকল্পের আওতায় টানেল নির্মাণের পাশাপাশি ৪ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার এ্যাপ্রোচ টানেল নির্মাণ, ৮০০ মিটার সেতু নির্মাণ, ৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার টোলপ্লাজা তৈরি, ৬২ দশমিক ৮২ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, পরামর্শক সেবা, জেটি নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করা হবে।

অপর অনুমোদিত বার্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্পের বিষয়ে বলা হয়েছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অভ্যন্তরে ২০০৩ সালে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট বার্ন ইউনিট প্রকল্পের আওতায় একটি বার্ন ইউনিট স্থাপন করা হয়। অধিক সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য পরবর্তীতে ২০১২ সালে এ ইউনিটকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এটি বাংলাদেশে আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি সরকারী রেফারেল হাসপাতাল। এছাড়া দেশের আরও বিভিন্ন টারশিয়ারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালে বার্ন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এসব দিক বিবেচনা করে দেশে একটি উন্নত মানের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় ঢাকার চাংখারপুলে যক্ষ্মা হাসপাতালের অব্যবহৃত জায়গায় দুটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভিত্তির ওপর ১১ তলা ইনস্টিটিউট ভবন নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া হাসপাতালের জন্য আধুনিক মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি এবং আসবাবপত্র সংগ্রহ করা হবে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেন, ইনস্টিটিউটটি স্থাপিত হলে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্ট তৈরি হবে, জনগণের আর্থিক সামর্থ্যরে মধ্যে দেশেই উন্নত বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি সেবা গ্রহণ করতে পারবে, পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স ও স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে। সেই সঙ্গে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে এবং জ্ঞান ও কারিগরি সহায়তা বিনিময়ের মাধ্যম বিভিন্ন দেশের সমধর্মী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করে এ বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।