২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিমানের লন্ডন ফ্লাইট নিয়ে নতুন শর্ত ব্রিটিশ সরকারের

  • সুপারিশের আলোকে বিমান তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে;###;নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন

আজাদ সুলায়মান ॥ ঢাকা থেকে সরাসরি লন্ডন ফ্লাইট চলাচলে যাতে কোন ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি না থাকে সেজন্য নতুন করে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার উইলিয়াম রবার্ট গিবসন সশরীরে গত রবিবার দুপুরে আকস্মিক বিমানের প্রধান কার্যালয় বলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বেশকিছু প্রস্তাবনা ও শর্ত দেন। এসব প্রস্তাবনায় মূলত নিরাপত্তা বিষয়ে তাগিদ দেয়া হয়েছে। বিমানও তাৎক্ষণিক জরুরী বৈঠক ডেকে গত দুদিনে এসব শর্ত পরিপূরণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়। সেগুলো বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর গতকাল মঙ্গলবার উইলিয়াম রবার্ট গিবসন মিন্টো রোডের বাসায় গিয়ে দেখা করে সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হন।

এদিকে বিমান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সপ্তাহ দুয়েক আগে ব্রিটিশ নিরাপত্তা গোয়েন্দা প্রতিনিধি দলের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের পর যে প্রতিবেদন তৈরি করে- সেটাই বিমানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করার জন্যই রবিবার বলাকা ভবনে যান উইলিয়াম রবার্ট গিবসন। এ সময় ব্রিটিশ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আগের পরিদর্শনে বিমানবন্দরের কোন কোন পয়েন্টে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে সেগুলো অবহিত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী ও কার্গো হাউসের বর্তমান যে পদ্ধতিতে স্ক্যানিং করা হয় তাতে সন্তুষ্ট হতে নয় ওই গোয়েন্দা দল। তাদের মতে, শাহজালালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আরও উন্নতি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে-বিস্ফোরক দ্রব্য পাচাররোধে আরও অত্যাধুনিক ডিডাইস সিস্টেম চালু করতে হবে। বর্তমানে যে পদ্ধতিতে যাত্রী ও কার্গো মালামাল স্ক্যানিং করা হয় তা যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। এ থেকে বের হয়ে এসে আরও উচ্চ প্রযুক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

বিমান সূত্র জানায়, ব্রিটিশ হাইকমিশনের আকস্মিক বিমান অফিস পরিদর্শনের সময় এসব শর্ত পরিপূরণে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের দেয়া প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন করার তাগিদ দেয়া হয়।

বিমানমন্ত্রী এসব প্রস্তাবনার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, মূলত বিমানের সার্বিক নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত ও জোরদার করার জন্যই কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে। বিমান আগে থেকেই এ পদ্ধতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন সেটা আরও জোরদার ও নির্ভরযোগ্য করা হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আসলে ওরা বিস্ফোরক দ্রব্যের বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছে। কারণ এটার ওপর তাদের দেশের নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত।

এদিকে হঠাৎ ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বলাকা পরিদর্শনের পর নড়েচড়ে বসে বিমান। ওই দিন বিমানের পরিচালক (পরিকল্পনা) বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। এ সময় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের দেয়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কি কি সুপারিশ করা হয়েছে, কোথায় নিরাপত্তা ঘাটতি আছে, সার্বিক পরিস্থিতি আসলেই উদ্বেগজনক কি না এসব খতিয়ে দেখতে দফায় দফায় বৈঠক করেন বিমানের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শাহ নেওয়াজ, পরিচালক ডক্টর শফিকুর রহমান ও পরিচালক বেলায়েত হোসেনসহ অন্য কর্তারা। তারা দ্রুততম সময়ে কিভাবে ব্রিটিশ প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা যায় এজন্য সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরশু সোমবার বিমানের পক্ষ থেকে অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের কাছে। গতকাল সকালে উইলিয়াম রবার্ট গিবসন তার বাসভবনে সাক্ষাত করতে গেলে তাকে বিমানের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন দেয়া হয়।

বিমানের পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক বেলায়েত হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, এটা শুধু বিমান নয় যেসব দেশ থেকে সরাসরি লন্ডন ফ্লাইট চলাচল করেÑ ওই দেশের সিকিউরিটির সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করার অংশ হিসেবে এ পরিদর্শন। কেননা সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা হুমকির মুখে ব্রিটিশ এভিয়েশন সিকিউরিটি নতুন করে সবকিছু পরখ করে দেখছে। বিমান ও হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও একই কারণে তারা দেখা করে তাদের মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেছে।

এদিকে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সর্বশেষ সুপারিশের আলোকে বিমান তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। গতকাল হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো, বিএফসিসি ও টার্মিনাল ভবন পরিদর্শনে দেখা যায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। সকাল দশটায় কার্গো ভিলেজে দেখা যায়, জেনারেল ম্যানেজার আলী হাসান মোহাম্মদ বাবু নিজেই সার্বিক তদারকিতে তৎপর। যদিও এ সময় সেখানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের যথেষ্ট ঘাটতি চোখে পড়ে। তারপরও সীমিত জনবল দিয়েই তিনি পরিস্থিতি সামাল দেয়া প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। এ সময় তিনি বেশ নিশ্চয়তা দিয়েই বললেন- আগে থেকেই কার্গোর সার্বিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ যথেষ্ট উন্নতি করা হয়েছে। এদিক দিয়ে অন্তত নিরাপত্তা হুমকির মতো কারও পক্ষে কিছু করে পার পেয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

জানা যায়, এখন থেকে বিএফসিসির খাবারের কার্ড সিলগালা করে উড়োজাহাজে তুলতে হবে, একইভাবে সেটা নামাতে হবে। এখানে যারা কাজ করেন- তাদের ভাল করে তল্লাশি চালাতে হবে। এছাড়া বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ ও ব্যাগেজ একাধিক স্তরে পরীক্ষা করতে হবে। কার্গোর যেসব মাল সরাসরি ইউরোপে প্রবেশ করে সেগুলোর জন্য আলাদা স্তরে সাজাতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ১১ নবেম্বর হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করে ব্রিটিশ এভিয়েশন গোয়েন্দাদের একটি দল। তারা বিমানবন্দরের প্রবেশ পথ, স্ক্যানিং ব্যবস্থা, ইমিগ্রেশন সিস্টেম, ডগ স্কোয়াডের দক্ষতা, কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। দলটি স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরদের দক্ষতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। নিরাপত্তা স্ক্যানিংয়ের ওপর তাদের অধিকতর প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়।

জানা গেছে, মিসরে বিমান দুর্ঘটনার পর এ অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা করে ব্রিটিশ সরকার। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর সরেজমিন পরিদর্শন করছেন। এরই অংশ হিসেবে শাহজালালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে আসে দলটি। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্ট বিভাগের রিজওনাল এভিয়েশন সেক্রোটারি ও লিয়াজোঁ অফিসার এশিয়া এ্যান্ড প্যাসেফিক জন লোভেসির নেতৃত্বে দুই সদস্যের প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শনের কাজটি করে। দলের অপর সদস্য হলেন ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) স্টেভেন ডটস। ওই পরিদর্শনের সময় গোয়েন্দা দলটি বিমানবন্দরের চারদিকে নিরাপত্তা চৌকিগুলো ঘুরে দেখেছে। তবে এ সময় চৌকিগুলোতে কোন নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন না। স্পর্শকাতর এলাকায় তারা গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ দেখেছেন। একই সময় নিরাপত্তা প্রাচীর টপকে গ্রামবাসীকে সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করতেও দেখেন তারা। পরিদর্শন শেষে দলটি সিভিল এভিয়েশন সদর দফতরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। এতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

জানা যায়, ওই পরিদর্শনের পরই দলটি একটি প্রতিবেদন দাখিল করলে সেটা নিয়েই হাইকমিশনার উইলিয়াম রবার্ট গিবসন বিমানে যান। তিনি ওই প্রতিবেদনের কয়েকটি প্রস্তাবনা ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন পরিচালক বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে।