২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ময়দানের রাজা নেইমার

  • টি ইসলাম তারিক

ফুটপাথ, সমুদ্র সৈকত কিংবা বস্তিতে খেলতে খেলতে বেড়ে ওঠা। এক সময় বিশ্বসেরা তারকা বনে যাওয়া। দক্ষিণ আমেরিকার সব ফুটবলগ্রেটের ক্ষেত্রেই এর যে কোন একটি প্রযোজ্য। নেইমার দ্য সিলভা সান্তোস জুনিয়রের উত্থানও অন্যসব ফুটবল গ্রেটদের মতোই। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ আর জীবিকার তাগিদে ফুটবলকে ধ্যান-জ্ঞান ও পেশা হিসেবে বেছে নেয়া। যার ফল, নেইমার এখন বিশ্ব ফুটবল মঞ্চের মূল কুশীলব।

ছোটবেলায় দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে নেইমারের বাবা ‘সিনিয়র নেইমার দ্য সিলভা’কে। ভাগ্যান্বেষণে ব্রাজিলের মধ্যাঞ্চলের শহর সাও ভিনসেন্ট থেকে ১৯৯২ সালে সাও পাওলোর মগি দাস ক্রজেস শহরে এসেছিলেন তিনি। মনের কোনে বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন লালন করে জন্মস্থান ছেড়ে এসেছিলেন সিনিয়র নেইমার। কিন্তু পারেননি ভাগ্যের চাকা সচল করতে। তাঁর পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। নিদারুণ ওই দুঃসময়ে সিনিয়র নেইমারের ভালবাসার প্রতীক হিসেবে ঘর আলো করে আসে জুনিয়র নেইমার। এরপর স্বপ্নের পরিধি বেড়ে যায় তার। নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা ছেলেকে দিয়ে পূরণের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। এ কারণে অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে এর আঁচ লাগতে দেননি। সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন উত্তরসূরির চাওয়া পূরণ করতে। ছোট্ট ছেলের প্রতিভা ক্ষুরধার হওয়ায় কাজটাও সহজ জয়। যার প্রমাণ মেলে স্থানীয় ‘পর্তুগীজা সানটিস্টা’ ফুটবলে দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শনের মধ্যদিয়ে। তখনই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ব্রাজিলের বস্তি থেকে ফুটবিশ্ব শাসন করতে আসছে আরও একজন বিস্ময়বালক। মূলত সাও পাওলোর রাস্তায় ফুটবল খেলতে খেলতে ফুটবলের সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় সেদিনের ছোট্ট নেইমারের। আর তার পরিণতিটা নিয়মিতভাবে দেখেছে ফটবল দুনিয়া।

নেইমারের বিস্ময়কর উত্থানের শুরু ২০০৩ সাল থেকে। ওই বছর তিনি কিশোর প্রতিভা হিসেবে কিংবদন্তি পেলের সাবেক ক্লাব সান্তোসে যোগ দেন। পেশাদার ফুটবলের সঙ্গে তখন থেকেই পরিচিতি ব্রাজিলের বর্তমান স্বপ্নদ্রষ্টার। ফলস্বরূপ অল্প সময়ের মধ্যেই নেইমারের সংসারের অভাব বিতাড়িত হয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই কাড়ি কাড়ি অর্থের মালিক বনে যায় নেইমারের পরিবার। এরপর প্রত্যাশিতভাবেই নাম লেখান সান্তোসের মূল দলে। ফলাফল কি হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! ধারাবাহিক বিস্ফোরক পারফর্মেন্স প্রদর্শন করে নেইমার এখন বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের সেরা তারকাদের একজন। সঙ্গতকারণেই অর্থের ঝনঝনানির সঙ্গে নিত্য বসবাস নেইমার ও তার পরিবারের। টগবগে তারুণ্য। এখনই সময় সবকিছু জয় করার। নেইমার তেমনই করে চলেছেন। ফুল হয়ে ফোটার আগেই ছড়িছে চলেছেন সুগন্ধ। আর তাতেই বিশ্ব বুদ। ২৩ বছর বয়সী এই প্রাণচাঞ্চল তরুণ ২০১৩ সালে নবম ফিফা কনফেডারেশন্স কাপে আরেকবার চেনান নিজের জাত। বিশ্বের বাঘা বাঘা ফুটবলারদের পেছনে ফেলে আসরের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হন। নিজ দেশ ব্রাজিলকে ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ে কারিগরের ভূমিকা পালন করেন। এসব সম্ভব হয়েছে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, পায়ের কারুকাজ, মাঝ মাঠে গতির ঝড়, আচমকা আক্রমণে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে গুড়িয়ে দেয়ার কারণে।

দুর্দান্ত এই পারফর্মেন্স দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও ক্ষুরধার হয়েছে। যার প্রমাণ বর্তমান ক্লাব বার্সিলোনা ও জাতীয় দল ব্রাজিলের হয়ে দেখা যাচ্ছে। সাহসী এই যুবার পারফর্মেন্স এমন যে, মনে হয় তিনি একাই একশ! সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ক্লাব ফুটবলে লিওনেল মেসির ছায়া থেকে ক্রমশই নিজেকে সরিয়ে আনছেন নেইমার। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলিয়ান অধিনায়কের দুর্দান্ত পারফর্মেন্সই এমন সাক্ষ্য দিচ্ছে। এটা ঠিক রেকর্ড টানা চারবারের ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের সঙ্গে খেলে নেইমার সত্যিই নিজেকে অনেক পরিণত করেছেন। মাঠে মেসির সঙ্গে তাঁর দারুণ বোঝাপড়া। মাঠের বাইরেও দুজনের সম্পর্ক অনেক ভাল। তবে বার্সিলোনায় শুরু থেকেই যেন মেসির ছায়ায় ঢাকা পড়েছিলেন নেইমার। যদিও এখন অনেক ফুটবলবোদ্ধার ধারণা, ধীরে ধীরে দলের সবচেয়ে বড় তারকার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছেন ২৩ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান তারকা।

ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে চলা মেসি-রোনাল্ডোর আধিপত্যও ভেঙে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন নেইমার। এবারের লা লীগায় এখন পর্যন্ত ১২ গোল করে তিনি এখন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ১১ গোল করে সুয়ারেজ আছেন দ্বিতীয় স্থানে। রোনাল্ডোর গোল আটটি। গত ছয় মৌসুম স্প্যানিশ লীগের সেরা গোলদাতার পুরস্কার মেসি ও রোনাল্ডো (দু’জনই তিনবার করে) ভাগ করে নিলেও এবার নেইমারের ঔজ্জ্বল্যে অন্য কিছুর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত মৌসুমে বার্সিলোনার ঐতিহাসিক দ্বিতীয় ট্রেবল জয়ে বিশাল অবদান রাখায় এবারের বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার মেসির হাতে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। তবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান নেইমার পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে ফুটবলের সেরা পুরস্কারও পেয়ে যেতে পারেন ব্রাজিলের এই সুপারস্টার।

ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোস ছেড়ে ২০১৩ সালে বার্সিলোনায় যোগ দেন নেইমার। ক্যাটালান ক্লাবটিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই যেন নিজেকে দারুণভাবে মেলে ধরেন তিনি। চলতি মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম নয়, বরং আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার। ইনজুরিতে ভোগা মেসির অনুপস্থিতিতে বার্সাকে যেন একাই টেনে নিচ্ছেন নেইমার। এই মৌসুমে ১৪ ম্যাচ খেলেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। ইতোমধ্যেই প্রতিপক্ষের জালে ১৪ গোল করে নিজের সক্ষমতার জানান দিয়েছেন।

বর্তমানে ব্রাজিলের হয়ে পঞ্চম সর্বোচ্চ গোলদাতা বার্সিলোনা ফরোয়ার্ড। তার গোলসংখ্যা ৬৯ ম্যাচে ৪৬টি। সামনে আছেন কেবল জিকো (৪৮), রোমারিও (৫৫), রোনাল্ডো (৬২) ও কিংবদন্তি পেলে (৭৭)। গত বছর জাপানের বিরুদ্ধে চার গোল করে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্ট্রাইকার বেবেতোকে ছাড়িয়ে যান নেইমার। বেবেতো ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে করেন ৩৯ গোল। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই নেইমার ছাড়িয়ে গেছেন বেবেতোকে। এই বয়সেই বিখ্যাত হলুদ জার্সি গায়ে ৪৬ গোল করে ফেলা নেইমারকে হাতছানি দিচ্ছে ব্রাজিলের হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার।