১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চান্দার বিলের জীববৈচিত্র্য

নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

১০ হাজার ৮৯০ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত চান্দার বিল জীববৈচিত্র্যে ভরা এক বিশাল জলাভূমি। এর পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত মধুমতি বিলরুট ক্যানেল। গোপালগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী চান্দার বিল আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে উঁচু বনভূমি ছিল বলে জানা যায়। এখানে তখন জনবসতি ছিল না, ছিল বন্যপশুর অবাধ বিচরণ। ভূমিকম্পের ফলে ঐসব বনভূমি দেবে গিয়ে বিশাল জলাভূমিতে পরিণত হয়। ৩শ’ বছর আগে চান্দার বিল এলাকা ঘিরে বসতি গড়ে ওঠে। গোপালগঞ্জ জেলার সদর, মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৩৪টি মৌজা নিয়ে আজকের যে চান্দার বিল তার মধ্যে ৫৪ হাজার লোকের বসবাস। এখানকার শতকরা ৭০ ভাগ লোক কৃষিকে প্রধান পেশা হিসেবে নিয়েছেন। যাদের অনেকেই বছরের বেশিরভাগ সময় কৃষিকাজ এবং বাকি সময় মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। খ-কালীন মৎস্য শিকার ছাড়াও অনেক জেলে সম্প্রদায়ের লোক রয়েছে কেবল মাছ ধরাই যাদের পেশা। এখানে একসময় এত বিপুল পরিমাণ মাছ ছিল যে চান্দার বিল বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। মাছের প্রাচুর্যের জন্য এ বিলকে এখনও বলা হয় গোপালগঞ্জের ঐতিহ্য। সাড়ে ৫ হাজার মাছের বিচরণক্ষেত্র চান্দার বিলে সারা বছরই মাছ ধরা হয়। বর্ষাকালে পেশাদার জেলেদের পাশাপাশি কৃষকরা মাছ ধরায় ব্যস্ত থাকে। ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে সবচেয়ে বেশি মাছ ধরা হয়। এসময় প্রতিমাসে গড়ে ৮০ টন মাছ ধরা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। চান্দার বিলে সাড়ে ৫ হাজার কুয়া রয়েছে। বর্ষা চলে যাওয়ার সময় এসব কুয়ায় মাছের জন্য আকর্ষণীয় বিভিন্ন গাছের ডাল কেটে ফেলে রাখা হয়। এই কুয়া থেকেই শুষ্ক মৌসুমে পাওয়ার পাম্প দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরা হয়। এভাবে মাছ ধরার ফলে ক্ষুদে পোনা এবং মাছের ডিম পর্যন্ত বিনাশ হয়ে যায়। চান্দার বিলে মাছের পাশাপাশি রয়েছে বিপুল পরিমাণ শামুক। বিগত ৭/৮ বছর যাবত এ শামুক ব্যাপকভাবে নিধন করা হচ্ছে। এখানকার শামুক চিংড়ির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০টি ট্রলার ও শতাধিক ডিঙি নৌকা শামুক ধরায় ব্যস্ত থাকে। অসংখ্য দরিদ্র নারী-পুরুষ শামুক ধরাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে যেখানে চিংড়ি চাষ হচ্ছে সেখানে এগুলো নিয়ে যাওয়া হয়। এলাকায় কর্মরত বেসরকারী পরিবেশবিষয়ক সংস্থা বিসিএএসের এক জরিপের তথ্যে জানা যায়, প্রতিমাসে চান্দার বিল থেকে গড়ে ২ হাজার টন শামুক ধরা হয়। এভাবে শামুক নিধন অব্যাহত থাকলে চান্দার বিল থেকে একসময় শামুক বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবও ফেলবে।

চান্দার বিলের জলজ প্রাণীর মধ্যে কুচিয়া অন্যতম। কুচিয়া দেখতে সর্পাকৃতি এক ধরনের মাছবিশেষ। এ বিলে কী পরিমাণ কুচিয়া আছে তা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। কার্তিক, মাস থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কুচিয়া ধরার উপযুক্ত সময়। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও শেরপুর এলাকার খ্রীস্টান উপজাতি এবং রংপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন চান্দার বিলে কুচিয়া ধরতে আসে। একটি বেসরকারী সংস্থার জরিপে জানা গেছে, প্রায় দেড় হাজার লোক কুচিয়া ধরতে এই এলাকায় আসে। প্রতিদিন একজন শিকারি ৫ কেজি থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত কুচিয়া ধরে বলে জানা যায়। প্রতি কেজি কুচিয়া স্থানীয় টেকেরহাট বাজারে ৫০০ টাকা থেকে ৬২০ টাকায় বিক্রি হয়। শিকারিরা জানায়, এসব কুচিয়া ভারত, নেপাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়।

কুচিয়া ঐসব দেশের একশ্রেণীর মানুষের প্রিয় খাদ্য। আমাদের দেশেরও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ কুচিয়া মাছ খায়। চান্দার বিলের আরেক সম্পদ হলো পিট কয়লা। চান্দার বিলের নদীর তীরে মাঠ-ঘাট কিংবা বিল অঞ্চলের ৩/৪ হাত মাটি খুঁড়লে বেরিয়ে আসে পিট কয়লা। কোদালের সাহায্য মাটির নিচ থেকে এ কয়লা উত্তোলন করা হয়। উত্তোলনকারীরা নৌকা নিয়ে এসব কয়লা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। মাঝারি সাইজের এক নৌকা পরিমাণ পিট কয়লা তারা ১০০০ টাকা থেকে ১৪০০টাকায় বিক্রি করে থাকে। চান্দার বিল এলাকায় রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে পিট কয়লা ব্যবহার করা হয়।

মাদারীপুর থেকে