২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একটি অধ্যায় শেষের পথে- পরবর্তী অধ্যায়ে কী - স্বদেশ রায়

১৯৭১-এর খুনীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর একটি নিশ্চিত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এর ভিতর দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ’৭১-এর খুনীদের দিন শেষ হতে চলেছে। কেন ৪৫ বছর লাগল, আগে হলে কী ভাল হতো; ওই সব বিশ্লেষণ এখন অর্থহীন। বাস্তবতা, ৪৫ বছর পরে হলেও শেষ হচ্ছে একাত্তরের খুনীদের অধ্যায়। আর ৪৫ বছর একটি জাতির জীবনে এমন বড় কোন সময় নয়। পৃথিবীর নিয়ম হলো, পৃথিবীকে, কোন জাতিকে বা কোন নরগোষ্ঠীকে পরিবর্তিত হতে হলে কোন না কোন ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পৃথিবী বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে আইনস্টাইনের হাত ধরে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাত ধরে। আবার জাতিকে প্রতিবিপ্লব কাটিয়ে একাত্তরের খুনীমুক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের জন্যে। এই হলো পৃথিবীর নিয়ম, বুদ্ধ-কনফুসিয়াস হয়ে এমনি করেই এগিয়ে চলে পৃথিবী।

এখন প্রশ্ন হলো, ’৭১-এর খুনী মুক্ত বাংলাদেশ করার পরবর্তী বাংলাদেশ কোন্ দিকে যাবে? কোন পথে এগোতে হবে বাংলাদেশকে? বাংলাদেশকে প্রথমে যেতে হবে একটা সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের দিকে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ যে ষড়যন্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করেছে ওই ষড়যন্ত্রের আবহাওয়া থেকে এখনও বাংলাদেশের রাজনীতি বের হতে পারেনি। এ ষড়যন্ত্রের সার্বিক চরিত্র বিস্তারিত লেখার জন্য এ কলাম নয়। তবে সাধারণ পর্যায়ের রাজনীতিকরা বা সাধারণ মানুষ চোখের সামনে ষড়যন্ত্রের যে ফল দেখতে পান তা উল্লেখ করলেই বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হয়। যেমন ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে দেখা যাচ্ছে, এই সমাজে শিক্ষার থেকে, যোগ্যতার থেকে অর্থের মূল্য অনেক বেশি। সততার থেকে শঠতার মূল্য বেশি। ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীর থেকে অসৎ, দুর্নীতিবাজ, চরিত্রহীন রাজনৈতিক কর্মীর মূল্য বেশি। সমাজের এই রূপই হচ্ছে সব থেকে বড় প্রমাণ যে, সমাজে ও রাষ্ট্রে এখনও প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবেশ আসেনি। রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি ষড়যন্ত্রের আবহাওয়া দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

এই ষড়যন্ত্রের আবহাওয়া মুক্ত করার প্রথম অধ্যায়ই কিন্তু দেশকে ’৭১-এর খুনীমুক্ত করা। যেমন পাকিস্তানী সামরিক শাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্ত করার প্রথম অধ্যায় ছিল দেশকে স্বাধীন করা। যে কারণে দেশ স্বাধীন করার পরে বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, দেশ স্বাধীন করে দিয়েছি। আর বাইরের থেকে কেউ আসতে পারবে না। এখন বাকিটুকু ঠিক হয়ে যাবে। সেই বাকিটুকু ঠিক হওয়ার আগে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট আসে। রাষ্ট্রীয় চরিত্র ও রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে যায়। রাষ্ট্রীয় চরিত্র পাকিস্তানী হয়ে যায়, রাজনীতির অবস্থান দখল করে ষড়যন্ত্র। দেশের ওই অবস্থায় দেশকে ও মানুষকে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী নেতার জন্য। পরবর্তী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা তাঁর মেধা ও দীর্ঘ সংগ্রাম দিয়ে ’৭১-এর খুনী মুক্ত করার শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাই এর পরবর্তী অধ্যায়ের সংগ্রাম প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবেশের সংগ্রাম। এবং তা বাস্তবায়িত করা।

বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন হতে পারে? ষড়যন্ত্রের আবহাওয়া থেকে বের হয়ে আসতে হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ কোথায় নিয়ে যেতে হবে? ষড়যন্ত্রের এই আবহাওয়া থেকে বের হয়ে এসে বাংলাদেশে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হলে দেশকে এখন সেভাবে নেতৃত্ব দিতে হবে যাতে দেশ ওইখানে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো ও মানুষের মানসিকতা বিচার করেই কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো অত্যন্ত ‘গ্রহণমূলক’ (একোমোডেটিভ) আর মানুষের মনোজগত আর্গুমেনটেটিভ। এ কারণে বাংলাদেশের সমাজে কখনই অথোরেটিরিয়ান বা কতর্ৃৃত্বপরায়ণ রাজনীতি বা সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ আনা সম্ভব হবে না। বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে মধ্যপন্থী উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতি, মধ্যপন্থী রক্ষণশীল রাজনীতি ও অতি উদার রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এই তিনটির ব্যালান্সই কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে সুস্থ করবে।

বাংলাদেশে এই তিনটির মধ্যে এখন মাত্র একটির ৬০ ভাগ মত আছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে ৬০ ভাগ মধ্যপন্থী উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বলা যায়। আওয়ামী লীগের বাকি ৪০ ভাগের ত্রিশভাগ ডানপন্থী ও ১০ ভাগ চরিত্রহীন। এছাড়া বাদবাকি দুটো চরিত্রের অর্থাৎ মধ্যপন্থী রক্ষণশীল ও অতি উদার রাজনীতি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কেউ কেউ অবশ্য বিএনপিকে বা জাতীয় পার্টিকে মধ্যপন্থী রক্ষণশীল হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। এদের গায়ে যতই রাজনীতির খোলস থাকুক না কেন, বাস্তবে এরা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লবের অবশিষ্টাংশ। বাংলাদেশ থেকে এই প্রতিবিপ্লবের অবশিষ্টাংশকে দূর করে তবেই মধ্যপন্থী রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল তৈরি হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মানুষ যতদিন এদের ক্যামুফ্লেলেজে থাকবে, এদের রাজনৈতিক দল মনে করবে ততদিন কিন্তু প্রকৃত মধ্যপন্থী রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হবে না।

এখন কিভাবে এদের এই ধোঁয়াশা থেকে রাজনীতিকে ও সমাজের মানুষকে বের করে আনতে হবে। যদিও এটা সমগ্র সমাজ ও মানুষের একটি আন্দোলন ও সংগ্রাম তারপরেও তা কঠিন কিছু নয়। যে পথে একাত্তরের খুনীদের বিচার করে বাংলাদেশ একাত্তরের খুনীমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করার পথ সৃষ্টি করছে ঠিক একই পথে বাংলাদেশকে ’৭৫-এর প্রতিবিপ্লবী এই অবশিষ্টাংশ মুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লবের এই অবশিষ্টাংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কে কে? খালেদা ও এরশাদ। এরশাদ, ২৫ জনের বেশি মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে তথাকথিত বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। বিচারের আগে মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুরকে হত্যা করেছে। তারপরে জাফর, জয়নাল, সেলিম, দেলোয়ারসহ সর্বোপরি নূর হোসেনকে হত্যা করেছে। শ্রমিক নেতা তাজুলকে হত্যা করেছে। তাই বাংলাদেশকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট প্রতিবিপ্লবের অবশিষ্টাংশ মুক্ত হতে হলে এ হত্যার বিচার করতে হবে। অন্যদিকে খালেদা জিয়া ২১ আগস্ট গণহত্যা করেছে। হত্যা করেছে, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, মমতাজ উদ্দিনসহ অনেক নেতাকে। আর সর্বোপরি পেট্রোলবোমার ও অন্যান্য অস্ত্র দ্বারা এক ধরনের আরবান গেরিলা যুদ্ধের পথ ধরে নারী-শিশুসহ কমপক্ষে সাড়ে তিন শ’ মানুষ হত্যা করেছে- যা স্বাধীনতা পরবর্তী সব থেকে বড় গণহত্যা। খালেদা, তারেক, বাবর এরা সবাই মিলে কেন এ গণহত্যা করেছে? এর একমাত্র উদ্দেশ্য ’৭৫-পরবর্তী প্রতিবিপ্লবী শক্তি ও ’৭১-এর খুনী শক্তি যেন বাংলাদেশে টিকে থাকতে পারে। তাই একাত্তরের খুনীদের মাস্টারমাইন্ডের মতো ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লবের অবশিষ্টাংশ এই মাস্টারমাইন্ড খুনীদেরও বিচার করতে হবে। তাদের সাজা কার্যকর করতে হবে। সে বিচারও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ’৭১-এর খুনীমুক্ত হওয়ার পরে দ্রুততম সময়েই মুক্ত হবে দেশ ’৭৫-এর প্রতিবিপ্লবীদের অবশিষ্টাংশের হাত থেকে।

সাকা, মুজাহিদ, নিজামী, খালেদা, এরশাদ ও তারেক মুক্ত বাংলাদেশে তখন বেড়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি হবে প্রকৃত মধ্যপন্থী রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলের। কারণ যে কোন সমাজে রক্ষণশীলও একটি স্বাভাবিক বিষয়। প্রতিক্রিয়াশীল আর রক্ষণশীল এক নয়। সমাজমাত্রই একটি রক্ষণশীল অংশ থাকবে। সেই রক্ষণশীল অংশের ভিতর থেকে নেতৃত্ব আসবে। সেই নেতৃত্বের পিছে জড়ো হয়ে রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল গঠিত হবে। আর এই রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলটি সৃষ্টি হওয়া কিন্তু মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের জন্যও প্রয়োজন। যখনই দেশে একটি প্রকৃত রক্ষণশীল ডান রাজনৈতিক দল গঠিত হবে তখনই আওয়ামী লীগের ওই ত্রিশভাগ সেখানেই চলে যাবে। আর বাদবাকি যে ১০ ভাগ চরিত্রহীন অংশ আছে এরা কিন্তু প্রতিবিপ্লবীদের অবশিষ্টাংশের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন দেখা যাবে সমাজে যারা আরও একটু উদার অথচ মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক তারা তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগ হয়ে ওই ৪০ ভাগ পূরণ করে ফেলেছে। আর তখনই বাংলাদেশে প্রকৃতার্থে একটি মধ্যপন্থী রক্ষণশীল ও মধ্যপন্থী উদার গণতান্ত্রিক দল দাঁড়িয়ে যাবে।

এই দুটি দল দাঁড়িয়ে যাওয়ার পরে সমাজে আরও একটি অংশ থাকে। ওই অংশ আয়তনে খুব বড় নয়। কিন্তু তাদের বলা যেতে পারে প্রস্ফুটিত ফুলের গন্ধ বা হীরকখণ্ড থেকে ফিরে আসা আরও উজ্জ্বল সূর্য-কিরণ রেখা। এই অংশটিই অতি উদার গণতান্ত্রিক। এ অংশটি যত না বেশি মাস পিপলকেন্দ্রিক তার থেকে বেশি বুদ্ধিবৃত্তিকেন্দ্রিক। আমাদের সমাজে এই অংশটি অনেকদিন কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু এখন কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও বলেন জিন্দাবাদ, জামায়াত-বিএনপিও বলে জিন্দাবাদ। অথচ এই জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে আলবদররা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের শিক্ষকদের হত্যা করেছিল। আর সেলিম তখন জয়বাংলা সেøাগান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন। তাই কমিউনিস্ট পার্টির এই মনোজাগতিক রূপান্তরের পরে সমাজের এই বুদ্ধিবৃত্তিকেন্দ্রিক অতি উদার অংশটি তাদের হাতে নেই। স্বাভাবিকভাবে সমাজের ও রাজনীতির ওই পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে তাই অতি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলটির জন্ম হবে। এদের আকার খুব বড় না হলেও সমাজের চিন্তার জগতে এদের প্রভাব থাকবে খুব বেশি। বলা যেতে পারে, এরাই হবে তখন সমাজের সর্বোচ্চ প্রাণশক্তি।

শেখ হাসিনার নেতৃত্ব একের পর এক ’৭১-এর খুনীমুক্ত করে বাংলাদেশের রাজনীতিকে ওই সুন্দর গন্তব্যে যাওয়ার পথ করে দিচ্ছে। এখন শেখ হাসিনার পাশাপাশি সমাজের সচেতন মানুষকে তাই এগিয়ে আসতে হবে দেশকে ওই সুস্থির রাজনীতির গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এর জন্য সমাজের ভিতর থেকে প্রথম প্রয়োজন, ধর্মের নামে যে সন্ত্রাস বাংলাদেশকে ভয় দেখাচ্ছে ওই সন্ত্রাস যেন ধর্মের নামে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত না করে; তাকে প্রতিরোধ করা। এদেশের সমাজ ‘প্রকৃত ধর্মের’ সুকোমল অংশ বিশ্বাসের ভিতর নিয়ে- জীবনাচরণে সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে যেভাবে এতটা পথ এগিয়ে এসেছে ওই গতিকে প্রবহমান রাখতে হবে। এ কাজ খুব কঠিন নয়। কারণ, সংস্কৃতির একটি আনন্দিত শক্তি আছে। পৃথিবীতে আনন্দিত শক্তির থেকে বড় কোন শক্তি কিন্তু নেই। যে কারণে যুদ্ধেও গাইতে হয় আনন্দিত রণগীতি। তাই সাংস্কৃতিক আবহাওয়ার ভিতর দিয়ে আনন্দিত শক্তিকে জাগ্রত করতে পারলে তথাকথিত ধর্মীয় সন্ত্রাস আপনে পালিয়ে যাবে সমাজ থেকে।

swadeshroy@gmail.com