২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আশরাফসহ রাজাকাররা আমার বাবা নূরুল আমিনকে হত্যা করে

  • যুদ্ধাপরাধী বিচার;###;রোজি মল্লিকের জবানবন্দী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামালপুরের আশরাফ হোসেনসহ ৮ রাজাকারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের তৃতীয় সাক্ষী নুরজাহান বেগম ওরফে রোজি মল্লিক জবানবন্দীতে বলেন, আশরাফসহ অন্য রাজাকাররা আমার বাবা নুরুল আমিন মল্লিককে গুলি ও বেয়নেটের আঘাতে হত্যা করে। জবানবন্দী শেষে আসামি পক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করেন। পরবর্তী সাক্ষীর জন্য ৭ ডিসেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে শরীয়তপুরের মো. সুলাইমান মোল্লার জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে সুলাইমান মোল্লা (৮৪) ও ইদ্রিস আলী সরদার (৬৭)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়ার জন্য আগামী ২২ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ প্রদান করেছে। প্রসিকিউশনে ছিলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, প্রসিকিউটর (সাবেক জেলা জজ) হৃষিকেশ সাহা, ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল ও প্রসিকিউটর রিজিয়া সুলতানা চমন। আসামি পক্ষে ছিলেন এ্যাডভোকেট আব্দুস সুবহান তরফদার, কুতুর উদ্দিন ও মিজানুর রহমান।

জামালপুরের মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, আমার নাম নুরজাহান বেগম ওরফে রোজি মল্লিক। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৫২ বছর। আমার ঠিকানা- মল্লিক ভিলা, সিএ্যান্ডবি রোড, দয়াময়ী পাড়া, জামালপুর। আমি একজন গৃহিণী। আমি এসএসসি পাস করেছি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স আনুমানিক ৭ বছর ছিল। তখন আমরা চার ভাই বোন ছিলাম। ঐ চার ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার বড় ছিলাম। একাত্তর সালে আমার বাবার ওষুধের দোকান ছিল। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

সাক্ষী তার জবানবন্দীতে আরও বলেন, একাত্তরের ৯ জুলাই রাতে আমার বাবাকে আমাদের বর্তমান শহরের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। আমাদের ঐ বাড়িটি দোতলা ছিল। আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি আমাদের বাড়ির নিচতলায় আমার দাদা- দাদির সঙ্গে ছিলাম। ঐ সময় আমার এক ছোট ভাইও দাদা-দাদির সঙ্গেই ছিল। ঐ ঘটনার সময় আমার বাবা-মা আমাদের বাড়ির দোতলায় পশ্চিম কক্ষে আমার ছোট দুই ভাই বোনকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন। ঐ রাতে আমি আমার বাব-মায়ের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়ার সময় আমার বাবা আমাদেরকে বলেন যে, আসামি মোঃ আশরাফ হোসেন, শরীফ আহম্মেদ ও আব্দুল মান্নানদের বদরের ট্রেনিং শেষ হয়েছে, কাজেই আমাদেরকে সাবধানে থাকতে বলেছে।

প্রসিকিউশনের সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, সিংহজানি বালক বিদ্যালয়ে বদর বাহিনী ট্রেনিং নিয়েছিল। রাতে খাবারের পর আমি এবং আমার এক ছোট ভাই নিচতলায় আমার দাদা-দাদির সঙ্গে ঘুমাতে যাই। আমার বাবা মা আমার অপর দুই ছোট ভাই বোনসহ দোতলায় ঘুমাতে যান। মধ্য রাতে দাদার কান্নাকাটি শুনে আমার ঘুম ভাঙ্গে। ঘুম ভেঙ্গে দেখতে পাই যে, আমাদের কক্ষের দরজা খোলা এবং আমার দাদার বুকে রাইফেল তাক করা। আমার দাদা কান্নাকাটি করে বলছিল যে, “আশরাফ, শরীফ ও মান্নান, তোরা আমার ছেলের সর্বনাশ করিস না। এর পর বদর বাহিনীর লোকজন আমার বাবা নুরুল আমিন মল্লিককে আমাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। ঐ রাতে আমরা কেউ বাড়ির বাইরে যাইনি। পর দিন সকালে আমার দাদা, জেঠা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন আমার বাবাকে খুঁজতে বাইরে যান। তারা আসামি শরীফ হোসেন, মক্তব কবিরাজ, ইউসুফ স্যারসহ আরও অনেকের কাছে আমার বাবার খোঁজে যায়। তারা আশ্বাস দিলেও সারাদিন আমার বাবার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরের দিন অর্থাৎ একাত্তরের ১১ জুলাই আমার বাবার লাশ ব্রহ্মপুত্র নদের চাপাতলা ঘাটে পাওয়া যায়। বাবার লাশ যখন পাওয়া যায় তখন তার হাত পা বাঁধা ছিল, মুখে কাপড় গোঁজা ছিল। শরীরে বেয়নেটের খোঁচা ও গুলির আঘাতের চিহ্ন ছিল। আমার বাবা নিহত হওয়ার পর আমার দাদা-দাদি মারা যায়।

সুলাইমান মোল্লার জামিন খারিজ ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শরীয়তপুরের মো. সুলাইমান মোল্লার জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে সুলাইমান মোল্লাা (৮৪) ও ইদ্রিস আলী সরদার (৬৭)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়ার জন্য আগামী ২২ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর (সাবেক জেলা জজ) হৃষিকেশ সাহা।

এর আগে গত ২৯ অক্টোবর এই দুজনের বিরুদ্ধে চার অভিযোগ চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তদন্ত সংস্থা। পরে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। আসামিরা শরীয়তপুর জেলার পালং থানার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর মুসলিমপাড়ার অধিবাসী। সোলায়মান মোল্লা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীদের সাহায্য করার জন্য শান্তি কমিটি এবং রাজাকার বাহিনী গঠন করে। এরপর ৭১-এর সময় শরীয়তপুরে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগসহ সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন।

সোলায়মান মোল্লা ১৯৬৩ সালের পর মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে শরীয়তপুর জেলার পালং থানার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। অপর আসামি গাজী ইদ্রিস আলীও একই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন। চলতি বছরের ১৫ জুন সোলায়মান মোল্লাকে আটক করে জেলে পাঠানো হয়। তবে অপর আসামি ইদ্রিস আলী পলাতক রয়েছেন।