১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকায় হল সঙ্কট, ফরিদপুরে নিয়মিত মঞ্চায়নের সঙ্কট

ফরিদপুর থিয়েটার সম্প্রতি মঞ্চে আনতে যাচ্ছে তাদের পঞ্চাশতম প্রযোজনা বাল্মিকি প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নাটকটির নির্দেশনায় ফরিদপুর থিয়েটার দল প্রধান, সভাপতি এবং অভিনেতা কাজী আমিরুল ইসলাম রুমী। দলের দীর্ঘ যাত্রা, নতুন নাট্য প্রযোজনা এবং ফরিদপুরের নাট্যচর্চার বিভিন্ন দিক নিয়ে আনন্দ কণ্ঠের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন তিনি।

সাক্ষাতকার নিয়েছেন অপূর্ব কুমার কু-ু

আনন্দ কণ্ঠ : আপনাদের নতুন প্রযোজনা নিয়ে বলেন।

রুমী : আমাদের নতুন প্রযোজনা তথা আমাদের দলের পঞ্চাশতম প্রযোজনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নাটক বাল্মিকী প্রতিভা। নাটকটির নির্দেশনা আমার। আমরা নাটকটির প্রিমিয়ার শো করব আগামী ১১ ডিসেম্বর ফরিদপুরের জসিমউদ্দীন হলে। ইতোমধ্যেই নাটকের রিডিং, ব্লকিং এবং টেকনিক্যাল কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে টানা রিহার্সেল। এমনিতেই নাটকের কাহিনী কম-বেশি সকলের জানা। একজন দস্যু যে কিনা মানুষকে হত্যা করে তার সর্বস্ব লুণ্ঠন করে ফিরত, সেই দস্যু সৎব্যক্তির সংস্পর্শে এসে দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে কিভাবে নিজ সাধনায় সৃজন করলেন মহাকাব্য রামায়ণ, হয়ে উঠলেন দস্যু থেকে কবি, মহাকবি তা নিয়েই বাল্মিকী প্রতিভা।

আনন্দ কণ্ঠ : বাল্মিকি প্রতিভা মঞ্চায়নের প্রাসঙ্গিকতা।

রুমী : এমনিতেই বাল্মিকী প্রতিভা নাটক হিসেবে ক্ল্যাসিক। সেটাই যথেষ্ট কারণ মঞ্চায়নের। এবাদের একটা নাটক তো অনেক কথাই বলে। যেমন ধরেন, বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অপরাধের মাত্রা তো বেড়েছে। একটা সংঘটিত অপরাধের পেছনে কতই না কারণ থাকে। অর্থলাভ, বাঁচার নিশ্চয়তা, প্রতিহিংসা, অপরের প্ররোচনা কিংবা আক্রোশ। কারণ যেটাই হোক দিন শেষ অপরাধীকে তো তার বিবেকের আদালতে ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, পাপ-পুণ্যের প্রশ্নে দাঁড়াতে হবে। তখন ঐ অপরাধীর পাশে কে, কেউ না। যারা ইন্ধন যুগিয়েছে তারা না, যাদের জন্য সে অপরাধ করল তারা না। ভাই-বোন-মা-বাবা কেউই তার কৃতকর্মের ভাগীদার না। একা, অপরাধী মানুষটা একা। এই সত্য যখন দস্যু রতœাকর উপলব্ধি করল তখনই সে দস্যুবৃত্তি ছেড়ে মনুষত্ব্যের পথে এগিয়ে চলল। আমরা সবাই অপরাধীর শাস্তি চাই কিন্তু একটা মানুষ যেন অপরাধী হয়ে না ওঠে সে ব্যাপারে খুব বেশি ভাবি না। বাল্মিকি প্রতিভা একজন অপরধীকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে দেয় আর এটাই মঞ্চায়নের সব থেকে বড় প্রাসঙ্গিকতা।

আনন্দ কণ্ঠ : ফরিদপুর থিয়েটারের পথ পরিক্রমা নিয়ে বলেন।

রুমী : ফরিদপুর থিয়েটার প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৯০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু নাটকের ভাললাগা তৈরিটা তারও আগে। ১৯৬০ সাল থেকেই স্কুল-কলেজে নাটকে অভিনয় করছি। নতুন দিনের আলো, শাহজাহান, সিরাজ-উদ-দৌলা প্রভৃতি নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে হাতেখড়ি। ঘর থেকে পালিয়ে যাত্রা দেখেছি। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় একবার মঞ্চে আস্ত ইলিশ মাছ নিয়ে উঠলেন, সেকি উল্লাস। গতরাতে যারা মঞ্চে রাজা উজির সকালে গিয়ে দেখি তারা চাটাই বিছিয়ে ঘুমাচ্ছে। উপলব্ধি হলো, অভিনয়ের মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। অধরা ব্যক্তিদের ধরা যায়। ফলে স্বাধীনদেশে দল গঠন করলাম শিল্পী সংঘ। কালো মানুষ, খাঁচা, ফুটবলসহ নানা নাটক করলাম। তারপর জীবিকার প্রয়োজনে ফরিদপুর ছেড়ে চট্টগ্রাম-ঢাকা করলাম। ’৮৯ তে আবার ফরিদপুরে থিতু হলাম। দেখলাম ফরিদপুরের সেই প্রাণ নেই, সাংস্কৃতিক চর্চা স্থবির। ফরিদপুরের লালদিঘীর চায়ের স্টলে বসেই অনেকে মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম নাটক করব, নাটকের দল করব। ফলাফলে ১৯৯০ সালে ফরিদপুর থিয়েটার। পথনাটক-মাইমোড্রামা এবং মঞ্চনাটক মিলে দলীয় প্রযোজনা পঞ্চাশের দ্বারপ্রান্তে। বিভিন্ন সময় উৎসব করেছি, গুণী ব্যক্তিত্বদের সংবর্ধনা দিয়েছি। অসংখ্য নাট্যকর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রম, আমার স্ত্রী সাহানা বেগমের একান্ত পরিচর্যা নিয়ে এভাবেই এগিয়ে চলছে ফরিদপুর থিয়েটার।

আনন্দ কণ্ঠ : ফরিদপুর এবং ঢাকা নাট্যচর্চার সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নিয়ে বলেন।

রুমী : ফরিদপুর তথা জেলা পর্যায়ে অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলাকুশলী তৈরি হয়, বিকশিত হয় কিন্তু ঢাকায় গিয়ে তারা প্রকাশ পায়। ঢাকায় দর্শক নিজ আগ্রহে নাটক দেখতে আসেন, ফরিদপুরের মতো জেলা শহরে দর্শকদের ডেকে আনতে হয়। ঢাকার দলগুলো প্রচারের শীর্ষে, আমরা পিছিয়ে। ঢাকায় হল সঙ্কট, ফরিদপুরে নিয়মিত মঞ্চায়নের সঙ্কট। ঢাকার সাংবাদিকরা নিয়মিত নাটকের সংবাদ পরিবেশন করে আর আমরা জেলা প্রতিনিধিদের সৌজন্যে টিকেট পাঠিয়েও নাটক দেখাতে পারি না। তবে সাদৃশ্যের একটা বড় জায়গা ঢাকার শক্তি ফরিদপুরের প্রেরণা। যেমন অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে এবং অভিনয়ে নিমগ্ন থেকে কিভাবে ঘোষণা করা যায় ‘এই তো এই আমি’ তা ফেরদৌসী মজুমদারকে দেখে শেখা। কোকিলারা নাটকে তিন মুখ্য চরিত্র, অসংখ্য গৌণ কিন্তু ভিন্ন স্বাদ-বর্ণ-ঘ্রাণের চরিত্র রূপদানকারী তিনি আমাদের ফরিদপুরসহ সারা বাংলার নাট্যকর্মীর প্রেরণা।

আনন্দ কণ্ঠ : নাট্যকর্মীদের উদ্দেশ কিছু বলেন।

রুমী : কী আর বলব। ১১ তারিখ সোমবার প্রথমে অশোক মুখার্জীর গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় মাইমোড্রামা স্বাধীনতা এবং তারপরই আমার নির্দেশনায় বাল্মিকী প্রতিভা মঞ্চায়ন হবে ফরিদপুর জসিমউদ্দীন হলে। সব ভালবাসা তো নাটককে ঘিরে। তাই আপনারা আসবেন এবং নাটকটা দেখবেন।

আনন্দ কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

রুমী : আনন্দকণ্ঠকেও ধন্যবাদ।