২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যুদ্ধের আরও বাকি

  • মুনতাসীর মামুন

[২৫ নবেম্বরের পর]

দুই.

সাকাচৌ ও মুজাহিদকে নিয়ে যে মিডিয়া সার্কাস তৈরি করেছিল ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তা দেশের জন্য সম্মানজনক নয়। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এ দেশের ইমেজ অনেক নষ্ট করছে। একটি উদাহরণ দিই। কোন শ্বেতাঙ্গ কূটনীতিক দেখলেই তারা মাইক হাতে তার সামনে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। যেন শ্বেতাঙ্গ কূটনীতিবিদ দু’একটি পরামর্শ দেন বাংলাদেশকে। একজন সাংবাদিকেরও সাহস হয়নি যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারকে জিজ্ঞেস করতে, ফ্রান্সে ভ্রমণের জন্য রেড এলার্ট জারি করেছে কিনা ইউ-কে? না করলে কেন করেনি? যেখানে বাংলাদেশে একজন বিদেশী নিহত হওয়ায় এলার্ট জারি করা হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতকে? পৃথিবীর কোন দেশে এমনকি আফ্রিকার গরিব দেশেও সাংবাদিকরা এ ধরনের আত্মমর্যাদাহীন ব্যবহার করে নাÑ যা বাংলাদেশের সাংবাদিকরা করেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধীদের পরিবার থেকে চাকর-বাকররা কী বলল, কী করল, তা রাত একটা পর্যন্ত শুনতে বাধ্য করা হয়েছে। জ্ঞানহীন সাংবাদিকরা একই কথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে গেছেন। ক্ষমাভিক্ষা নিয়ে সারাদেশে তারা একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রপতি ১৯৭০ সাল থেকে নির্বাচিত হচ্ছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭০ থেকে এ পর্যন্ত কখনও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের প্রতি কোন সহানুভূতি দেখাননি। কেন বারবার এ প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল যে, তিনি মার্জনা ভিক্ষা করবেন কি করবেন না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিচার শুরু করেছেন। তিনি কী করে তাদের প্রাণভিক্ষা দেবেন? সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে ঐ দিন মিডিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা আগে ইংরেজী জানি না কিন্তু দুটি ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করে তারা এ কাজগুলো করে- ‘অবজেকটিভিটি’ ও ‘নিউট্রালিটি’। বিভিন্ন টক শো-তে মানবতাবিরোধী অপরাধের সমর্থনে এসব মিডিয়া বক্তব্য রাখার সুযোগ দিয়েছে। শুরুতে ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করেছে। অথচ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও তারা ভূমিকা রেখেছে। যারা আজ মিডিয়ার কর্ণধার তারাও বিভ্রান্ত। দুটি পক্ষ এক সঙ্গে সমর্থন করা যায় না। ইলেকট্রনিক মিডিয়াও আজ সাকাচৌর ভূমিকায় চলে গেছে। হাসানুল হক ইনু যিনি প্রতি বিষয়ে বক্তব্য রাখতে ভালবাসেন, তিনিও এ বিষয়ে নিশ্চুপ। কারণ, মিডিয়ার মালিকরা প্রবল অর্থশালী, অধিকাংশ আওয়ামীবিরোধী; কিন্তু সরকারে তাদের প্রভাব অনেক।

মিডিয়ায় এসব বিভ্রান্তি ছড়ানো সাধারণ মানুষকেও স্পর্শ করেছে। অন্যভাবেও বিচার করা যেতে পারে। এ বিভ্রান্তি যেভাবেই সৃষ্টি হোক এর ভিত্তিটা কী? দুটি কারণ থাকতে পারে। এক. কখনই এদের ঔদ্ধত্য ও অপরাধের বিচার-শাস্তি-প্রতিবাদ কোনটাই হয়নি। দুই. সরকারী দলের অনেক নেতা মাঠপর্যায়ে জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মী ক্রিমিনালদের দলে টেনে নিচ্ছেন এবং এ সব কারণে, কেন্দ্র কখনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। এতে সকলের মনে এ বিষয়ে সরকারী দলের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাসও তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি ক্ষমাভিক্ষা নাকচ করার পরও মানুষ বিশ্বাস করেনি তাদের ফাঁসি হবে। এমনকি এরা দু’জনও। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাত ১০টায় ক্ষমাভিক্ষা নাকচ হয়েছে জানার পর তারা নিশ্চিত হন তাদের দ- কার্যকর হবে।

এ দ- কার্যকর সমাজ ও রাজনীতিতে অভিঘাতের সৃষ্টি করবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের যাতে বিচার না হয় সে জন্য অপরাধীরা কোটি কোটি টাকায় লবিস্ট নিয়োগ করেছেন, মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে দিয়ে বিবৃতি দেয়ানো হয়েছে, বিদেশী রাষ্ট্রগুলো বিচার না করার জন্য চাপ দিয়েছে; কিন্তু সরকার মাথা নোয়ায়নি। আমাদের জন্য এ বিষয়টি একটি বড় ব্যাপার। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনেক নীতির সমালোচনা করলেও তাঁকে সমর্থন করি। তিনি অন্তত দেশের মর্যাদার কথাটুকু ভাবেন।

এতসব চাপ ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সাকা-মুজাহিদের দ- কার্যকর হওয়ায় সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। অপরাধ করলে বিচার একদিন হবেই এবং অপরাধী শাস্তি পাবেইÑ ঐতিহ্যগত এ ধারণায়ও মানুষের বিশ্বাস আসবে।

সামাজিকভাবে যদি বিচার করি তা হলে বলতে হবে, জিয়া-এরশাদ-খালেদা দেশে শুভ-অশুভ ব্যাপারটি এক করে ফেলেছিলেন। খুনীদের যে দেশে সম্মান করা হয় সে দেশে শুভ কোন কিছু টিকে থাকতে পারে না। এবং তাদের শাসনকালে কী শুভ সৃষ্টি হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষ তার একটি উদাহরণও কেউ দেখাতে পারবে না। খুনীদের ইনডেমনিটি একমাত্র বাংলাদেশেই দেয়া হয়েছিল। এই তিনজন সাকা-মুজাহিদের মতো কিছু ঠ্যাঙ্গারে সৃষ্টি করেছেন, কিছু কুলাঙ্গার রাজনীতিবিদ সৃষ্টি করেছেন। এখন অপরাধীর বিচার হয় না বা হবে না তা বলা দুরূহ হবে। সরকার এজন্য অবশ্যই কৃতিত্বের দাবি করতে পারে। তারা আবার শুভ-অশুভের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারছে। জিয়া ও সামরিক বাহিনী, এরশাদ ও সামরিক বাহিনী, খালেদা জিয়াও তার ঠ্যাঙ্গারে বাহিনীর [এবং এদের সমর্থনে প্রশাসন] কারণে সাকাচৌ বা মুজাহিদের মতো দুর্বৃত্তরা সমাজে ‘ভদ্রলোক’, ‘রাজনীতিবিদ’ হিসেবে এতদিন করে খেয়েছেন।

তিন.

মানবতাবিরোধী দুই অপরাধী বা দুর্বৃত্তদের প্রাণভিক্ষার একটি তাৎপর্য আছে। তারা নিজেদের এত শক্তিশালী মনে করেছিলেন যেÑ ভেবেছিলেন, ‘নিয়ম রক্ষার’ জন্য দরখাস্তটি করলে তা মঞ্জুর হয়ে যাবে। এর কারণ, সাকাচৌর বিচার নিয়ে উচ্চ আদালত বিতর্কের মুখে পড়েছিল।

মানবতাবিরোধী কোন অপরাধী এর আগে প্রাণভিক্ষা চায়নি। এরা দু’জন প্রাণভিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন। জামায়াত ও মুসলিম লীগ যে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং গণহত্যা চালিয়েছিল তা শুধু আদালতই বলেননি, এটি ছিল ইতিহাসের সত্যÑ যে সত্যকে উল্লিখিত দুই রাষ্ট্রপতি ও এক প্রধানমন্ত্রী অসত্য প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। এদের দু’জন এই অপরাধ স্বীকার করে নেয়াতে অন্তিমে ইতিহাসেরই জয় হলো। বিজয় হলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষেরই। এখন জামায়াত/মুসলিম লীগকে নিষিদ্ধ না করার কোন রাজনৈতিক অজুহাত আর থাকছে না। আরও প্রমাণিত হলো বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে এসব দলকে নিষিদ্ধ করে সঠিক কাজটিই করেছিলেন।

এদের দ- কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পাকিস্তানের হাই কমিশনারকে ডেকে ভর্ৎসনা করেছে। কিন্তু পাকিস্তানী এই ক্ষোভের মধ্যেও আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক আছে।

পাকিস্তান তার এজেন্টদের জন্য অবশ্যই দুঃখিত হবে। এবং এরা যে পাকিস্তানের খাস এজেন্ট তা পাকিস্তানের বক্তব্যেই প্রমাণিত হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সমর্থনকারী ড. কামাল হোসেনের জামাতা ডেভিড বার্গম্যানও [পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী] লিখেছেন, সাকা ছিলেন আইএসের প্রধান এজেন্ট। পাকিস্তান প্রমাণ করল, জামায়াত তাদের অনুগত দল।

জামায়াত বা বিএনপি পাকিস্তানের অনুগত। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন, বাংলাদেশে পাকিস্তানী এজেন্ট বা পাকিস্তানের প্রতি অনুগত দলকে রাজনীতি করতে দেয়া যাবে কিনা? এখন এ প্রশ্ন সর্বস্তরে আলোচনায় আনতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বলি, নির্মূল কমিটির বিভিন্ন নেতা এবং ব্যক্তিগতভাবে শাহরিয়ার কবির এবং আমি গত এক দশক ধরে বলে আসছি এবং লিখে আসছি যে, গণহত্যা বা মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন ওঠালে তাকে আইনের সম্মুখীন করতে হবে। না হলে এদেশে শুভ-অশুভর পার্থক্য সৃষ্টি হবে না। মানবতাবিরোধী অপরাধের পক্ষে বিদেশী ডেভিড বার্গম্যান কীভাবে এদেশে বসে কাজ করে যাবেন এবং একটি পত্রিকা তাকে প্রতিবেদক হিসেবে রাখবে সে প্রশ্নও আসবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যদি হয়, তা’হলে তার সমর্থনকারীর বিচার কেন হবে না? যদি না হয় তা’হলে ফৌজদারী আইনের অনেক ধারা বিলুপ্ত করতে হবে। কেননা, ফৌজদারী আইনে খুনের প্রশ্রয়দাতা, সমর্থককেও বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। এখন আইন কমিশন ও সংসদকে এ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন উঠবে। ক্রিমিনাল অর্র্গানাইজেশন বা যুদ্ধাপরাধীর দল হিসেবে যদি জামায়াতের রাজনৈতিক নিবন্ধন বাতিল করা হয় তা’হলে মানবতাবিরোধীদের সমর্থনকারী রাজনৈতিক নিবন্ধন থাকবে কোন্ যুক্তিতে? বিএনপির যেসব রাজনৈতিক নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধের সমর্থন করে বিবৃতি দেন তা হলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে না কেন? সরকারকে তো বটে, সিভিল সমাজের নেতাদেরও এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

সাকাচৌ ও মুজাহিদের দ-ের ঘটনায় আরেকবার প্রমাণিত হলো যে, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিভাগ বেতন ও মর্যাদাভোগীদের একটি বিশেষ বিভাগ মাত্র। যখন এ বিচার নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হচ্ছিল, তখন এই প্রেস বিভাগের দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়ে বিবৃতি দেয়া উচিত ছিল। এ দ- কার্যকর হওয়ার পর আলজাজিরা থেকে ভারতের এনডি টিভি পর্যন্ত বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের তারা সব সময় ‘ইসলামিস্ট’ এবং ‘অপজিশন লিডার’ বলে উল্লেখ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রেস বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত দৃঢ় হওয়া উচিত ছিল বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। এ বিভাগের তো এমন একজন মুখপাত্র থাকা উচিত যিনি বিষয়গুলো জানবেন ও জানাবেন। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র এমনকি তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা উচিত ছিল, মানবতাবিরোধী অপরাধীরা ‘ইসলামিস্ট’ বা ‘অপজিশন লিডার’ হতে পারে না। যদি হয় তা’হলে ফ্রান্সে যারা ১২৯ জন খুন করেছে- তাদের ‘ইসলামিস্ট লিডার’ না বলে কেন ‘টেররিস্ট’ বলা হচ্ছে? বাংলাদেশে বিদেশী সাংবাদিক যারা অবস্থান করছেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত এ বিষয়ে তাদের সতর্ক করে দেয়া।

চার.

সমাজ স্বীকৃত দুই খুনীর শাস্তি হয়েছে, সবাই সন্তুষ্ট হয়েছেন। তারপরও বলব, আমরা অনেকেই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এরা ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করেছেন, ৬ লাখ নারীকে নির্যাতন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর এসব পরিবারগুলো অসহ্য নির্যাতন ভোগ করেছে, নিপীড়িত হয়েছে, নিঃশেষ হয়ে গেছে। গত ৩০ বছর তারা প্রতিনিয়ত অপমানিত হয়েছে।

অন্যদিকে, এই খুনীদের সমাজ রাষ্ট্রে শুধু আসীন নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বলীয়ান করা হয়েছে। সাকাচৌর সম্পদের বিবরণ দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। অনুমিত যে এসব সম্পত্তির বড় অংশ এসেছে সন্ত্রাস ও চোরাচালানের মাধ্যমে। সংসদেও তা আলোচিত হয়েছে। এ বিষয়ে সঠিক তদন্ত করলে প্রমাণিত হবে এটি অনুমান না অসত্য। মুজাহিদ বা অন্যান্য অনেক নেতা ছিলেন হদ্দ গরিব। সেই মুজাহিদ নিজামীকে দেশ সেবার জন্য জমি দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠবে, খুন করা কি দেশ সেবা? যারা এই সংজ্ঞা দিয়েছেন তাদেরও কেন বিচার হবে না ক্ষমতার অপব্যবহার ও তথ্য বিকৃতি করার? মীর কাশিম আলীর এত টাকা যে তিনি ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে লবিস্ট নিয়োগ করতে পারেন। ২৫ মিলিয়ন ডলার কীভাবে বাংলাদেশের বাইরে গেল সে প্রশ্নও কেউ ওঠাননি।

এখন যাদের দ- কার্যকর হলো বা যাদের হবে বলে আশা করি, তারা সারাজীবন ক্ষমতায়, বৈভবে কাটিয়ে গেলেন এবং তাদের উত্তরাধিকারও বৈভবে কাটাবেন। অন্যদিকে যাদের জন্য এ দেশের সৃষ্টি হলো তাদের পরিবার সারাজীবন নিগৃহীত হবে, নিঃস্ব থাকবে সেটি কোন্্ ধরনের ন্যায় বিচার? যতদূর মনে পড়ে, ট্রাইব্যুনালের এক রায়ে আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বলা হয়েছে পর্যবেক্ষণে। কিন্তু এখন সময় এসেছে সরকারের পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার। দ-ের সঙ্গে তাদের সম্পদও বাজেয়াফত করা সমীচীন ছিল বিশেষ করে ‘দেশে অবদানের’ জন্য যা দেয়া হয়েছিল। সেই সম্পদ প্রাপ্য নিঃস্ব পরিবারগুলোর।

অনেকের মনে হয়েছে এবং সরকারী কথাবার্তায়ও একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও দ- কার্যকর হলে ইসলামের নামে যেসব খুনখারাবি হচ্ছে তা বন্ধ হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তা মনে করি না।

গত ৩০ বছর মানবতাবিরোধী অপরাধী ও তাদের সমর্থকরা অর্থ, পদ ও বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের প্রভাববলয় তৈরি করেছে এবং অপরাজনীতির একটি আদর্শ তৈরি করেছে। ঐ আদর্শে অনেকেই আচ্ছন্ন। এটি উপেক্ষা করলে ভুল হবে। মনে রাখা উচিত দেশের ৩০-৩৫ ভাগ এই আদর্শে আচ্ছন্ন। বর্তমান সরকারের উচিত ছিল একইভাবে তাদের প্রভাববলয় সৃষ্টি করা এবং মানস জগতে আধিপত্য বিস্তার করা। কোন কোন ক্ষেত্রে কাজ হয়েছে। শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে হয়নি। জনকণ্ঠে প্রকাশিত আমার আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম, কীভাবে বাংলাদেশবিরোধী আদর্শ সরকারী মাদ্রাসাগুলোতে পড়ানো হচ্ছে। মানস জগতে প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারলে সব লড়াই-ই বৃথা যাবে।

এই মানস জগতের আধিপত্য যাতে অটুট থাকে সে কারণে তারা একটি সেকেন্ড ফ্রন্ট তৈরি করেছে যেগুলো এখন জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে জঙ্গী মৌলবাদ এখন সমস্যা ও হুমকি। মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে এর প্রভাব থাকবে না এ ধারণা অবাস্তব। নিয়মিত ব্লগার বা মুক্তচিন্তার লেখককে হত্যা করা, হুমকি দেয়া এর উদাহরণ। বাংলাদেশে যতদিন প্রকাশ্য দল হিসেবে বিএনপি-জামায়াত ও হেজাবিরা থাকবে ততদিন মৌল ও জঙ্গীবাদ থাকবে। মৌলবাদীদের তোষণ বন্ধ করা জরুরী। শিক্ষা-সংস্কৃতির সমন্বিত রূপকল্প প্রণয়ন জরুরী। একই সঙ্গে জঙ্গী দমন ও বিচারে আলাদা সেল গঠন এখন সময়ের প্রয়োজন মাত্র। যদি বিএনপির সৃষ্টি না হতো, যদি জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকত তা’হলে আজ অবশ্যই বলা যেত, হ্যাঁ, লড়াই শেষ। কিন্তু ১৯৭৫-এর পর তো ছকই উল্টে গেল।

লক্ষ্য করবেন, জঙ্গী মৌলবাদী ও বিএনপি-জামায়াতের কথাবার্তা একই ধরনের। কার্যকলাপও এক ধরনের। মুজাহিদরা ১৯৭১ সালে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় অগ্রাধিকার দিয়েছিল। সেই পরিকল্পনাই কিন্তু আবার রূপ দিতে চাচ্ছে। সুতরাং, বর্তমান হত্যাকা- নতুন কিছু নয়। পুরনো পরিকল্পনাই আবার নতুনভাবে কার্যকর করার প্রচেষ্টা। শুধু তাই নয়, তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিও সুদৃঢ়। মিসরে ব্রাদারহুডের অর্থনৈতিক ভিত্তি তেমন ছিল না। অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে সামরিক বাহিনীর। তা’ ছাড়া সরকার মৌল জঙ্গীবাদীদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি, সেখানে এখনও দিচ্ছে না। মসজিদগুলোও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আমরা দেখি আহমদ শফী ও বাবুনগরী এখন ‘ভিআইপি’। সরকারের তোষামোদ কি বাবুনগরীকে নিবৃত্ত করতে পেরেছে সাকার জানাজা পড়ানো থেকে? সরকারী দল এখানে আশ্রয় দেয় জামায়াত-বিএনপির কর্মী ও ক্রিমিনালদের। মুক্তচিন্তার কোন লেখকের হত্যার বিচার এগোয়নি। জামায়াত নিষিদ্ধ নিয়ে এক ধরনের খেলাধুলা চলছে।

সবশেষে, শেখ হাসিনাকে আবারও অভিনন্দন জানাই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের দ- কার্যকর করার জন্য। এসব দ- কার্যকর করার মাধ্যমে আমাদের লড়াই খানিকটা এগোবে বটে; কিন্তু যতদিন তাদের [হেজাবি] আদর্শ ও রাজনীতির লড়াই নিঃশেষ না হবে ততদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিজয় সম্পন্ন হয়েছে বলা যাবে না। এখন লড়াইটা হবে মানবতাবিরোধী অপরাধী ও তাদের সমর্থক, দেশে নষ্টামির রাজনীতির প্রবর্তক বিএনপির বিপক্ষে। আমরা মনে করি, সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে তবে মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা সমর্থন করছে ও করবে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে না। শুধু স্বাধীনতার পক্ষ থাকবে। এখন লড়াইটা চলবে। এ লড়াই শুধু সরকারের নয়, আমাদেরও।

সমাপ্ত