২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মরণ ॥ শহীদ ডাঃ মিলন

  • ডাঃ এম নজরুল ইসলাম

আজ ২৭ নবেম্বর। শহীদ ডাঃ শামসুল আলম খান মিলনের ২৫তম শাহাদাত বার্ষিকী। বিএমএ’র ২৩ দফা ও গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের আন্দোলন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালের এই দিনে তৎকালীন স্বৈরাচারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে তিনি প্রাণ হারান। ডাঃ মিলন লক্ষ্মীপুর জেলার কলাকোপা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শাতাদাৎ উল্লাহ, মা সেলিনা আক্তার। একমাত্র মেয়ে শ্যামা, বয়স তখন তিন বছর, বর্তমানে লন্ডনে পড়ালেখা করে। মিলন একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। নটরডেম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই মিলন রাজনৈতিক সচেতন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। পেশাগত জীবনে ডাঃ মিলন আমার এক বছরের জুনিয়র ছিলেন। আমি ১৯৮২ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে আর মিলন ১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। আমি তখন ইন সার্ভিস ট্রেইনি অবস্থায় বিএমএ’র কার্যকরী কমিটির কনিষ্ঠতম সদস্য নির্বাচিত হই এবং বিএমএ কর্মকা-ে ভূমিকা রাখি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। ক্ষমতা নিয়েই এরশাদ দেশের সমগ্র চিকিৎসক সমাজের বিরুদ্ধে নানা রকম কালাকানুন জারি করা শুরু করলেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় প্রচার মাধ্যমে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করতে লাগলেন। এরই মধ্যে পাস করা নবীন চিকিৎসকদের প্রচলিত ইন সার্ভিস ট্রেইনি প্রোগ্রাম বাতিলের ঘোষণা দিলেন। মিলন নবীন চিকিৎসকদের সংঘবদ্ধ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং ইন সার্ভিস ট্রেইনি চিকিৎসক সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে তিনি এর আহ্বায়ক হন। একদিকে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিএমএ ২১ দফা দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করে, অন্যদিকে ইন সার্ভিস ট্রেইনি প্রথা বাতিলের বিরুদ্ধে ইন সার্ভিস ট্রেইনি চিকিৎসকরা আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। বিএমএ দেশের এই নবীন চিকিৎসকদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায় এবং এক পর্যায়ে কর্মসূচী ঘোষণা করে। এখান থেকেই বিএমএ’র সঙ্গে ডাঃ মিলনের সম্পৃক্ততা এবং আমিও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পাই। সেদিনের সে আন্দোলনে ডাঃ মিলনের সাহসী ভূমিকার কথা আমার আজও মনে পড়ে। ১৯৮৫ সালে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসক (প্রকৃচি) কৃতী পেশাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলাসহ ৯ দফা দাবি নিয়ে আরেকটি আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. মির্জা জলিল তখন প্রকৃচির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

ডাঃ মিলন এ সময় বিএমএ কার্যকরী কমিটিতে না থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা থাকার কারণে সরকারের কোপানলে পড়েন। শুধু তাই নয়, ডাঃ মিলন তখন তৎকালীন ওচএগজ-এ গ-চযরষ কোর্সে অধ্যয়নরত ছিলেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে কোর্স থেকে ডেপুটেশন বাতিল করে তাকে রংপুরের রৌমারী উপজেলায় বদলি করা হয়। এতকিছুর পরও ডাঃ মিলন সেদিন প্রকৃচির ৯ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনকে আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভূমিকা রাখেন। ডাঃ মিলনের মাঝে সবচেয়ে বড় যে গুণটি ছিল সেটা হলো- সততা, সাহস এবং আদর্শের প্রতি অবিচল। কোন মোহই তাকে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল। চিকিৎসক হয়ে এই ৭ বছর ডাঃ মিলন আমাদের মধ্যে বেঁচেছিলেন। এই ৭ বছরের মধ্যে তিনি বিএমএ’র প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং যুগ্ম-সম্পাদক পদে নির্বাচন করে দু’বারই জয়ী হন।

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরাজমান সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে বিএমএ’র আগের ২১ দফা দাবি পুনর্মূল্যায়ন করে নতুনভাবে ২৩ দফা দাবি সরকারের কাছে পেশ করা হয়। এরই মধ্যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশের চলমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিরাজমান সমস্যা অর্থাৎ বিএমএ’র ২৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন না করে নতুন করে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বিভিন্ন কালাকানুন চাপিয়ে দিয়ে একটি গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণা করেন। বিএমএ এই গণবরিরোধী স্বাস্থ্যনীতি প্রত্যাখ্যান করে এবং এর বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে। ডাঃ মিলন এই আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এরই একপর্যায়ে ১৯৯০ সালের ২৭ নবেম্বর সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে তৎকালীন বিএমএ’র মহাসচিব ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে একই রিক্সা করে পিজি হাসপাতালে বিএমএ’র এক সভায় যোগ দিতে রওনা দেন। আমি তখন নবাবপুর রোডের একটি প্রেসে বিএমএ’র আন্দোলনের প্রচারপত্র নিয়ে কাজ করছিলাম। প্রেসের কাজ সেরে আমারও ওই সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল। হঠাৎ করে লোক মুখে শুনতে পাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একজন ডাক্তারকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি বিএমএতে ঢোকামাত্রই শুনতে পাই- টিএসসির সামনে একই রিক্সায় ডাঃ জালাল ভাই এবং ডাঃ মিলনকে লক্ষ্য করে এরশাদ সরকারের পেটোয়া বাহিনী গুলি ছোড়ে এবং সে গুলিতে ডাঃ মিলন নিহত হন। ঘটনা শুনে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলে যাই এবং পরিস্থিতি নিয়ে তাৎক্ষণিক অধ্যাপক ডাঃ এসজিএম চৌধুরী স্যারের অফিস রুমে বিএমএ’র জরুরী সভায় মিলিত হই। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা স্বৈরাচার খুনী সরকারের অধীনে চাকরি করব না বলে গণপদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেই এবং ডাঃ মিলনের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা সাক্ষেপে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে দাফনের সিদ্ধান্ত নেই। কেননা তখন মিলনের মৃতদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছিল তৎকালীন সরকার। এরই মধ্যে সরকার সন্ধ্যা থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে কার্ফ্যু জারি করে। তাই সন্ধ্যার মধ্যেই আমরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে মিলনের দাফনকার্য অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে শেষ করি। এখানে উল্লেখ্য, ডাঃ মিলনকে গুলি করে হত্যা করার সংবাদ ঢাকাসহ সারাদেশের চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছামাত্রই তখন যে যে অবস্থায় ছিলেন সেখান থেকে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ঢাকা প্রেসক্লাবসহ সারাদেশে চিকিৎসক-জনতার উপস্থিতিতে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ডাঃ ইউনুস আলী সরকার, ডাঃ রোকেয়া সুলতানাসহ বিএমএ’র অন্য নেতৃবৃন্দ প্রেসক্লাবের সামনে এই হত্যার বিরুদ্ধে ধিক্কার জানান এবং বিএমএ’র গণপদত্যাগের ঘোষণা জানান। ডাঃ মিলনের হত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আজকের প্রধানমন্ত্রী এবং সেদিনের ১৫ দলীয় জোটনেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিবৃতি দেন এবং পরদিন ঢাকাসহ সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করেন। সেদিন ডাঃ মিলনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে চলমান স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রায় গতি পায় এবং হত্যার মাত্র ক’দিনের মধ্যে স্বৈরাচার এরশাদ সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

শহীদ ডাঃ মিলন শুধু দেশের চিকিৎসক সমাজেরই গর্ব নন, তিনি দেশেরও গর্ব। যেখানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম হবে, যেখানেই অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম হবে, যেখানেই অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই হবে, যেখানেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াই হবে, সেখানেই ডাঃ মিলনকে পাওয়া যাবে। ডাঃ মিলন শুধু ক্ষণিকের জন্য নয়, যুগে যুগে আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে প্রেরণা যোগাবেন। তিনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর।

লেখক : সাবেক সহ-সভাপতি, বিএমএ এবং যুগ্ম-মহাসচিব,

পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ