২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভ্যন্তরীণ পর্যটন

কবি আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া।’ ঘরের পাশেই অবারিত প্রকৃতির কত রূপ-রস, রঙের চিত্র-বিচিত্র সমাহার, কতই না মনোরম নিসর্গশোভা, কত না জীববৈচিত্র্য, পাখি ও প্রজাপতির বর্ণিল ওড়াউড়ি। ষড়ঋতুর দেশে কতই না রূপবৈচিত্র্য, রঙের খেলা, রঙের মেলা! এসবই দেখতে মন চায় মানুষের। সূর্যের অকৃত্রিম দাবদাহে গ্রীষ্মের আগমন, মুষলধারায় বৃষ্টিতে মেলে বর্ষার পরিচয়, নীলাকাশ ও কাশফুলের অফুরান সৌন্দর্যে শরতের উত্থান, হিম হিম কুয়াশা ও শীতলতায় হেমন্তের নবান্ন, কুয়াশা ও ঠা-ায় মোড়া উপভোগ্য শীত, সর্বোপরি ফুল পাখি ও মৃদুমন্দ সমীরণসহ বসন্তের রূপ-মাধুর্য বাংলাদেশকে করে রাখে মনোরম ও অপরূপ। বর্তমানে প্রকৃতিতে চলছে হেমন্তের সমারোহ। মাঠভরা সোনালি সুপক্ব ধান, কৃষকের মুখে হাসির তুফান, কিষানির ব্যস্ততা আর উৎসবের আমেজ। এ যেন চিরায়ত চিরসবুজ গ্রামবাংলার অনবদ্য রূপ। বাতাস কেমন উদাস করা, কুয়াশামাখা। না শীত, না গ্রীষ্মÑ মনোরম এক আবহাওয়া। এ যেন কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা। না, মনে মনে নয় বরং দেশ ও প্রকৃতিকে প্রাণমন ভরে অবলোকন করতে বেরিয়ে যাওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

সত্য বটে, গত কয়েক বছরে দেশের অভ্যন্তরে মধ্যবিত্ত তো বটেই, এমনকি সাধারণ মানুষেরও বেড়ানোর অভ্যাস অনেকটা বেড়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বদেশকে জানা ও বোঝার প্রচ- আগ্রহ ও কৌতূহল লক্ষ্য করা যায়। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ছুটির দিনে অথবা কোন উপলক্ষে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েÑ কখনও জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, আহসান মঞ্জিল, বোটানিক্যাল গার্ডেনের উদ্দেশে। পিকনিক বা বনভোজনের নিমিত্ত সমবেত হয় ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, মধুপুর ইকো পার্ক, সোনারগাঁ, মেঘনাঘাট, যমুনা রিসোর্ট বা অন্য কোথাও। ঈদ কিংবা পূজায় যখন ছুটির মওকা একটু বেশি মেলে, তখন সহজেই চলে যাওয়া যায়Ñ জাফলং, তামাবিল-মাধবকু-ু, কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন, বান্দরবান-খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, সাজেক-ভ্যালি, সুন্দরবন-কুয়াকাটা। দেশের অভ্যন্তরে এসবই অত্যন্ত মনোরম ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। সর্বোপরি প্রকৃতির এক অবারিত অফুরন্ত পাঠশালা তো বটেই। কেবল সুন্দরবন, কক্সবাজারেই যে বিপুল পরিমাণ নিসর্গ সম্ভার ও অফুরন্ত সম্পদের উৎস মেলে, তা নিয়েই বিশ্বে রীতিমতো গর্ব করতে পারে বাংলাদেশ। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গত ক’বছরে দেশের অভ্যন্তরে এসব বেড়ানোর জায়গা সম্পর্কে প্রায় সর্বস্তরের মানুষের কৌতূহল ও আগ্রহ বেড়েছে ব্যাপকহারে। পত্রপত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলগুলো এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রেখে চলেছে প্রতিনিয়ত।

তবে এতকিছুর পরেও কথা থাকে। সারাদেশে অগণিত পর্যটনস্থল থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটামুটি উন্নত হলেও, সেসব পর্যাপ্ত, প্রশস্ত ও মসৃণ নয়। অনেক স্থানেই রাস্তাঘাটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। যানবাহনও অপ্রতুল। বাতানুকূল যানবাহন তো রীতিমতো বিলাসিতা বলা চলে। রেল ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজসাধ্য নয়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অথচ সুন্দরবনের সঙ্গে রাজধানীর নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও ভাল বলা যাবে না। অনুরূপ অবস্থা কক্সবাজারের সঙ্গে ঢাকার। সে অবস্থায় অভ্যন্তরীণ পর্যটন আরও সহজসাধ্য ও সুগম করতে হলে বহুমুখী আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। এর পাশাপাশি প্রয়োজন থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা এবং দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখানোর উপযুক্ত গাইড। এসব ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা লক্ষণীয়। সর্বোপরি নিশ্চিত করা দরকার নিরাপত্তা। মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘরের বাইরে তখনই পা রাখবে, যখন সে উদ্দীষ্ট স্থানে গিয়ে নিরাপদ বোধ করবে। অন্যদিকে স্থানীয় জনপদসহ পর্যটনস্থলেও প্রাকৃতিক সম্পদের নিরাপত্তা বিধান জরুরী। এদিকে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। অভ্যন্তরীণ পর্যটন আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করতে হলে এসব দিকে জরুরী দৃষ্টি দিতে হবে।