২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিল্পকর্ম ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার সেতুবন্ধন

  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

২০০২ সালে খালেদা জিয়ার অত্যাচার থেকে দূরে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে আমি আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমার প্রয়াত ছেলে ড. জালাল আলমগীরের কুইনস বেরী সড়কের ওপর অবস্থিত এ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম তখন। এই সময়ে প্রায়শই জালাল তার শিক্ষকতার পীঠস্থান ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ফেনওয়ে পার্ক ঘুরে আমাকে বোস্টন ললিতকলা জাদুঘরের সুরম্য ইমারতে নামিয়ে যেত। আমি দিনভর এই জাদুঘরের সংগৃহীত চিত্রকলাদি দেখতাম। তারপরও যখনই বোস্টন গিয়েছি তখন এই জাদুঘরে রক্ষিত আগের এবং নতুনভাবে সংগৃহীত চিত্রকর্ম দেখতাম আর মানবজাতির সজীব সৃজনশীলতার প্রতিফলন দেখে মুগ্ধ হতাম।

১৮৭০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ম্যাসাচুসেটসের আইন সভা সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায় একটি ট্রাস্টি বোর্ডের পরিচালনাধীনে ললিতকলা সংগ্রহকরণ সংরক্ষণ ও প্রদর্শন এবং ললিতকলার ক্ষেত্রে শিক্ষা দেয়ার জন্যে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত করে। বিদগ্ধজনের দানের ভিত্তিতে এই জাদুঘর ১৮৭৬ সালের ৪ জুলাই জনসাধারণের কাছে ললিতকলার প্রদর্শনীসহ উন্মুক্ত হয়। তারপর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন ও আশা অনুযায়ী এই জাদুঘরের বিস্তৃতি ঘটে। ১৯১৩ সালে সাইরাস ভাল্লিনের বিখ্যাত ব্রোঞ্জনির্মিত অশ্বারোহীর ভাস্কর্যÑ ‘পরমাত্মার কাছে আবেদন’ এই জাদুঘরের সামনের চত্বরে এর পরিচিতির প্রতীক হিসেবে স্থাপন করা হয়। জগদ্বিখ্যাত স্থপতি আই, এম, পেই এই জাদুঘরের শেষ পর্যায়ের সম্প্রসারণের পশ্চিম বাতায়নের নক্সা তৈরি করেন। এই পেই প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভ জাদুঘরের সম্প্রসারণের স্থপতি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাদুঘরের বিস্তৃত ইমারতে শখের দোকান, রেস্তরাঁ, মিলনায়তন এবং বিশেষ প্রদর্শনীর স্থান-গ্রাহাম গুন গ্যালারি বিদ্যমান।

শুরু থেকেই এই জাদুঘর সম্প্রসারণ ও পরিচালনায় সরকারের তরফ থেকে তেমন কোন অনুদান বা সহায়তা দেয়া হয়নি; সরকার প্রত্যক্ষভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেনি। বেসরকারী দাতারা এর জন্য কেবল চিত্রকলা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, প্রয়োজনানুযায়ী এর সংরক্ষণ ও প্রসারণের জন্য উদার হাতে অনুদান দিয়েছেন। এদের মধ্যে বেশ নামকরা দাতা ছিলেন এডওয়ার্ড সিলভেস্টার মোর্স ও আনন্দ কুমার স্বামী। কথিত আছে, মোর্স একাই ঐ সময়ে এই জাদুঘরের জন্য ৬ হাজার শিল্পকর্ম সংগ্রহ ও দান করেছেন। এশিয়ান শিল্পকর্মের অন্যতম প্রধান দাতা ছিলেন কুমার স্বামী। এশিয়ান শিল্পকর্মের বাইরে এই জাদুঘরের জন্য ইউরোপ থেকে সংগৃহীত হয়েছে ফ্রাঁসোয়া মিলেট, ক্লড মনেট, এডওয়ার্ড মানেট, কামিল পিছারু ও পিয়ারে রেনওয়ের প্রখ্যাত শিল্পকর্ম। সংগৃহীত আমেরিকান শিল্পকর্মের মধ্যে সিংগলটনের আঁকা ছবি ও কপলে কারলিকের সংগ্রহাদি দৃষ্টিনন্দিত তাৎপর্যমূলক। বোস্টন এককালে যুক্তরাষ্ট্রের তাঁত শিল্পের কেন্দ্র ছিল। তাঁত শিল্পের বিভিন্ন নক্সা-ইউরোপিয়ান, তুর্কী, ভারতীয়, পার্সিয়ান, ইন্দোনেশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের বুনন শিল্পের নজরকাড়া নক্সাগুলো সংগৃহীত হয়েছে এই জাদুঘরে। এই জাদুঘরের অন্যতম প্রধান সংগ্রহগুলো এসেছে মিসর, নবিয়া ও নিকট প্রাচ্যে (বোস্টনে অবস্থিত) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগে পরিচালিত প্রতœতাত্ত্বিক অভিযাত্রার প্রাপ্তি হিসেবে। স্থান পেয়েছে মিসরের গিজার পিরামিড এবং সেই সময়কার আগে ঐ অঞ্চলের রাজা-রানীর স্মৃতিভিত্তিক মহামূল্যের প্রতœসামগ্রী। ১৯৭১ সালে এই জাদুঘরে সমকালীন শিল্পকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিমূর্ত শিল্পকর্মের প্রতিফলক হিসেবে এখানে সংরক্ষিত আছে মরিস লুই, হেলেন, ফ্লাংকেন থেলার ও নোল্যান্ডের ক্যানভাস ও পটসমূহ। এই জাদুঘরে রয়েছে ৩ লক্ষাধিক মুদ্রা, রেখাচিত্র, জল রং, চিত্রময় বই, পোস্টার ও ফটোগ্রাফ বা আলোকচিত্র। এসব পৃথিবীর অন্যতম বিশাল সংগ্রহ। এই সকল সংগ্রহ সংরক্ষণ এবং তার প্রযুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়া বিচ্ছুরণের জন্য এই জাদুঘরে স্থাপিত রয়েছে একটি বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণাগার। যেখানে তারা সমগ্র পৃথিবী থেকে আগত ছাত্র ও উৎসাহীদের শিল্প সংরক্ষণবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন।

এই জাদুঘরের সংগ্রহগুলোর মধ্যে ডর্নাটেলো (১৩৮৬-১৪৬৬) এর মার্বেলে খচিত ‘মেঘের মেডোনা’ শিরোনামাধীন শিল্পকর্ম দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। মার্বেলে এত নিখুঁতভাবে এত বছর আগে শিল্পকর্মকে অনুপমভাবে বাক্সময় করা যেতে পারে বলে আমি আগে ভাবিনি। তেমনি রসোফিউরানটিনো (১৪৯৬-১৫৪০) এর তেল রঙের ছবি ‘ফেরেস্তাদের সাথে মৃত ঈসা’ শিরোনামের চিত্রটি আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে। ক্লড মিচেল (১৭৩৮-১৮১৪) এর ‘প্লাবন’ শিরোনামে পোড়ামাটি বা টেরাকোটাতে খচিত নিখুঁত প্রতিফলন দেখে আমি মোহিত হয়েছি। বার বার এই যুগজয়ী শিল্পকর্মটি আমি দেখেছি এই জাদুঘরে। তেমনি আমি মুগ্ধ হয়েছি বিশাল প্রতিকৃতি বা কলোসাস যা এঁকে ছিলেন ফ্রান্সেসকো গয়া। মনেটের (১৮৪০-১৯২৬) ৩৫টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে এই জাদুঘরে। তার ক্যানভাসে আঁকা সেই বিখ্যাত তৈলচিত্র ‘জল কোমল’ আমাকে মুগ্ধ করেছে।

আমি এই জাদুঘরে ক্লড মনেট (১৮৪০-১৯২৬) এর ‘সূর্যাস্ত’ দেখেছি। পল গগার (১৮৪৮-১৯০৩) এর ‘মরিয়মকে অভিবাদন’, ভ্যান গগের (১৮৫৩-১৮৯০) ‘ডাক কর্মী’ তৈলচিত্র দেখে সৃষ্টির নানাদিকের শিল্পবোধের প্রতিফলন দেখে অনুভূতির বৈচিত্র্য অনুধাবন করার উৎসাহ পেয়েছি। গগার বিখ্যাত কাঠ খোদাই শিল্পকর্ম ‘ভালবাসায় সিক্ত সুখ’ দেখে এই জগদ্বিখ্যাত শিল্পীর বিভিন্ন শৈল্পিক মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশিত করার প্রতিভা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আধুনিক যুগের এলভিন ল্যান্ডন (১৮৮২- ১৯৬৬)-এর প্লাটিনামের ওপর মুদ্রিত ‘ইউসেমাইট জলপ্রপাত’ আমাকে মুগ্ধ করেছে। জগদ্বিখ্যাত পাবলো পিকাসোর (১৮৮১-১৯৭৩) ‘নারীর মস্তক’ ও ‘দ-ায়মান মানবমূর্তি’ এই জাদুঘরে সংগৃহীত শিল্পকর্মের অপূর্ব নিদর্শন। পিকাসোর ১৯৬৩ সালে আঁকা ‘সেবাইন নারীকুলের ধর্ষণ’ শীর্ষক ক্যানভাসের ওপর তৈলরঙে আঁকা ছবিটি পাপাচারের বিরুদ্ধে মানবজাতির মূল্যবোধ অপরূপ ও আবেদনময় চিত্রকল্প হিসেবে এই জাদুঘর আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। পিকাসের আঁকা এসব চিত্রকল্পের সংগ্রহ আরও বেশি সংখ্যায় আমি দেখেছিলাম সেন্ট পিটারস বার্গের হার্মিতাজ জাদুঘরে। বোস্টন জাদুঘরে সংগৃহীত পিকাসোর এই শিল্পকর্ম সংখ্যায় না হলেও মানবাশ্রয়ী আবেদনে হার্মিতাজে সংরক্ষিত পিকাসোর শিল্পকর্মের অনুরূপ বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। স্কট প্রায়রের ‘আয়া ও গোলাপ’ শীর্ষক ক্যানভাসে তৈলরঙে আঁকা শিল্পকর্মটি একটি শান্তির নীড়ের অনবদ্য প্রতিফলন যা অনুপুঙ্খ বিস্তার ও মাত্রায় তার শিল্পকর্মটিকে প্রযুক্তি উৎসারিত আলোকচিত্র বা ফটোগ্রাফের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। হেনরি মাটিসের (১৮৬৯-১৯৫৪) ক্যানভাসের ওপর তৈলরঙে আঁকা ফুলদানি মার্ক শাগালের ক্যানভাসের ওপর তৈলরঙে আঁকা ‘গাঁয়ের পথ’ আধুনিক যুগের শিল্পকর্মের নিরন্তর সন্দীপণ রূপে আমার কাছে প্রতিভাত করেছে।

সেই সময়ে যখন খালেদা জিয়ার সরকারের অত্যাচার থেকে আশ্রয় খুঁজেছিলাম বস্টনে, তখন প্রায় প্রতি শিশির সিক্ত সকালে এবং বিকেলের পড়ন্ত মিষ্টি রোদের পরশে এই জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে ঘুরে আমি জগদ্বিখ্যাত এসব ছবি দেখেছি। পৃথিবীর অন্যান্য বড় জাদুঘরের মধ্যে আমি প্যারিসের ল্যুভ, নিউইয়র্কের মহানগরী জাদুঘর এবং সেন্ট পিটারসবার্গের হার্মিতাজ দেখেছি। লন্ডনের ব্রিটিশ জাদুঘরে প্রধানত পুরনো বই ও দলিলাদি খুঁজে দেখেছি। কায়রোয় স্থাপিত ও পরিচালিত সেই বহু যুগের আগের মমি ও প্রতœরতেœর কয়েকটি সংগ্রহশালা ঘুরে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। কিন্তু বোস্টনের এই ললিতকলা জাদুঘরের মতো সুবিন্যস্ত এবং আকর্ষণীয় অবয়বে দেখা ও উপভোগ করার চিত্রশিল্পী সামগ্রী সেসব জাদুঘরে দেখিনি। ঐ সব জাদুঘরের তুলনায় মনে হয়েছে বোস্টনের এই জাদুঘর সাধারণ মানুষ ও কারুপিপাসী ব্যক্তিবর্গের যতœ, মায়া ও মমতায় অধিকতর সিক্ত। ঐ সময়ের পর যখনই সুযোগ পেয়েছি তখনই বোস্টনের এই ললিতকলা জাদুঘরে আমি গিয়েছি, দেখেছি এবং প্রাণভরে মানুষের সৃজনশীলতার পরিচয় পেয়ে নিজকে পূর্ণ ও ধন্য মনে করেছি।

বোস্টনের এই ললিতকলা জাদুঘর দেখে ও উপভোগ করার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশে ঐ ধরনের জাদুঘর গড়ে তোলার লক্ষ্যে কতিপয় কথা বলা যেতে পারে। এক. দেশের ললিতকলার সংগ্রহশালা হিসেবে ঢাকা জাদুঘরের প্রাঙ্গণে সম্ভবত বর্তমান জাদুঘর ইমারতের পশ্চিমে ললিতকলার একটি কেন্দ্রীয় সংগ্রহশালা স্থাপন করা সঙ্গত হবে। সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত, কারু ও লোকশিল্প জাদুঘরের সংগ্রহে সমৃদ্ধি আছে বলে এখনও বলা যায় না। সেই প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহ ও উদ্যম এই কেন্দ্রীয় সংগ্রহশালায় প্রযুক্ত করা লক্ষ্যানুগ হবে বলে আমি মনে করি, তেমনি লক্ষ্যানুগ হবে ময়মনসিংহের জয়নুল সংগ্রহশালাকে এর সঙ্গে একীভূত করা। আমাদের দেশের জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এসএম সুলতান, শাহাবুদ্দিন, কিবরিয়া, সফিউদ্দিন, দেবদাস চক্রবর্তী, হাশেম খান, প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী। আমাদের নভেরা আহমেদ আবেদনময়ী ভাস্কর, যিনি ইউরোপেও সুনাম কুড়িয়েছেন। এদের শিল্পকর্মগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এগুলো সংগ্রহ করে জাতীয় ঐতিহ্যের উপকরণ হিসেবে এই সংগ্রহশালায় রাখা যেতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে আমি ব্যক্তিগত সংগ্রহের নিগড়ে জয়নুল, যামিনী রায়, নন্দলাল এমনকি চুগতাই ও হোসেনের আঁকা ছবি দেখেছি। তবে দেখতে পাইনি রামকিংকর বেজের কোন ছবি। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক গুস্তাভ পাপানেকের লেকসিংটনস্থ নিবাসে আমি জয়নুলের এক বিশাল তৈলরঙে আঁকা ছবি দেখে আনন্দে চমকে উঠেছি। বোস্টন ললিতকলা জাদুঘরের সংগ্রহ সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ব্যক্তি-উদ্যোগ যেভাবে ও মাত্রায় ফলদায়ক হয়েছিল, সেভাবে ও সেমাত্রায় ব্যক্তি বিশেষের সংগ্রহ থেকে ললিতকলার এসব ঐতিহ্যবাহী এবং প্রদর্শনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে সকলের জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে। দুই. প্রস্তাবিত সংগ্রহশালা নির্মাণ, বাড়ানো ও সংরক্ষণের জন্য সরকারী অনুদানের বাইরে ব্যক্তিগত অনুদান ও সহায়তা আকর্ষণ করা বিধেয় হবে। এর ব্যবস্থাপনায় উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা পালনের জন্য দেশের সৃজনশীল ও প্রতিষ্ঠিত চিত্রশিল্পীদের দিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা লক্ষ্যানুগ হবে। এ ধরনের উপদেষ্টা কমিটি জনগণের সঙ্গে দেশের ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার সেতুবন্ধন স্থাপনে সহায়ক হবে। এই উপমহাদেশে শিল্পকর্মের ঐতিহাসিক বিকাশের প্রেক্ষাপটে যদি আমাদের দেশে আমরা এ রকম সংগ্রহশালা স্থাপন করতে সমর্থ হই, তাহলে অতীতের অর্জনের পটভূমিকায় সমকালীন সৃজনশীলতা যোগ করে এক শিল্পানুরাগী সমাজ আমরা গড়ে তুলতে সক্ষম হব। এ ধরনের শিল্পানুরাগ দেশের পরিচিতি যেমন সম্প্রতি প্যারিসে কর্মরত শাহাবুদ্দিন এবং মাদ্রিদে কর্মরত মনিরুল ইসলাম তুলে ধরেছেন তা আরও পরিব্যপ্ত করা সম্ভব হবে। তিন. দেশের প্রখ্যাত শিল্পকর্মসমূহের প্রতিলিপি আনুষ্ঠানিক পরিচিতিমূলক প্রকাশনার মাধ্যমে পৃথিবীর প্রখ্যাত জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় পাঠানোর পদক্ষেপ নেয়া সঙ্গত হবে। আমাদের শিল্পীদের নৈপুণ্য ও সৃজনশীলতা এবং অনুভূতির বাক্সময়তা বিদেশের শিল্পানুরাগীদের কাছে সমাদ্রিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। চার. ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে আমাদের শিল্পকর্ম সম্পর্কে তথ্যাদি এবং এই প্রতিষ্ঠানের পোষকতায় পৃথিবীর নামী-দামী জাদুঘর ও সংগ্রহশালার সঙ্গে তাদের তথ্য ও প্রতিলিপির সঙ্গে বিনিময় করা শিল্পক্ষেত্রে এই দেশের ভূমিকা ও অবদানকে অধিকতর প্রস্ফুটিত ও সমাদৃত করবে। এই লক্ষ্যে সরকারের (সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়) তরফ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। পাঁচ. পৃথিবীর নামকরা ললিতকলা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মশীল যোগাযোগ বাড়িয়ে এদেশের তরুণ শিল্পীদের দিয়ে শিল্পকলার আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক মাধ্যমাদি গ্রহণ ও প্রযুক্ত করা সম্ভবপর হবে এবং উৎপাদনশীল বস্তুভিত্তিক পার্থিব শিল্পের সঙ্গে সংযোগ বিস্তৃত ও সুদৃঢ় হতে পারবে।

বোস্টন ললিতকলা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই শেষ বিষয়টি আমি প্রাথমিকভাবে আলোচনা করেছি। আমার ধারণা এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য তারা এবং অন্যান্য বিখ্যাত ললিতকলা জাদুঘর বা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ও জাদুঘরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাইবেন।

ললিতকলা মানুষ হিসেবে আমাদের প্রাপ্তি, উপলব্ধি, অভিজ্ঞান এবং আকাক্সক্ষাকে শাণিত ও সতেজ করে। এভাবে শাণিত ও সতেজ হলে আমরা উপলব্ধির বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যে শক্তিশালী হয়ে জাতীয় পরিচয়কে তুলে ধরতে ও বিস্তৃত করতে সমর্থ হই, সংস্কৃতিকে আমাদের জাতিগত বিবর্তনের সফল প্রচেষ্টার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারি এবং যুগের পর যুগ ধরে আমাদের চিন্তা, প্রচেষ্টা ও অর্জনকে আমাদের সৃজনশীলতার ধারক, বাহক ও প্রেরণাদাত্রী হিসেবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হই। এই কথা মনে রেখে এই ক্ষেত্রে বোস্টন ললিতকলা জাদুঘরের উদাহরণকে কেবল আকর্ষণীয় নয়, গ্রহণীয় ও অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে আমরা ব্যবহার করতে পারি। সেই পথে শুরু হোক আমাদের বিষয়ান্তরিক অভিযাত্রা।

লেখক : সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী