২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ দু’আ ইউনুস মাহাত্ম্য

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্্ সালাম আল্লাহ্র নবী ছিলেন। কুরআন মজীদের ১০ নম্বর সুরার নামকরণ তাঁর নামেই করা হয়েছে। তিনি দরিয়ায় নিক্ষিপ্ত হলে একটি প্রকা- মাছ তাঁকে গিলে ফেলে, কিন্তু আল্লাহ্র রহমতে ঐ মাছ তাঁকে হজম করতে তো সমর্থই হয়নি, এমনকি তাঁর দেহের সামান্যতম অংশেও কোনরূপ ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারেনি। সেই মাছের উদর-অন্ধকারে বসে আল্লাহ্র নবী হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালাম অত্যন্ত কাতর স্বরে যে দু’আখানি পড়েছিলেন তা দু’আ ইউনুস নামে বহুল পরিচিত, আর সেই দু’আখানি হচ্ছে : লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুব্হানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্ জলিমীন।

কুরআন মজীদে হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামের নামে যেমন একটি সুরা রয়েছে তেমনি ইউনুস নামটিও অন্ততপক্ষে পাঁচ স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আমি তো আপনার নিকট ওহী প্রেরণ করেছি, যেমন ওহী প্রেরণ করেছিলাম নুহ্ ও তাঁর পরবর্তী নবীগণের নিকট এবং ওহী প্রেরণ করেছিলাম ইব্রাহীম, ইসমা’ঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণের নিকট এবং ‘ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলায়মানের নিকটও (সুরা নিসা : আয়াত ১৬৩)। আর হিদায়াত দান করেছিলাম ইসমা’ঈল আল-ইয়াসা’আ, ইউনুস ও লুতকে এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্ব জগতের ওপর প্রত্যেককে এবং তাদের পিতৃপুরুষ, বংশধর ভাইদের কতককে। আমি তাদের মনোনীত করেছিলাম এবং সহজ সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম (সুরা আন’আম : আয়াত ৮৬-৮৭)। ইউনুসও ছিলেন রসুলদের একজন (সুরা সাফ্ফাত : আয়াত ১৩৯)। সুরা ইউনুসের ৯৮ নম্বর এবং সাফ্ফাতের ১৪৫ নম্বর আয়াতে কারীমাতেও ইউনুস নামের উল্লেখ আছে।

হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামের পরিচিতিমূলক নাম হিসেবে কুরআন মজীদে তাঁকে যুন্নূন, সাহিবুল হূত নামে অভিহিত করা হয়েছে। যুন্নূন শব্দের অর্থ মাছের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর সাহিবুল হূত শব্দের অর্থ মৎস্য সহচর। তাঁর পিতার নাম মুত্তা। বাইবেলে ইউনুস (আ)-কে জোনাহ নামে অভিহিত করা হয়েছে। হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালাম নিনেভা নামক জনপদের পথভ্রষ্ট জনগণকে সত্যপথের দিশা দেয়ার জন্য প্রেরিত হন। কিন্তু নিনেভার লোকজন তাঁর আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় তিনি তাদের আল্লাহ্র গজবের খবর দিয়ে আল্লাহ্র নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিনেভা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য রওনা হন। পথিমথ্যে দরিয়া পড়লে তা পাড়ি দেয়ার জন্য একটি জাহাজে ওঠেন। জাহাজটি মধ্য দরিয়ায় গিয়ে ঘূর্ণিপাকে পড়ে। তখন জাহাজের চালক ধারণা করে যে, জাহাজে কোন অপরাধী আছে, যে কারণে জাহাজটি বিপাকে পড়েছে। সেকালের নিয়ম অনুযায়ী লটারিতে বার বার হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামের নাম ওঠে। তখন বাধ্য হয়ে তাঁকে দরিয়ায় ফেলে দিলে জাহাজটি বিপাক থেকে রক্ষা পায়, আর একটি বিরাট মাছ হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামকে গিলে ফেলে।

কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : ইউনুসও ছিল রসুলদের একজন। স্মরণ করো, যখন সে পালিয়ে বোঝাই নৌযানে পৌঁছল, অতঃপর সে লটারিতে যোগদান করল এবং পরাভূত হলো। পরে এক বৃহদাকার মাছ তাঁকে গিলে ফেলল। তখন সে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। সে যদি আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তাহলে তাকে উত্থান দিবস পর্যন্ত ওটার উদরে থাকতে হতো (সূরা সাফ্ফাত : আয়াত ১৩৯-১৪৪)। এখানে উত্থান দিবস বলতে বোঝানো হয়েছে কিয়ামত দিবস তথা রোজ হাশর বা পুনরুত্থান দিবসকে।

ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালাম অক্ষত অবস্থায় ৪০ দিন সেই বৃহদাকার মাছের উদরে বসে তসবীহ-তাহ্লীল, তওবা-ইস্তিগ্ফার করেছিলেন এবং আল্লাহ্র বিনানুমতিতে স্বদেশ ত্যাগ করার জন্য অনুশোচনা ব্যক্ত করে কান্নাকাটি করেছিলেন। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : এবং স্মরণ করো যুন্নূনের কথা যখন সে রেগেমেগে বের হয়ে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তাকে পাকড়াও করব না (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৭)। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : ফানাদা ফিজ্ জুলুমাতি আল লাইলাহা ইল্লা আন্তা সুব্হানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্ জলিমীনÑ অতঃপর সে (ইউনুস) অন্ধকার হতে আহ্বান করেছিল : আপনি ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই, আপনি পবিত্র সুমহান। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের (অপরাধীদের, সীমা লঙ্ঘনকারীদের) অন্তর্ভুক্ত (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৭)।

আল্লাহ জাল্লা শানুহু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নবীকে পরীক্ষা করেছেন। আমরা দেখি হযরত ইব্রাহীম ‘আলায়হিস্ সালামকে পুত্র কুরবানী করতে উদ্যত হয়ে আল্লাহ্র প্রেমের পরীক্ষা দিতে, হযরত আইয়ুব ‘আলায়হিস্ সালামের দীর্ঘদিন ধরে রোগ যন্ত্রণা ভোগ করে, সহায়-সম্পদ সবকিছু হারিয়ে আল্লাহ্র প্রেমের পরীক্ষা দিতে। মাছের উদরের সেই নিকষকালো অন্ধকারে ৪০ দিন ভীষণ কষ্টের মধ্যে থেকে হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালাম আল্লাহ্ প্রেমের এবং আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : তখন আমি তার (ইউনুসের) ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকে এবং আমি মু’মিনদের নাজাত দিয়ে থাকি (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৮)। হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালাম ৪০ দিন মাছের উদরে ছিলেন। মুর্হরম মাসের ১০ তারিখে অর্থাৎ আশুরার দিনে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তার দু’আ কবুল করেন এবং ঐ দিনই আল্লাহ্র নির্দেশে সেই বৃহদাকার মাছটি তাকে দরিয়ার কিনারে এক তৃণহীন প্রান্তরে উগরিয়ে দেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, আশুরা দিবসে তিনি মাছের পেট থেকে মুক্তি পান, সেই হিসাবে তাকে যেদিন মাছটি গিলে ফেলে সেদিন ছিল জিলহজ মাসের ১ তারিখ। সে যাক, কুরআন মজীদে হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামের মুক্তি পাওয়ার ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : অতঃপর আমি ইউনুসকে নিক্ষেপ করালাম এক তৃণহীন প্রান্তরে এবং সে ছিল রুগ্ন। আর আমি তার ওপর একটি লাউগাছ উদ্গত করলাম (সুরা সাফ্ফাত : আয়াত ১৪৫-১৪৬)।

এখানে উল্লেখ যে, হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালাম দীর্ঘ ৪০ দিন মাছের পেটে নিকষকালো অন্ধকারে পানি-খাদ্যবিহীন অবস্থায় দিন-রাত গুজরান করায় ফ্যাকাসে এবং ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, যে কারণে এই অবস্থা থেকে নিরাময়ের জন্য আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু পরিবেশ দূষণমুক্তকারী এবং নির্মল ছায়াদানকারী লাউগাছ সেখানে গজিয়ে দেন। সেই লাউগাছটি এত দ্রুত গজিয়ে ওঠে যে, মুহূর্তের মধ্যে ঘন লতাপাতায় তা তাঁবুর আকার ধারণ করে। তিনি কচি লাউ খাবার হিসেবে গ্রহণ করেন এবং একটি বক্রি মতান্তরে হরিণী সেখানে সহসা হাজির হলে তিনি তার দুধ পান করেন। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। লাউ, লাউলতা, লাউপাতার ঔষধি ও ভেষজগুণ তখন থেকেই প্রকাশ পায়।

তারপর তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে নিজের কওমের কাছে ফিরে যান এবং এক লাখ মানুষ তাঁর কাছ থেকে হিদায়াত লাভ করে। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : তাকে (ইউনুসকে) আমি এক লাখ বা ততোধিক লোকের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। এবং তারা ইমান এনেছিল, ফলে আমি তাদের কিছুকালের জন্য জীবন উপভোগ করতে দিলাম (সুরা সাফ্ফাত : আয়াত ১৪৭-১৪৮)।

এখানে উল্লেখ্য যে, ইরাকের মসুল অঞ্চলে নিনেভার অবস্থান ছিল আর যে দরিয়ায় হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামকে মাছে গিলে ফেলছিল সেই দরিয়া হচ্ছে দজলা নদী। এই দজলার তীরেই বর্তমান বাগদাদ নগরী অবস্থিত। দু’আ ইউনুস লাইলাহা ইল্লা আন্তা সুব্হানাকা ইন্তি কুন্তু মিনাজ্ জলিমীন-এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অপরিসীমী। আল্লাহ্র নবী হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালাম এই দু’আ পাঠ করেই আল্লাহ্র রহমতে মৎস্য উদর তথা মৃত্যু গহ্বর থেকে নাজাত পেয়েছিলেন।

যদি কেউ দু’আ ইউনুস কয়েকবার পড়ে দু’আ করে তার দু’আ কবুল হয়, কেউ যদি বিপন্ন বা বিপদগ্রস্ত অবস্থায় এই দু’আ পাঠ করে আল্লাহ্র রহমতে সে বিপদ থেকে উদ্ধার পায়। এক বর্ণনায় আছে যে, সিজদায় গিয়ে ৪০ বার দু’আ ইউনুস পাঠ করে অঙ্গুলি ইশারা দিয়ে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর দরবারে দু’আ করলে আল্লাহ্ তা কবুল করেন। আরও বর্ণিত আছে যে, দৈনিক এক হাজার বার দু’আ ইউনুস পড়লে পদমর্যাদা সমুন্নত হয়, আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তার রুজি-রোজগারে সমৃদ্ধি দান করেন, তার দুঃখ-যন্ত্রণা, পেরেশানি, অশান্তি, কষ্ট প্রভৃতি নিবারিত করেন, সকল প্রকার কল্যাণের দ্বার তার জন্য খুলে দেন, শয়তানের প্ররোচনা হতে তাকে রক্ষা করেন। খতমে ইউনুসের মজলিস করে এক লাখ পঁচিশ হাজার বার পড়লে তাবত অপকার হতে রক্ষা পাওয়া যায়, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, রোগ-শোক থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সুরা ইউনুসে রয়েছে আল্লাহ্র তাওহীদের সুস্পষ্ট ঘোষণা, তাঁর পবিত্রতার ঘোষণা এবং নিজের অপরাধের স্বীকারোক্তি, যে কারণে এটা এত মাহাত্ম্যপূর্ণ হয়েছে।

এক তথ্য থেকে জানা যায় যে, যেদিন হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামকে মধ্য দরিয়ায় পানিতে ফেলে দেয়া হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃহদাকার মৎস্যটি গিলে ফেলে সেদিন সময়টি ছিল চাশ্ত নামাজের ওয়াক্ত আর তিনি ৪০ দিন পরে যে সময় মৎস্য উদর থেকে নাজাত পান তখন ছিল আছরের নামাজের ওয়াক্ত।

নিয়মিত সুরা ইউনুস আমলের মধ্যে অনেক ফায়দা রয়েছে। হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিআল্লাহ্ তা’আলা আন্হু বলেন, আমি হযরত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম : হে আল্লাহ্র রসুল! এই দু’আর (দু’আ ইউনুসের কবুলিয়াত) গ্রহণীয়তা কি কেবল হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামের জন্যই প্রযোজ্য, না সব মুসলিমের জন্য? জবাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর জন্য এই দু’আটি খাসভাবে কবুল হলেও কবুলের ব্যাপারে এটা সব মুসলিমের জন্য সব সময়ই প্রযোজ্য। তুমি কি কুরআন মজীদে পাঠ করোনি : ওয়া কাযালিকা নুন্জীল্ মু’মিনীন- আর এই ভাবেই আমি (আল্লাহ্) মু’মিনদের উদ্ধার করে থাকি।

হযরত ইউনুস ‘আলায়হিস্ সালামকে সেই বৃহদাকার মাছটি উদ্গীরণ করেছিল দজলা নদীর তীরবর্তী যে স্থানে সে স্থানে একটি মসজিদ স্থাপিত হয়। আর এই মসজিদের অভ্যন্তরেই রয়েছে আল্লাহর নবী হযরত ইউনুস আলায়হিস্ সালামের মাযার শরীফ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন নবী। কয়েক হাজার বছর আগে লক্ষাধিক লোককে হিদায়াত দান করে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। জানা যায়, তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁর আব্বার বয়স ছিল সত্তর বছর। অতি শৈশবে তিনি পিতৃহারা হন। তাঁর অনেক মু’জিযা রয়েছে।

লেখক : পীরসাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ,

উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)

সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ