১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মোবাইলে ১৮০ মেও ॥ সৌর চার্জার ব্যবহার হলে বিদ্যুত বাঁচবে ২০০ মেগাওয়াট

মোবাইলে ১৮০ মেও ॥ সৌর চার্জার ব্যবহার হলে বিদ্যুত বাঁচবে ২০০ মেগাওয়াট
  • বাজারে ভাল মানের সোলার চার্জার পাওয়া যায় ;###;জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারের উদ্যোগ কর্তৃপক্ষের

রশিদ মামুন ॥ দেশে দৈনিক মোবাইল ফোন চার্জ দিতে ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। মানুষ আধুনিক স্মার্ট ফোনের দিকে ঝুঁকলে বিদ্যুতের ব্যবহার দিন দিন আরও বাড়বে। তবে বিকল্প হিসেবে সোলার মোবাইল চার্জার ব্যবহার করলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের সাশ্রয় করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে বর্তমানে সাত হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুত উৎপাদন হচ্ছে।

মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর হিসাবে দেখা যায়, দেশে এখন ১৩ কোটি সচল মোবাইল সিম রয়েছে। এর মধ্যে কমবেশি আট কোটি গ্রাহক প্রতিনিয়ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। দেশে সাধারণ মোবাইল সেটগুলোতে সাধারণত গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন ভোল্টের এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ মিলি এ্যাম্পায়ার ক্ষমতার ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে স্মার্ট ফোনের জন্য চার থেকে পাঁচ ভোল্টের দুই হাজার ৫০০ মিলি এ্যাম্পায়ার ক্ষমতার ব্যাটারি প্রয়োজন হয়। গড় হিসাব করলে একবার চার্জ দিতে সাধারণ ফোনে চার দশমিক পাঁচ ওয়াট বিদ্যুত প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে স্মার্ট ফোনে পাঁচ দশমিক পাঁচ ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে আট কোটি ফোন একবার চার্জ দিতে বিদ্যুত প্রয়োজন হয় ৩৬০ মেগাওয়াট। প্রতিটি ফোন গড়ে দুই দিনে একবার চার্জ দিলে ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুত মোবাইল ফোনের পেছনে খরচ হয়।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহা-ব্যবস্থাপক বিদ্যুত বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ জনকণ্ঠকে বলেন, মোটামুটি দৈনিক ১৮০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুত আমাদের মোবাইল ফোনের পেছনে ব্যবহার হয়। প্রত্যেক ব্যক্তি হিসেবে এই ব্যবহার খুব ক্ষুদ্র হলেও মোট হিসাবে এর পরিমাণ অনেক। প্রত্যেক ব্যক্তি যদি মোবাইল ফোন চার্জের ক্ষেত্রে সোলার ব্যবহার করে তাহলে দৈনিক বিপুল পরিমাণ বিদ্যুত বাঁচানো সম্ভব। তিনি বলেন, গ্রাহক যখন মোবাইল ফোন কিনবে তার সঙ্গে একটি সোলার চার্জার দিতে হবে। এতে করে গ্রাহক নিজেই সোলার দিয়ে মোবাইল চার্জ দিতে উদ্বুদ্ধ হবে। তিনি মনে করেন আমাদের হিসেব করতে হবে ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করতে কি পরিমাণ জ্বালানি এবং অর্থের প্রয়োজন হয় সেটি হিসাব করলেই সরকার এই উদ্যোগ নেবে।

মোবাইল ফোনের বিভিন্ন ব্যাটারির ক্ষমতায় দেখাগেছে, স্যামস্যাং গ্যালাক্সি ফেমিতে এক হাজার ৩০০ মিলি এ্যাম্পায়ার আওয়ারের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। স্যামস্যাং ম্যাট্রো ডোয়াসে ব্যবহার হয় এক হাজার মিলি এ্যাম্পায়ার আওয়ারের ব্যাটারি। এভাবে বাজারে বহুল প্রচলিত নোকায়ি-মাইক্রোসট এর ২২২ দ্বৈত সিমের মোবাইল ফোনে এক হাজার ১০০ মিলি এ্যাম্পায়ার আওয়ারের ব্যবহার হয়। এ ধরনের মোবাইল ফোন প্রতি ঘণ্টা টানা ব্যবহার করলে ৪ ওয়াট আওয়ার বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।

অন্যদিকে স্মার্ট ফোনের বেলায় এই বিদ্যুত ব্যবহারের পরিমাণ আরও বেশি। দেখা যায় বাজারে বহুল প্রচলিত সিমফোনির বিভিন্ন সেটে এক হাজার ৫০০ মিলি এ্যাম্পায়ার আওয়ারের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। যাতে প্রতিঘণ্টার জন্য বিদ্যুত ব্যবহার হয় পাঁচ দশমিক পাঁচ ওয়াট আওয়ার। আবার স্যামস্যাং-এর ব্যাটারি দুই হাজার ৫০০ মিলি এ্যাম্পার আওয়ারের এসব ফোন চালাতে আনুপাতিক হারে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হয়। তবে সীমিত জনগোষ্ঠী স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে। বর্তমানে তরুণরা স্মার্ট ফোনের দিকে ঝুঁকছে।

এক সময় মোবাইল ফোনে শুধু মাত্র কথা বলা যেত। এর কিছু দিন পরে এসে গান, খবর শোনার পাশাপাশি ছবিও তোলা যেত। এখন প্রায় সকল ফোনেই ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। মেইল, ফেসবুকিং, টুইটার ব্যবহার ছাড়াও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। চাইলেই ইউটিউব আর গুগলে গিয়ে নিজের বিনোদোনের ঝটপট ব্যবস্থাও হচ্ছে মোবাইল ফোনে। সঙ্গত কারণে স্মার্ট ফোনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। যা বিদ্যুতের দ্বিগুণ ব্যবহার বাড়াচ্ছে মোবাইল ফোনে।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে অধিকাংশ গ্রাহক সাধারণ ফোন ব্যবহার করেন। আর স্মার্ট ফোনের গ্রাহক সংখ্যা ৭০ লাখের মতো। সাধারণ ফোনে দুই বা আড়াই দিনে একবার চার্জ দিতে হয়। অন্যদিকে যেহেতু ব্যবহার বেশি তাই স্মার্ট ফোনে দিনে একবার অন্তত চার্জ দিতে হয়।

বাজারে দেখা গেছে সাধারণ সোলার মোবাইল চার্জারের সর্বোচ্চ দর ৩০০ টাকা। সাধারণত এ ধরনের চার্জার দিয়ে মোবাইল চার্জ দিতে তিন ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। সূর্যের আলো রয়েছে এমন স্থানে চার্জার রাখলেই ব্যাটারি চার্জ হয়। অন্যদিকে এখন এমন চার্জারও পাওয়া যাচ্ছে যা ব্যাগের মধ্যে রাখলেও মোবাইল চার্জ হতে থাকে। এ ধরনের চার্জারের দাম এক হাজার টাকার মধ্যে। তবে দেশে বিদ্যুত নেই এমন এলাকায় সোলার মোবাইল চার্জার ব্যবহার হলেও শহরে এর প্রচলন একেবারেই কম।

জানতে চাইলে সোলার গ্রিড এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বলরাম বাহাদুর বলেন, এখন দেশেই খুব ভালমানের সোলার মোবাইল চার্জার বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু এখনও গ্রাহক মোবাইল চার্জ দেয়ার জন্য সোলার ব্যবহারে উৎসাহী নয়। তিনি জানান, এ বিষয়ে বাধ্যতামূলক কিছু করা উচিত। তিনি বলেন, সোলার চার্জার ব্যবহার ব্যাটারির জন্য বেশ ভাল। সাধারণ চার্জার ব্যবহার করলে ব্যাটারি যে সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকে মোবাইলে সোলার চার্জার ব্যবহার করলে তার দ্বিগুণ সময় ভাল থাকে।

সরকার সাশ্রয়ী ব্যবহারের পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নিলেও মোবাইল ফোনে সোলার চার্জার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হয়নি। এখন সারাদেশে সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহার করে দৈনিক ২০০ মেগাওয়াটের কিছুটা বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুত পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে মোবাইল ফোনে চার্জ দিতে সোলার চার্জার ব্যবহার করলে একই পরিমাণ বিদ্যুত সাশ্রয় সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোলারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করা হলেও এখনও পর্যন্ত মোবাইল ফোনের চার্জার সোলারে রূপান্তরের কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। দেশের মোবাইল সেট বিক্রেতা কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে সোলার চার্জার দেয়ার নির্দেশনা দিলে নতুন মোবাইল ফোনের ক্রেতারা সোলার চার্জার পেয়ে যাবে। যেহেতু মোবাইল ফোনের সঙ্গে একটি চার্জার দেয়া হয় সেক্ষেত্রে বাড়তি খরচও পড়বে না চার্জারের জন্য। ঘরে একটি সোলার চার্জার থাকলে দৈনিক দুটি মোবাইলে চার্জ দেয়া যাবে।

সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম শিকদার জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা নতুন করে জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছি। এজন্য শীঘ্রই প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নিচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষ।