১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজনৈতিক দল বিকাশে দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন ॥ প্রধানমন্ত্রী

রাজনৈতিক দল বিকাশে দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন ॥ প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ‘দ্বৈত রাজনীতি’র কথা উল্লেখ করে বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে বিএনপি দ্বৈত রাজনীতি করে। একবার বলে বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন করবে না, আবার স্থানীয় সব নির্বাচনে অংশ নেয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো এখন থেকে দলীয়ভিত্তিতে নিজ নিজ মার্কা নিয়ে হবে। এবার দেখি বিএনপি নির্বাচনে না এসে কী করে, নির্বাচনে না এসে যায় কোথায়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বা না করা তাদের নিজস্ব দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে। নির্বাচনে না এলে বরং তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জিয়া-এরশাদের শাসনামলকে অবৈধ ঘোষণা করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদকে আর সাবেক রাষ্ট্রপতি বলা যায় না। সর্বোচ্চ আদালতই তাদের শাসনামলকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের সাবেক রাষ্ট্রপতি বললে বরং সর্বোচ্চ আদালতের রায়কেই অবমাননা করা হয়। জেনারেল জিয়া সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে নিজে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিল। এটাই সর্বোচ্চ আদালতে প্রমাণ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, আওয়ামী লীগ সংসদীয় বোর্ড এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় জরুরী বৈঠকে সভাপতির সূচনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মূলত আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়রপদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন কোন প্রক্রিয়ায় হবে, কার স্বাক্ষরে প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক পাবেন এবং নির্বাচনটির কৌশল নির্ধারণেই এ ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য রাখেনÑ দলটির সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন সংক্রান্ত বিষয়টি দলীয় গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত হয়।

সূচনা বক্তব্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতির কাছে আমাদের প্রদত্ত অঙ্গীকার। আমরা যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, তখন কেউ কেউ মায়াকান্না করছে। যেন দুঃখে তাদের প্রাণ ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু তারা স্বজন হারানোর ভয়ানক বেদনার কথা বোঝে না। আমরা নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। কথা বলে কিংবা দু’একটা হরতাল দিয়ে এ বিচার ঠেকানো যাবে না। পাপ যে বাপকেও ছাড়ে না- এ কথা প্রমাণ হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী দলীয়ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, উপমহাদেশের মধ্যে যে কয়টি বৃহৎ ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অন্যতম। আগে যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয়ভিত্তিতে হতো, তবে সব রাজনৈতিক দলই শক্তিশালী হতো। গণতন্ত্রও বিকশিত হতো। কারণ দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন হলে প্রার্থীরা নিজেদের স্বার্থের পরিবর্তে ভোটারের স্বার্থ আগে দেখে। এতে দেশের উন্নয়ন হয়, জনগণের কল্যাণ হয়।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী, বিকশিত এবং রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারে এ লক্ষ্য নিয়েই দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছি। আমরা গণতন্ত্রকে অধিক নিশ্চিত করতে চাই।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে যতগুলো রাজনৈতিক দল রয়েছে এবার সবার জন্যই একটা ভাল সুযোগ, তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে না এসে নির্বাচন বয়কটের নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, সারাদেশে সন্ত্রাস ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। কিন্তু দেশের জনগণ আমাদের সঙ্গে ছিল বলেই তারা নির্বাচনকে বানচাল করতে পারেনি। দেশের জনগণ সাহসিকতার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটের মাধ্যমে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জবাব দিয়েছে।

বিএনপি জন্মগত থেকেই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু গণতন্ত্রই নয়, দেশের স্বাধীনতাকেও বিশ্বাস করে না বিএনপি। আর দলটির জন্মও হয়েছিল হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। ‘কারাগারে এই প্রথম দু’জনকে একসঙ্গে ফাঁসি দেয়া হয়েছে’- একজন সাংবাদিকের এমন লেখার সমালোচনা করে তিনি বলেন, হয়ত উনি দেশের ইতিহাস জানেন না বা পড়েননি। জেনারেল জিয়ার আমলে ১৯টি ক্যু হয়েছে। আর প্রতিটি ক্যু’র পর একেকটা রাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন কারাগারে জোড়ায় জোড়ায় সেনাবাহিনীর অফিসার-সৈনিককে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জেনারেল জিয়া একদিনে এক থেকে দেড় শ’ মানুষকে প্রহসনের বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের অংশ অধিকাংশ সামরিক অফিসারকে এই জিয়া শেষ করে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ২১টা বছর ধরে একাত্তরের পরাজিত শক্তিদের ক্ষমতায় এনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করার চক্রান্ত চলেছে। স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না বলেই এরা ক্ষমতায় থেকে পরাজিত শত্রুদের পদলেহন করেছে, দেশকে ভিক্ষুকের জাতিতে পরিণত করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের মঙ্গলের জন্য রাজনীতি করে। আমরা ভিক্ষা নিয়ে চলব কেন? আমরা মর্যাদা দিয়ে চলব, আত্মনির্ভরশীল হব। এই আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ দেশের জনগণের মধ্যে জাগ্রত করতেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া থেকেও নিরাপদ দেশ। অথচ বাংলাদেশে খালেদা জিয়া জঙ্গীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল, অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশকে ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, সেই বাংলাদেশ আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি বলেন, স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করে না, তারা ক্ষমতায় থাকলে নিজেদের ভাগ্য গড়ে, দেশের মানুষের দিকে তাকায় না। আর আমরা ক্ষমতায় এসে জনগণের ভাগ্য গড়ি। কারণ আওয়ামী লীগ এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের মানুষ যখন একটু সুখে-শান্তিতে থাকে তখনই বিএনপি ও তাদের দোসররা ষড়যন্ত্র শুরু করে। এরা ৯২ দিন ধরে নির্বিচারে মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। কী বীভৎস ও বিকৃত মানসিকতা বিএনপি নেত্রীর। উনি মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে তার জীঘাংসা চরিতার্থ করেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, একজন মুসলমান কী আরেকজন মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা করতে পারে? অথচ খালেদা জিয়া নির্দেশ দিয়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সুইসাইড বোমা হামলা করে মানুষ হত্যার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইসলাম ধর্মে আত্মহত্যাই তো গুণার কাজ। একজন মুসলমান কিভাবে এমন গুণার কাজ করে। কিভাবে মসজিদে সুইসাইড বোমা হামলা করে মুসলমানদের হত্যা করে? এসব কর্মকা-ের মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলামের মর্যাদা ক্ষুণœ করা হচ্ছে। সারাবিশ্বে মুসলমানদের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তুলতেই এসব করা হচ্ছে। আমাদের দেশে এমন কোন কাজ কেউ যাতে করতে না পারে সেজন্য দেশবাসীকে সচেতন করতে আলেম-ওলামাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশে সন্ত্রাসী-জঙ্গী ও আইএস আছেÑ এ কথা বলার চেষ্টা করানো হচ্ছে। দু’জন বিদেশী হত্যা করেই কেউ কেউ রেডএলার্টের কথা বলে, কিন্তু আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে যখন বিদেশী হত্যা হয় তখন কী সেখানে রেডএলার্ট জারি করা হয়Ñ প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।