২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বন্দুকযুদ্ধে জেএমবি কমান্ডার নিহত, ৫ জঙ্গী রিমান্ডে

  • আইএস
  • আল কায়েদার নামে সাম্প্রতিক সব বোমাবাজি হত্যাকা-ের এরাই হোতা, পুলিশী অভিযানে ধৃত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বুধবার রাতে ডিবি পুলিশের অভিযানে হোসেনী দালানে বোমা হামলা করে ২ জনকে হত্যা, শতাধিক জনকে আহত করা এবং আশুলিয়ায় চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িত জেএমবির সামরিক শাখার কমান্ডার হোজ্জা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে জেএমবির ৫ সদস্য। গ্রেফতারকৃতরা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এ দুটি ঘটনা ছাড়াও বহু চাঞ্চল্যকর ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।

এসব চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটিয়ে দেশে আইএস বা আল কায়েদার তৎপরতা থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে এমন তথ্যই জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

গ্রেফতারকৃত ৫ জন এবং নিহত হোজ্জা জেএমবির একটি বিশেষ গ্রুপের সদস্য। এই গ্রুপটির নেতৃত্বেই পরিকল্পিতভাবে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হোসেনী দালানে বোমা হামলা, আশুলিয়া ও গাবতলীতে চেকপোস্টে দুই পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা, পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা, আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতিকালে ৭ জনের মৃত্যু ও ত্রিশালে পুলিশ হত্যা করে তিন জঙ্গী ছিনতাইসহ অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।

বুধবার রাতে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঢাকার মিরপুর থেকে চাঁন মিয়া, টঙ্গীর আব্দুল্লাহপুর থেকে ওমর ফারুক ওরফে মানিক ও মোঃ শাহ জালালকে, গুলিস্তান থেকে হাফেজ ক্বারী আহসান উল্লাহ মাহমুদ এবং কামরাঙ্গীরচর থেকে কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিককে গ্রেফতার করে।

বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃতরা জেএমবির সক্রিয় সদস্য। তাদের তথ্যমতে বুধবার গভীর রাতে ডিবি পুলিশ রাজধানীর দারুস সালাম থানাধীন দ্বীপনগর বালুর মাঠ এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানকালে জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান আলবানী ওরফে হোজ্জা ভাই ওরফে মেম্বার ভাই ওরফে শাহাদত ওরফে মাহফুজ ডিবি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আহত হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হোজ্জার মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১২ রাউন্ড গুলি, একটি চাকু ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়।

মনিরুল ইসলাম বলেন, উদ্ধারকৃত মোটরসাইকেলটি দিয়েই হোজ্জাসহ ৩ হামলাকারী চলতি বছরের ৪ নবেম্বর সকালে সাভারের আশুলিয়ার নন্দনপার্কের সামনে পুলিশ চেকপোস্টে ফিল্মি স্টাইলে হামলা করে শিল্প পুলিশের কনস্টেবল মুকুল হোসেনকে হত্যা এবং আরেক পুলিশকে আহত করে। হামলার সময় নিহত হোজ্জা নিজেই মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল। হোজ্জা গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাটের বাড়িতে বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে গলা কেটে হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়। সে খিজির খানের হাত পা বেঁধে অজুখানায় নিয়ে জবাইয়ে সহযোগিতা করে। জেএমবির এ গ্রুপটিরই সদস্য ডিবির হাতে ইতোপূর্বে গ্রেফতারকৃত তারেক খিজির খানকে জবাই করে।

মনিরুল ইসলাম আরও জানান, জেএমবির এই গ্রুপটির এক সদস্য বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি কামাল হোসেন ওরফে প্রকাশ চলতি বছরের ২২ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীর আমিনবাজারে চেকপোস্টে তল্লাশিকালে ছুরিকাঘাতে দারুস সালাম থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এসএসআই) ইব্রাহিম মোল্লাকে হত্যা করে। ঘটনার পর পালানোর সময় গ্রেফতার হয় বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাথী মাসুদ রানা। হাতেনাতে গ্রেফতারের পর পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যাকারী কামাল বলে নিশ্চিত করে মাসুদ রানা। তার দেয়া তথ্যমতে ওই রাতেই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে পাঁচটি হ্যান্ডগ্রেনেডসহ জামায়াত কর্মী আব্দুল আজিজ মিয়া ও তার দুই ছেলে ছাত্র শিবির কর্মী ফজলে রাব্বী ও রাকিব হাসান গ্রেফতার হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা ইব্রাহিম মোল্লাকে হত্যার পরদিনই ২৩ অক্টোবর পুরনো ঢাকার হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা চালিয়ে ২ জনকে হত্যা এবং শতাধিক জনকে আহত করার ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয় হ্যান্ডগ্রেনেড। যা মাসুদ রানার তথ্য মোতাবেক কামরাঙ্গীরচর থেকে উদ্ধারকৃত গ্রেনেডের সঙ্গে বহুবহু মিল রয়েছে।

মনিরুল ইসলাম মাসুদ রানার দেয়া জবানবন্দীর বরাত দিয়ে জানান, হোসেনী দালানে বোমা হামলায় মূলত ৫ জন অংশ নেয়। এর মধ্যে নিহত হোজ্জা ছিল অন্যতম। একজন বোমা ছুড়ে মারে। বাকি ৪ জন চারদিকে নজর রাখে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রাশেদ বোমা হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল। গ্রেফতারকৃত অপর ৪ জন বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। এর মধ্যে ক্বারি মাহমুদ টাকা দিয়ে সহায়তা করে। আর অন্যরা বিস্ফোরক যোগাড়, বাসা ভাড়া নেয়াসহ অন্য কাজগুলো করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চাঁন মিয়া মূলত চালক। সে গাড়ি দিয়ে জেএমবি সদস্যদের বিভিন্ন জায়গায় আনা নেয়া করত। পাশাপাশি অপারেশনেও অংশ নিত।

চাঁন মিয়া গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ হত্যা করে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাসেল (৩৫), সালাউদ্দিন সালেহীন (৩৮) ও যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত বোমারু মিজানকে (৩৫) ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্গে জড়িত। যে গাড়িগুলো দিয়ে ব্যারিকেড দেয়া হয়েছিল, তারই একটি গাড়ির চালক ছিল চান মিয়া। পরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় রাকিব হাসান।

মনিরুল ইসলাম আরও জানান, নিহত হোজ্জা ও গ্রেফতারকৃত পাঁচজন জেএমবির একটি বিশেষ গ্রুপের সদস্য। এ গ্রুপটি পীর, বিদেশী, ধর্মযাজক ও পুলিশদের হত্যা করা সওয়াবের কাজ বলে মনে করে। গ্রুপটি শিয়াবিরোধী। তারা শিয়াদের সব কাজকেই ঘৃণা এবং পাপ কাজ বলে মনে করে থাকে। এ গ্রুপটির সদস্যরাই পাবনার ঈশ্বরদীতে ধর্মযাজক ফাদার লুক সরকারকে হত্যাচেষ্টা, চট্টগ্রামে একটি মাজারে দুই খাদেমকে হত্যা করে। পাশাপাশি তারা বিদেশীদের হত্যা সমর্থন করে। গ্রুপটি ছিনতাই, ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। তারা এসব অপরাধ করে দলীয় ফান্ডে অর্থের যোগান দিয়ে থাকে।

চলতি বছরের ২১ এপ্রিল দুপুরে সাভারের আশুলিয়ার জামগড়ায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া বাজার শাখায় বোমা মেরে, গুলি চালিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক, নিরাপত্তারক্ষীসহ ৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায়ও জড়িত ছিল নিহত হোজ্জা। মানিকগঞ্জে একটি বড় ধরনের ডাকাতির সঙ্গেও নিহত হোজ্জাসহ গ্রেফতারকৃতদের অনেকেই জড়িত। গ্রেফতারকৃতরা মূলত দেশে চরম নাশকতা চালিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছিল।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ২৪ মে রাজধানীর কদমতলী থেকে জেএমবির আমির জামায়াতে ইসলামীর সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি মওলানা সাইদুর রহমান জাফর গ্রেফতার হয়। এরপর থেকেই জেএমবি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি গ্রুপের সামরিক শাখার প্রধান ছিল নিহত হোজ্জা। গ্রেফতারকৃতরা সবাই এক সময় ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। গ্রেফতারকৃত ও নিহতরা মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত বলে প্রাথমিকভাব জানা গেছে। সংবাদ সম্মেলনে ডিবির উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম ও মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম, মাহবুব আলম, মাশরুকুর রহমান খালেদ, সাজ্জাদুর রহমান ও মুনতাসিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচিত সংবাদ