২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পৌর নির্বাচনে একক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা ইতিবাচক

  • বিশেষজ্ঞরা বলছেন এতে বাণিজ্যের সম্ভাবনা থাকে না ॥ ভিন্ন মত বিএনপির

শাহীন রহমান ॥ পৌরসভা নির্বাচনে দলের পক্ষে একজনমাত্র প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিলের বিধানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, দলের পক্ষে তো একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। সেক্ষেত্রে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দিলে দলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। চূড়ান্ত মনোনয়ন পেতেও দলের মধ্যে শুরু হয়ে যায় প্রতিযোগিতা। ফলে এটাকে ব্যবহার করে মনোনয়ন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু একক প্রার্থী আগ থেকে চূড়ান্ত করা হলে মনোনয়ন বাণিজ্যের কোন সম্ভাবনা থাকে না।

তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১শ’ জন ভোটারের সমর্থন যুক্ত স্বাক্ষর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমাদানের নির্দেশকে ইসির অন্যায় কাজ হিসেবে দেখছেন তারা। তারা মনে করেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার একজন প্রার্থীর গণতান্ত্রিক অধিকার। এক্ষেত্রে শর্তজুড়ে দেয়ার বিধান অন্যায়। এছাড়া কোন প্রার্থীর পক্ষে স্বাক্ষর দিলে অনেক সময় ওই ভোটার ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়তে পারেন। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইসির উচিত হবে প্রার্থীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের এ বিধান বাতিল করা। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে দলের পক্ষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করে মনোনয়পত্র দাখিলের বিধান ইতিবাচক। তবে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১শ’ জন ভোটারের সমর্থনযুক্ত স্বাক্ষরের বিধান বাতিল করার আহ্বান জানান।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী দলের পক্ষে একজন মাত্র প্রার্থীই মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। একাধিক প্রার্থী কোন দলের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিলে বিধান অনুযায়ী সে দলের সব প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসির বিধান অনুযায়ী দলের পক্ষে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে মনোনয়পত্র প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত সুযোগ থাকলেও এ বিধানের ফলে পৌরসভা নির্বাচনে এ সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে দলগুলো মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। ফলে যারা দল থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হচ্ছেন তারা এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন। তবে তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই আগে মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে না থাকলে ১শ’ জন ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত অনুলিপি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।

তবে নির্বাচন কমিশনের এ বিধান আওয়ামী লীগ স্বাগত জানালেও ইতোমধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি পক্ষ থেকে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ইসির এ বিধানের ফলে তাদের দলের প্রার্থীরা প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে দল থেকে একজন প্রার্থীর মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হলে বাছাইয়ে ষড়যন্ত্র করে বাদ দেয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থী থাকলে একজনকে বাদ দিলে অন্যজনকে সমর্থন দিতে পারবে। কিন্তু একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান থাকলে সে সুযোগ হারাতে হবে।

পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও এ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে বুধবার সিনিয়র নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন দলের চেয়ারপার্সন। জানা গেছে, কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়েছে। দলের মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিএনপির কোন আস্থা নেই। তবে শর্ত সাপেক্ষে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেছেন দলের পক্ষে একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমাদান পক্ষপাতদুষ্ট ইসি এটাকে বিরোধী জোটের প্রার্থীকে বাদ দেয়ার হাতিয়ার করতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান দলীয় প্রতীকে প্রথম পৌর ভোটে সংসদ নির্বাচনের মতোই সুযোগ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পৌর নির্বাচনে দলের পক্ষে একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমাদানের বিধানের কারণে ভোটে থাকা নিয়ে শঙ্কা বেড়ে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রার্থী একজন থাকবে এটা ঠিক। কিন্তু বাছাইয়ের পর এ সুযোগ রাখলে ভাল হবে।

অপরদিকে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হানিফ বলেছেন, চূড়ান্তভাবে তো একজনই মনোনয়ন পাবেন। সংসদের মতো না হলেও পৌর নির্বাচনে আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে দলের। এটা আরও ভাল হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও একক প্রার্থী মনোনয়নকে ভাল উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, দল তো একজনকেই চূড়ান্ত করবে। এখন সময় বেশি না নিয়ে আগেই চূড়ান্ত করতে হবে উল্লেখ করেন।

গত মঙ্গলবার সারাদেশে ২৩৪টি পৌরসভা নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। পরে ইসির পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে একই তারিখে আর দুটি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। দেশে এবারই প্রথম পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। নতুন এ বিধান অনুযায়ী দল থেকে মেয়র পদে প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে। দলীয় চূড়ান্ত প্রার্থীর অধীনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত প্রতীক এ নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল প্রতীকে প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে আদালতের আদেশে জামায়াতের রাজনীতি অবৈধ ঘোষণা করায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াতের পক্ষে কোন প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

ইসি জানিয়েছে দলীয় ভিত্তিতে এ নির্বাচনের জন্য দলগুলোকে মনোনয়নপত্র জমাদানের জন্য আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে। মনোনয়পত্রের সঙ্গে দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদককে একটি চিঠিও রিটার্নিং অফিসারের নিকট জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য হবে না।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মনোনয়নপত্র জমাদানের জন্য রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রার্থিতার সপক্ষে ১শ’ জন ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দিতে হবে। একজন প্রার্থী শুধুমাত্র একটি পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেন। একাধিক পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করলে সব মনোনয়নপত্র বাতিল হবে। তবে একই পদে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারবেন। এক্ষেত্রে জামানতের টাকা শুধু একটি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিলেই হবে।

রাজনৈতিক দলের মেয়র প্রার্থীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের পদাধিকারী বা তাদের নিকট হতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষরিত এই মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে যে, উক্ত প্রার্থীকে উক্ত দল হতে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। কোন রাজনৈতিক দল কোন পৌরসভায় একাধিক ব্যক্তিকে মেয়র পদে মনোনয়ন প্রদান করতে পারবে না। একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভায় উক্ত দলের সকল প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম, পদবী, নমুনা স্বাক্ষরসহ একটি পত্র নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ৫ (পাঁচ) দিনের মধ্যে রিটার্নিং অফিসারের নিকট এবং উক্ত পত্রের একটি অনুলিপি নির্বাচন কমিশনেও প্রেরণ করতে হবে।

কোন ভোটার প্রস্তাবকারী হিসেবে অথবা সমর্থনকারী হিসেবে মেয়র অথবা সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর বা সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের উদ্দেশে সংশ্লিষ্ট পদে একটির অধিক মনোনয়নপত্রে তার নাম ব্যবহার করবেন না। যদি কোন ভোটার একই পদে অনুরূপ একাধিক মনোনয়নপত্রে তার নাম ব্যবহার করেন তা হলে সকল মনোনয়পত্র বাতিল বলে গণ্য হবে।

জামানত ॥ মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে, প্রতিটি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে, অনধিক ২৫ হাজার ভোটার সম্বলিত নির্বাচনী এলাকার জন্য ১৫ হাজার টাকা, ২৫ (পঁচিশ) হাজার এক হতে ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার ভোটার সম্বলিত নির্বাচনী এলাকার জন্য ২০ হাজার টাকা, ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার এক হতে এক লাখ ভোটার সংবলিত নির্বাচনী এলাকার জন্য ২৫ (পঁচিশ) হাজার টাকা এবং এক লাখ বা তদূর্ধ ভোটার সংবলিত নির্বাচনী এলাকার জন্য ৩০ হাজার টাকা জমাদানের প্রমাণ স্বরূপ ট্রেজারি চালান বা কোন তফসিলী ব্যাংকের পে-অর্ডার বা পোস্টাল অর্ডার জমা জমা দিতে হবে। কাউন্সিলর (সাধারণ ও সংরক্ষিত) নির্বাচনের ক্ষেত্রে, প্রতিটি মনোনয়পত্রের সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জমাদনের প্রমাণ স্বরূপ ট্রেজারি চালান বা কোন তফসিলী ব্যাংকের পে-অর্ডার বা পোস্টাল অর্ডার জমা দিতে হবে।

এ ছাড়াও আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিতে প্রার্থীদের হলফনামাসহ বিভিন্ন কাগজপত্রের সঙ্গে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদের অনুলিপিও জমা দিতে হবে। হলফনামায় প্রার্থীর সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত সনদপত্র সংযুক্ত করতে হবে। নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ করার জন্য সম্ভাব্য অর্থ প্রাপ্তির উৎস/উৎসসমূহ ও সম্ভাব্য ব্যয়ের বিবরণী জমা দিতে হবে বলে ইসির এক প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মেয়ররা স্বপদে থেকেও ভোট করতে পারবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভোটে দাঁড়াতে বাধা নেই। সরকারী চাকরি থেকে অবসর নিয়েও প্রার্থী হওয়া যাবে। এদিকে যেসব প্রার্থী তফসিল ঘোষণার আগে আগাম প্রচারে নেমেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে আজ থেকে অভিযানে নামছে ইসি। ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তফসিল ঘোষণার পর আগাম প্রচারের সব পোস্টার বিলবোর্ড সরিয়ে নিতে বেঁধে দেয়া ৪৮ ঘণ্টার মেয়াদ শেষ হয়েছে। যারা এখানও নিজস্ব উদ্যোগে এসব পোস্টার বিলবের্ড সরিয়ে নেয়নি তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অভিযান পরিচালনা করা হবে।