১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চলমান সন্ত্রাস ॥ সংস্কৃতিতে প্রভাব

  • মৌমিতা জান্নাত

বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নানা দিক থেকে ঐতিহ্যমণ্ডিত একটি সুন্দর দেশ। শুধু প্রাচীন ঐতিহ্যের দিক থেকে নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভরা এ দেশ বিশ্ববাসীর কাছে আকর্ষণীয় ও মনোরম। এর মধ্যে হাজার বছরের সংস্কৃতি তো আছেই, আছে নানা ধর্ম-বর্ণের বিচিত্রতা এবং সেই সঙ্গে আছে নানা ধর্ম-গোত্রের মিলন এবং সামাজিক সম্প্রীতিও। এটি বাংলাদেশের একটি বড় ধরনের ঐতিহ্য। তবে হালআমলে সেই চিরায়ত দৃশ্যটি যেন অনেকখানি পাল্টে গেছে। বেড়ে গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। তবে একই সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ নির্মূল এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাঙালী সংস্কৃতিকে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য এটিকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এজন্য বাঙালী সংস্কৃতির অব্যাহত বিকাশকে বাধামুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এতে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শুদ্ধভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। দেশজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সমকালীন শিল্প ও সাহিত্য সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে জাতির মানসিক বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এছাড়া এসব বিষয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন বিভিন্ন অধিদফতর, দফতর ও সংস্থাসমূহের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মুক্তবুদ্ধিচর্চাকারী, বিজ্ঞান-চেতনার ব্লগার-প্রকাশক হত্যা, বিদেশী নাগরিক, ইসলামী চিন্তাবিদ, খ্রিস্টান ধর্মযাজকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা হচ্ছে একের পর এক। তথাকথিক ধর্মের নামে পরিচালিত এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খুব শিগগিরই বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতামুক্ত হচ্ছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। মুক্তমনা লেখকদের টার্গেট করে হত্যার মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকার আলামতই পাওয়া যাচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের যোগসূত্র আছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। অনেকের মতে, বাংলাদেশে যারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, তাদের অপতৎপরতা কমাতে হলে শক্তিশালী সিভিল সোসাইটির সহায়তায় উদারপন্থী একটি সেক্যুলার রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে হবে। না হলে দেশের সাংস্কৃতিক বলয় পুরোমাত্রায় ধসে পড়বে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর এক কলামে লিখেন, ‘আমার মনে হয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের শিক্ষিত ও আধুনিকমনা সমাজ-মানসেও এক বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে। বামপন্থীরা ডানপন্থী হয়েছেন, ডানপন্থীরা আরও কট্টর রক্ষণশীল হয়েছেন। ধর্মীয় উদারতা, সহিষ্ণুতা ব্যাপকভাবে লোপ পেয়েছে এবং তার স্থান দখল করেছে ধর্মীয় সংকীর্ণতা, ধর্মান্ধতা এবং প্রচণ্ড অসহিষ্ণুতা। ফলে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা সমাজ জীবনে গতি ও শক্তি হারাচ্ছে। যে আধুনিক সমাজ-শক্তি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই শক্তি এখন আরও ভয়াবহ ধর্মান্ধতার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনিচ্ছুক। বর্তমান সন্ত্রাসীরাও সমাজের বাইরের কোন লোক নয়। কিন্তু সমাজ তাদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনেকটাই যেন অনাগ্রহী। দুষ্কৃতকারীরা তাই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন আশ্রয় পাচ্ছে সমাজের ভেতরেই। আইনের হাত যেখানে সহজে পৌঁছাতে পারে না।’

সেই কলামে তিনি আরও লিখেন, ‘পাকিস্তান ছিল ধর্মীয় কাঠামোর রাষ্ট্র। কিন্তু সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থাতেও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ঘাতকের মূর্তি ধারণ করতে পারেনি। পাকিস্তান আমলেরও আগে লেখা আবুল মনসুর আহমদের ‘হুজুর কেবলার’ মতো গল্প বা পরবর্তীকালে আরজ আলী মাতুব্বরের ধর্মবিষয়ক লেখা ও দর্শন শিক্ষিত বাঙালী মুসলিম সমাজ গ্রহণ করেছে। তাদের দেশত্যাগ করতে হয়নি। অথবা ধর্মান্ধ জঙ্গীদের চাপাতির আঘাতে নির্মম মৃত্যুবরণ করতে হয়নি।’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাস দমনের জন্য কেউ কেউ জনপ্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা ভাবেন। এটা সত্য, কেবল পুলিশ দ্বারা সরকার এই সন্ত্রাস দমন করতে পারবে না। এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জনমত এবং জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই সন্ত্রাসীদের জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিন্তু তা করা সম্ভব হবে না, যতদিন পর্যন্ত এই জনসমাজের একটা বড় এবং প্রভাবশালী অংশের মধ্য থেকে সন্ত্রাসীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সহানুভূতির ভাব দূর করে প্রচণ্ড ঘৃণার ভাব তৈরি করা না যাবে।’

এদিকে চলমান সন্ত্রাস ও নাশকতা নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে দুই পুলিশ সদস্য ও বিদেশী নাগরিককে খুন, তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে বোমা হামলা, প্রকাশক-ব্লগারদের ওপর হামলাসহ কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখানে এক ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েই আছে। যারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত তারা এখান থেকে এসেন্সটা গ্রহণ করতে পারে। হয়ত বাংলাদেশে সরাসরি আইএসের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নেই। তবে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ইতোমধ্যে লবিস্ট নিয়োগের বিষয়টি আমরা দেখেছি। কাজেই লবিস্টের মাধ্যমে কোন সন্ত্রাসী হামলা চালানো হবে না, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। দেশের বাইরে থেকে এ ধরনের কোন গোষ্ঠী যাতে ঢুকে পড়তে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। রাজনৈতিকভাবে একটা কমিটমেন্টের জায়গা তৈরি করতে হবে। তাহলেই কেবল এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে আমরা জানতে পারি, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান, ভারত ও নেপালের কয়েকটি জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন উগ্রপন্থী ও নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনের সদস্যদের যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা টেলিফোন, ইমেইল ও ভাইবারে জঙ্গীবাদ সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদান করছে। প্রশিক্ষণ, অর্থায়নসহ আরও নানা বিষয়ে এক সংগঠন আরেক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ফ্রান্সের ঘটনায় বাংলাদেশেও একই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালাতে জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো অনুপ্রাণিত হতে পারে। এ ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুবই জরুরী। বাংলাদেশে যে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সন্ত্রাসমূলক ঘটনা সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। তবে ঝুঁকি মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতাও বেড়েছে।’

বিষয়টিকে এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বিশ্লেষণ করেন এভাবেÑ ‘বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র প্রমাণে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশী-বিদেশী চক্র। বিভিন্ন জঙ্গী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে তারা নতুন করে সক্রিয় করে তুলতে ইন্ধন দিচ্ছে। পাশাপাশি অর্থায়নও করছে। যে কারণে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জেএমবি ও অন্যান্য জঙ্গী সংগঠন গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা যায় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের খবরে। সেই সূত্রে আমরা আরও জানতে পারি, বাংলাদেশ ঘিরে ভিনদেশী জঙ্গীরা গোপনে গভীর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- চালিয়ে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের গায়ে জঙ্গী রাষ্ট্রের তকমা লাগানো। এজন্য দেশী-বিদেশী গোষ্ঠী জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা তারই অংশ বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীÑ যা খুবই শঙ্কার বিষয়।’ তাঁর মতে, ‘চলমান নাশকতা আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ, যেই গোষ্ঠী এ ধরনের কর্মকা- পরিচালনা করছে, তারা তো বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে না।’

অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘আমি বার বার বলেছি, বলছি, দরকার হলেই বলে যাচ্ছি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ একটা মৃত্যু-উপত্যকায় পরিণত হতে যাচ্ছে। এখানে কেউ নিরাপদ নয়Ñ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে একটি গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এখানে বিদেশী নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে। যেন এই দেশে এলেই তাদের মরতে হবে। এটা খুবই মারাত্মক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের পুঁজি-বিনিয়োগে। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগে ভাটা পড়তে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করি, তাদের আজ বাকরুদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে। তবে এটা বেশিদিন চলা সম্ভব নয়। এটা করা সম্ভব হয়নিÑ হবেও না। এই সঙ্কট মুহূর্ত থেকে আমরা মুক্ত হবই। এত কিছুর মধ্যে কিছুদিন আগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী ঢাকা লিট ফ্যাস্টিভাল অনুষ্ঠিত হলো। বিভিন্ন দেশ থেকে লেখক-প্রকাশকরা এলেন। সুষ্ঠুভাবেই সব কিছুই সম্পন্ন হলো।’ তবে সামনে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মৌলবাদীরা তো এ ধরনের আয়োজনের বিরোধী। তারা এ ধরনের আয়োজনকে ধ্বংস করতে চায়।’

তাঁর মতে, ‘ধর্মীয় মৌলবাদী ও জঙ্গীবাদী শক্তির অপতৎপরতা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, যা শান্তিকামী মানুষের জন্য অস্বস্তিদায়ক। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের সবাইকে সমস্বরে জেগে উঠতে হবে। যুদ্ধের বিকল্প আছে কিন্তু শান্তির কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশ একটি শান্তির দেশ। এই দেশে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই।’

কবি মোহাম্মদ রফিকের মতে, ‘যেহেতু বিষয়টি রাজনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থ জড়িত, প্রশাসন দিয়ে বা দু-চারজন যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকর করেও এর সুফল পাওয়া যাবে না। যে বাস্তবতার সম্মুখীন আমরা হয়েছি, এ জন্য জাতীয় ঐক্য ও সংহতিভিত্তিক ঐক্য গড়ে স্বাধীনতার শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। জাতীয় ঐক্য তাই আজ বড়ই প্রয়োজন।’ সন্ত্রাস ও সাংস্কৃতিক প্রভাব সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হলো, ‘সংস্কৃতি কোন অনড় বিষয় নয়; এটা মানব সভ্যতার ইতিহাস এবং বিকাশধারার দিকে লক্ষ রাখলেই ভালভাবে বোঝা যায়। যদি সেটাই হতো তাহলে মানুষ তার আর্থ-রাজনৈতিক বিকাশের প্রাথমিক স্তরেই এখনও থেকে যেত, তার কোন উত্তরণ ঘটত না। তাই একে রুদ্ধ করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। সাময়িক বিঘিœত হতে পারে মাত্র। তবে সে তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যাবে।’

চলমান সন্ত্রাসী কর্মকা-কে বিশ্লেষণ করে প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা শুরু হয়েছে দুই দশক আগে, যখন মার্কিনীরা তালেবান তৈরি করল। তারা সেখানে তালেবানকে দিয়ে আফগানিস্তান দখল করল। কিন্তু তালেবানরাই একসময় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দেখা দিল। তারা টুইন টাওয়ার ধ্বংস করল। এর পেছনে কারণ হলো, মার্কিনীরা সবসময় চায় কর্তৃত্ব বজায় রাখতে, মানুষকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে। তবে একসময় মানুষ প্রত্যাখ্যান করবেই, এটাই স্বাভাবিক। সেই মাশুল মার্কিনীদের দিতে হয়েছে। এখন তারা আইএস সৃষ্টি করেছে। তাদের নিষ্ঠুর-নির্মম কর্মকা- আমরা দেখছি প্রতিনিয়ত। তবে এর ফলও ভাল হবে না।’

তিনি বলেন, ইরাক এক সময় মার্কিনীদের বন্ধু ছিল, সাদ্দাম হোসেন ছিল তাদের মিত্র। কিন্তু যেই তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে আঘাত লাগল, তখন ‘সাদ্দামের কাছে ভয়াবহ অস্ত্র আছে’ বলে যুদ্ধ ঘোষণা করল। পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। মার্কিনীরা এখন ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশ ধ্বংস করে দিয়েছে। কারণ মার্কিনীরা সবসময়ই বিশ্বে অস্থিরতা চায়। এতে করে তারা লাভবান হয়। এর ফলে তারা তাদের অস্ত্র বিক্রি করতে পারে।’

তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশে ইসলাম এসেছে সুফীবাদের হাত ধরে। এখানে দরবেশ-আউলিয়ারা মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার কথা বলেছেন। সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে কথা বলেছেন। নানা মত, নানা পথ, নানা চিন্তা-চেতনার এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটে বাংলার ভূমিতে। এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন ঠাঁই নেই। বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওইয়া, বাউল সঙ্গীত। তবে আশির দশকে সারা বিশ্বে যখন সাম্রাজ্যবাদীদের উত্থান ঘটে, তখন তার প্রভাব বাংলার মাটিতেও এসে লাগে। জামায়াতে ইসলামীর মতো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির পুনর্জন্ম হয় বাংলাদেশে। তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে বিএনপি তাদের পুনর্বাসন করে।’

ইতিহাসের সূত্র উল্লেখ করে অনুপম সেন আরও বলেন, ‘পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন রাতারাতি পাল্টে যায়। ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি উঠে যায় সংবিধান থেকে। যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেনÑ ‘আমি শোষিতের গণতন্ত্র চাই, শোষকের নয়’, সেই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয় তৎকালীন শাসকরা। এর পেছনে ইন্ধন যোগায় সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী। তাদের আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে এটাকে জিইয়ে রাখে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে পুরোমাত্রায়।’

তিনি মনে করেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিক্রিয়াকে লঘুভাবে দেখা উচিত নয়। বরং এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নিজের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সরকারকে এর জন্য সচেষ্ট হতে হবে, দেশের আপামর জনগণকে তাদের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

তাঁর মতে, ‘চলমান এই সন্ত্রাস থেকে দেশকে এবং রাজনীতিকে মুক্ত করা না গেলে কোন অর্থনৈতিক উন্নতিই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তার ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, ধর্ম, ভাষা, স্থানিক পুরাতন ঐতিহ্য প্রভৃতির প্রভাব তার ওপর বিস্তার করে। কিন্তু এগুলো কোন নির্ধারক প্রভাব নয়, আচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি মূলত নির্ধারিত হয় সেই দেশের বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরন, পরস্পরের প্রতি আচরণ প্রভৃতির ভিত্তিতে। সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আবার নির্ভর করে সেই সমাজে বিদ্যমান উৎপাদন-সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক কার্যাবলী অর্থাৎ উৎপাদন-বিনিময়-ভোগ-বণ্টন ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া জারি আছে তার ওপর। এই কথা থেকে যেটা বেরিয়ে আসে তা হলো, রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতিরই ঘনীভূত রূপ। এ কারণেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীন রাষ্ট্রে যে ধরনের রাজনৈতিক অবস্থা দেখা যায়, সামন্তবাদী ব্যবস্থায় সেটা সেভাবে ছিল না। আবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিও দেখা দেবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে ভিন্নরূপে।’

বাংলা ও বাঙালী সংস্কৃতির প্রথম ধাপের সূচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয়তাবাদী চেতনা দাঁড় করাতে হলে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রয়োজন। কিন্তু আজকে মৌলবাদীরা সাংস্কৃতিক জগতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টিকে এভাবেই বিশ্লেষণ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম। ইতিহাসের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ত্রিশ লাখ শহীদ আর লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে উদার গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, সেই মাটিতে ধর্মীয় জঙ্গীবাদের উদ্ভব হতে পারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের আগে কেউ ভাবতেও পারেনি। বিশেষভাবে ২০০৫ সালে আত্মঘাতী ধর্মীয় জঙ্গীবাদের ভয়ঙ্কর উত্থানে উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সারা দেশের মানুষ। সাম্প্রদায়িকতাকে আশ্রয় করেই মৌলবাদ বেড়ে ওঠে। পঁচাত্তর পরবর্তী শাসকরা অবৈধ ক্ষমতা দখল আরও দৃঢ়করণে মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাক নামকাওয়াস্তে শাসক হলেও ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ছিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর একটি লেখা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘জিয়া ঘটনাচক্রে, বিশেষ পরিস্থিতিতে, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কখনই মনে প্রাণে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে আস্থাবান ছিলেন না, বরং তিনি সুস্পষ্টভাবেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধ শক্তি। তাঁর আমলেই মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা দ্রুত প্রসার লাভ করে।’

অধ্যাপক সেলিমের মতে, ‘জিয়া তার বিশ্বাস থেকেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অর্গল খুলে দিয়েছিলেন ১৯৭৬ সালে মে মাসে সামরিক ফরমান জারি করে। এরপর জেনারেল এরশাদও ক্ষমতা দখল করে তার পূর্বসূরির পথ অনুসরণ করলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার মতো নোংরা আর ন্যক্কারজনকভাবে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার কেউ করেনি। এরশাদ বলেছিলেন, ‘ধর্ম হিসেবে ইসলাম থাকবে সকলের শীর্ষে। বাংলাদেশ মুসলমানদের দেশÑ এবারের সংগ্রাম দেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার সংগ্রাম। এরপর খালেদা জিয়াকেও নির্ভর করতে হয়েছে মৌলবাদী রাজনীতির ওপর। বিশেষভাবে ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সরকার গঠন করে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গীবাদের বিকাশের সুযোগ করে দিলেন। ১৯৯৯ সালে ১৮ জানুয়ারি কবি শামসুর রাহমানকে হত্যা প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে হরকাত-উল-জিহাদ জঙ্গী তৎপরতার প্রকাশ ঘটায়। ‘আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান’Ñ এই সেøাগান দিয়ে জঙ্গী সংগঠনগুলোর মোর্চা ইসলামী ঐক্য জোট ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে জনসভায় ঘোষণা করেÑ কবি শামসুর রাহমান, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ও এনজিও নেতা ড. কাজী ফারুক আহমদকে হত্যা করে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেবে।’

তিনি মনে করেন, ‘অর্থ ও অস্ত্র ছাড়া জঙ্গী তৎপরতা সম্ভব না। তাই এটি স্থানীয় বিষয় নয়, শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অত্যন্ত পরিকল্পিত উপায়ে পরিচালিত হয়। জঙ্গী তৎপরতায় অর্থের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। এছাড়া ইসলামী এনজিওগুলো পশ্চিমা সাহায্যও পেয়ে থাকে। তবে জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব অর্থনৈতিক সংস্থা থেকে বিপুল মুনাফা পেয়ে থাকে। জামায়াত এই সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী নয় বলে নানা ধরনের নাশকতা পরিচালনা করে আসছে। তবে এটাও সত্যি, এই মাটিতে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার হয়েছে। বিচারের রায় কার্যকর হওয়াটা বাঙালী জাতির জন্য এক বিরাট অর্জন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ- বাঙালীকে আরেকটি যুদ্ধ জয়ের গৌরব এনে দেবে এমনটাই বিশ্বাস। এর জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন দৃঢ় করার কোন বিকল্প নেই।’