২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা...

  • তানিয়া কামরুন নাহার

এতদিন কোন সমস্যা হতো না। ঘরের ভেতরে স্বামী তার স্ত্রীকে সামান্য কারণে নির্যাতন করছে, এতে কোন সমস্যা হতো না। কারণ স্বামী যেমন মনে করত, তেমনি স্ত্রীও মনে করত স্বামী তার স্ত্রীকে নির্যাতন করার অধিকার রাখে। সমস্যাটা শুরু হলো তখন, যখন নারী বুঝতে শিখল স্বামীর কোন অধিকার নেই এভাবে তার সঙ্গে অন্যায় করার এবং নারী ঘুরে দাঁড়াল।

এতদিন কোন সমস্যা হতো না। মন চাইলে হাত নিশপিশ করে উঠলে যে কোন মেয়েকে যৌন নির্যাতন করা যেত। ছাত্রীকে, হাতের কাছে পাওয়া যে কোন অল্প বয়সী মেয়েকে, প্রেমিকাকে, অফিসের নারী অধস্তনকে, সহপাঠিনীকে, সহকর্মীকে, বাস/মার্কেট বা যে কোন ভিড়ে কোন নারীকে। মেয়েরাও কেউ কিছু বলতনা। আর বলবেটাই বা কী? বলার আছেটাই বা কী? মেয়েরা যদি এসব জনে জনে বলে বেড়ায়, তবে তা মেয়েটির জন্যই লজ্জার ব্যাপার। মানুষ ভাববে, হয়তো মেয়েটিরই দোষ রয়েছে এতে কোন না কোনভাবে! সুতরাং হয় মুখ বুঝে সহ্য কর নয়ত গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়, এছাড়া আর কোন পথ নারীর জন্য খোলা ছিল না এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। এ সমাজও জানত মেয়েদের এই নীরবতা থেকে কিভাবে সুবিধা নেয়া যায়। তাই তারা মেয়েদের শেখাত শুধু একটি কথাইÑ ‘চুপ থাকো, ভাল মেয়েরা এসব বলে না।’ লক্ষ্মী মেয়েরাও শিখে নিয়েছিল চুপ করে থাকার অসভ্য ‘গুণ’টিকে। সবাই এটাই জানত যে, আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী... এখানে ইভ টিজিং কেউ করে না, এখানে ধর্ষণও হয় না... আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী... । সুতরাং এতদিন কারও কোন সমস্যা হতো না।

সমস্যাটা শুরু হলো যখন মেয়েরা মুখ খুলতে শুরু করল। একটুখানি স্পর্শ করতে গেলেই মেয়েরা যখন খেঁকিয়ে উঠতে শুরু করল, ‘আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?’ কিংবা কখনও কখনও শুধু কটমট করে তাকালেও ভয় পেয়ে যেত ওই সব অতিপুংশকেরা। কেউ দেখে ফেলল কিনা ভেবে একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে মুখ কালো করে নিজেদের হাত গুটিয়ে নিতে হতো। হাতের কাছে মেয়েদের পেয়েও কিছু করতে পারার সাহস দিন দিন হারিয়ে যেতে লাগল তাদের মন থেকে। গোলাপ যেমন একটি একটি করে পাঁপড়ি মেলে ফুটতে শুরু করে, তেমনি মেয়েরাও ধীরে ধীরে সাহসী হয়ে উঠতে শুরু করল। মেয়েদের এই সাহসী হয়ে ওঠাটা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল পুরুষতান্ত্রিকতার জন্য। এরপর ধীরে ধীরে চিত্র বদলে যেতে থাকল।

যেহেতু মেয়েদের গায়ে আগের মতো হাত দেয়া যায় না, তাই তাদের বাসে উঠতে বাধা দিতে লাগল সবাই। ভাবটা এমন- ‘আমাদের তোমাদের গায়ে স্পর্শ করতে দাও না তাই আমরাও তোমাদের বাসে উঠতে দেব না।’ আগে যেসব অতিপুংশকেরা ভয় পেয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজেদের হাত গুটিয়ে ফেলত, তারা এখন নতুন কৌশল নিল। কোন মেয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেই তারা এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজেদের খুঁজে নিয়ে একজোট হয়ে উল্টো মেয়েদেরই অপদস্থ করতে লাগল। তারা ইচ্ছা করে মহিলা আসনে বসে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সমস্যা তৈরি করে একটি কথাই সবার মগজে ঢুকিয়ে দিতে লাগলোÑ ‘মেয়েরা বাসে উঠবে কেন?’

ভদ্রলোকেরা যেহেতু বউ পেটায় না, তাই তারা মানসিক নির্যাতন করতে শুরু করল স্ত্রীদের ওপর। অফিসের বস তার নারী অধস্তনকে প্রমোশনের লোভ কিংবা চাকরি খেয়ে নেয়ার ভয় দেখিয়ে এমন সব আচরণ করতে শুরু করল, যার কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখিয়ে সহজে অভিযোগ করা যায় না। সত্যিই তো কী অভিযোগ করবে নারীটি? পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তো তাকে প্রশ্ন করার জন্য মুখিয়েই আছে, ‘সে কি আপনার গায়ে হাত দিয়েছে? ধর্ষণ করেছে? আপনার কাছে কী কী প্রমাণ আছে?’ এ সমাজ নারীর কাছ থেকে শুধু রসালো, মুখরোচক গল্পটাই শুনতে চায়, সুবিচার করা তার কাজ নয়। সুতরাং নারীটির অভিযোগ করার কোন জায়গাও নেই।

এতকিছুর পরও মেয়েরা ঠিকই সব ভুলে প্রাণ খুলে হাসে। রঙ্গিন শাড়ি পরে, খোঁপায় ফুল গোঁজে, কপালে টিপ দেয়। তারা গান গায়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে সূচি হোক ধরা...’। তাই তাদের কণ্ঠকে রুদ্ধ করে দিতে কুপরিকল্পিতভাবে যৌন সন্ত্রাসীরা নেমে আসে দলে দলে। ছিঁড়ে ফেলে খোঁপার ফুল, ছিঁড়ে ফেলে শাড়ি, রক্ষা পায় না মেয়েদের সঙ্গী, স্বামী-সন্তানরাও। এও তো নিছক কিছু ছেলের দুষ্টুমি বৈ আর কিছু নয়! তারা কারা অথবা আদৌ কোনকিছু করেছে কি-না অস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজে সবকিছু চিহ্নিতও করা যায়নি। সুতরাং কী প্রমাণ আছে? আর প্রমাণ থাকলেই বা কী? মেয়েরা কেন বাসে উঠবে, থুক্কু মেয়েরা কেন বৈশাখী মেলায় যাবে? তারা কী ঘরে বসে থাকতে পারে না?

তাই মেয়েরাও এখন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন নিজের হাতেই তুলে নেবে। তাদের সঙ্গে রাখবে ছুরি, সেফটিপিন, পিপার স্প্রে, এ্যান্টিকাটার। কেউ মেয়েদের সঙ্গে দুষ্টুমি করতে এলেই যখন মেয়েটি তার এ্যান্টিকাটারটি একবার খোলে আবার বন্ধ করে তখন সেই দুষ্টু পুংশক ভয় পেয়ে যায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঢোঁক গিলে চুপচাপ নিজের হাত গুটিয়ে নেয়।

জানি না, এমন অবস্থার ভেতর দিয়ে কতদিন মেয়েদের যেতে হবে। ভয় লাগে, নারীর আত্মরক্ষার অস্ত্রই না আবার কবে তার জন্য আত্মঘাতী হয়ে যায়! যেমন এ্যান্টিলোপ তার লম্বা আঁকাবাঁকা শিং দিয়ে নিজেকে রক্ষা করে, তেমনি কখনও কখনও এই শিং-ই তার মৃত্যুর কারণ হয়। যখন ক্ষুধার্ত ও হিংস্র হায় না তার খুব কাছেই আর তার শিং আটকে গেছে গাছের সঙ্গে, সে তা ছাড়াতে পারছে না। নারীর ওপর নির্যাতনের ধরন দিন দিন বদলে যাচ্ছে নতুন নতুন কৌশলে। আর তাই নারীদের আরও সাবধান হতে হবে। যেভাবে কুপরিকল্পিতভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা আর বিদ্বেষ সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে এ সমাজে তাই সঙ্গে শুধু অস্ত্র নিয়ে চললেই অবস্থা পরিবর্তন হবে না। সেই পুরনো কথাটাই আবার বলে যাই, ওভ ধহ বমম breaks due to OUTSIDE force! ÔInside Life Ends!Õ But… If it breaks from INSIDE! ÔLife Begins!Õ

আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র যে হৃদয় তার ব্যবহারটিও বাড়াতে হবে। নারী ও পুরুষকে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সুন্দর, বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মায়েরা তাদের ছেলেদের যদি শেখান মেয়েদের সঙ্গে কিভাবে সুন্দর ব্যবহার করতে হয়, তবে নারীর প্রতি পুরুষের সহিংস ও বিদ্বেষী মনোভাব অবশ্যই পরিবর্তন হবে। বাবারা যদি ছেলের সামনে তার মায়ের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করেন তবে ছেলেও তার বাবার গুণে গুণান্বিত হবে। আর পুরুষরা, আপনারা যদি নারীদের মানুষ হিসেবে যথার্থ শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে পারেন তবে সেই শ্রদ্ধা ও সম্মান আপনাদের কাছেই আবার বহুগুণে ফেরত আসবে। জানেন তো, As you sow, so you reap.

taûa.kamrun@yahoo.com