২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রঙিন স্মৃতির সবুজ রঙ

  • কেকা অধিকারী

বহুদিন থেকে একটা গল্প মনের মধ্যে জমে আছে। গল্পটা ঠিক আমার স্মৃতিকথা নাকি প্রকৃতির আত্মকথা- তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে এখন মনে হলো গল্পটা বলার সময় এসেছে।

আমার জন্ম ঢাকায় হলেও পরের কয়েক বছর খুলনার খালিশপুরে ছিলাম। যে বাড়িটায় প্রথমে ভাড়া ছিলাম তার আবছা যে স্মৃতি মনে পড়ে, তাতে স্পষ্ট দেখতে পাই একটি দৃশ্য- একতলা বাড়িটার সামনেই ছোট্ট একটা গোছানো জায়গায় বড় ঘাসের মতো গাঢ় সবুজ চিকন পাতার মাঝে অজস্র গোলাপি ফুলের হাসি। বড় হয়ে জেনেছি মনে গেঁথে যাওয়া সে ফুলটি ছিল লিলি। তারপর চলে এলাম কাছেই দাদুবাড়িতে। এ বাড়িতেই দাদুর কাছে আমার প্রথম প্রকৃতিপাঠ। দাদুর ঘরের সিঁড়ির পাশেই অন্যান্য গাছের সঙ্গে ছিল লতা গোলাপের ঝাড় আর একটি বড়সড় গন্ধরাজ ফুল গাছ। একটা কাগজী লেবুর গাছ ছিল ঠিক রান্নাঘরের পেছনেই। স্বল্প আয়তনের বাড়িটিতে আরও ছিল কলা, পেয়ারা ও আম গাছ। হয়ত আরও অনেক গাছ ছিল, এখন মনে নেই। ফুল আর ফলে নুয়ে পড়া দাদুর লেবু গাছটা নিয়ে আলোচনা শুনেছি বহুবার। লেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধের সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। এখনও মনে পড়ে লেবু পাতার সুগন্ধ সহযোগে দিদিমার হাতের সেই বেলের শরবতের কথা। মনে পড়ে আশপাশের মানুষের সময়-অসময়ে লেবুর জন্য আমাদের বাড়িতে আসার কথা। অবাক হয়েছিলাম, যেদিন স্কুলের কড়া ‘ডাক্তার স্যার’ও আমার কাছে লেবুর আবদার করেছিলেন। রান্না-বান্না খেলার বয়স তখন আমার। সেই সূত্রে চিনেছিলাম স্বর্ণলতাকে। এক অভিজ্ঞ খেলার সাথীর পরামর্শমতো স্বর্ণলতার বেশকিছু লতা এনে দাদুর গোলাপ ঝাড়ের উপরে ছড়িয়ে দিলাম আমি। কা- দেখে দাদু আমাকে ডেকে কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আমার সহজ-সরল উত্তর, ‘... ওগুলো রান্নাবাটি খেলার সেমাই। নিজেদের বাড়িতে থাকলে কষ্ট করে মানুষের বাড়ি থেকে যোগাড় করতে হবে না, তাই আমি স্বর্ণলতা লাগিয়েছি।’ দাদুর বর্ণনায় তখনই জেনেছিলাম পরজীবী উদ্ভিদের কিছু উপকারী বৈশিষ্ট্যের কথাÑ লতাগুলোকে বাড়তে দিলে ওরা গোলাপ গাছকে জাপটে ধরে রস শুষে খাবে। ফলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন ফুলও ফুটবে না। যদিও সেবার দাদুবাড়িতে স্বর্ণলতার স্থান হয়নি, তবুও তা আমার মনে চিরস্থায়ী আবাস করে নিয়েছিল।

দাদুবাড়ির উপরে সবুজ আর ভেতরে টুকটুকে লাল পেয়ারা স্বাদে-গন্ধে আর দর্শনে এখনও থাই পেয়ারাকে হটিয়ে ভাল লাগার স্থানটা জুড়ে আছে। একবার ডিসেম্বরে আমাদের গন্ধরাজ গাছটা ফুলে ফুলে সাদা হয়েছিল। তখন সন্ধ্যায় তরুণ-তরুণীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বড়দিনের সঙ্কীর্তন শুরু করেছে। দাদু আমাকে বললেন, ‘দেখো, ওরা যেন আবার ফুল ছিঁড়ে, ডাল ভেঙে না ফেলে।’ একদিন ওরা আমাদের উঠানে গান করতে এলে গানে অতি মুগ্ধ আমি দায়িত্বের কথা ভুলে গেলাম। কখন যে দুষ্টু ছেলেমেয়েরা গন্ধরাজ গাছটা প্রায় ফুলহীন করে ফেলেছিল আমি লক্ষ্য করতে পারিনি। ওরা চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার লজ্জায় খুব কেঁদেছিলাম। আবার ফুলগুলোর জন্যও খুব মায়া হলো। আর একটা অদ্ভুত গাছের কথা ভুলতে পারি না আমিÑ পানের লতার মতো গাছ, কিন্তু সে গাছে মোটা চুলওয়লা আলু ঝুলে থাকে! একদিন দেখি মহাযজ্ঞ করে ওই গাছের নিচের মাটি খুঁড়ে মস্ত আলু বের করে আনা হলো। এটাকেই নাকি বলে মেটে আলু!

দাদুর বলা একটি কথা আমাকে আজও ভাবায়। একদিন খুব মনোযোগের সঙ্গে আম খাচ্ছি। এক বিন্দু আমও আঁটির সঙ্গে রাখব না এমন পণই করেছিলাম হয়ত। খাবার অপচয়ের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর দাদু আমার খাওয়া দেখে বলেছিলেন, ‘দাদু, এভাবে খেতে নেই। এই আঁটি থেকেই আরেকটি আম গাছ হবে। তুমি যেভাবে দাঁত লাগাচ্ছ তাতে ওটা আঘাত পাচ্ছে। আঘাত পাওয়া বীজ বা আঁটি থেকে সবল গাছ হয় না। আর দুর্বল গাছের ফলও কিন্তু ভাল হবে না।’ এখন ভাবি, দাদুর মতো কি আমরা গাছকে এমন আপন করে কখনও ভাবতে পেরেছি? বাবার চাকরির সুবাদে ক্লাস থ্রি শেষ করেই আবার ঢাকায় ফিরে এলাম। শুক্রাবাদের যে বাসায় আমরা থাকতাম তার সামনে-পেছনে বেশ কয়েকটি আম-কাঁঠালের গাছ ছিল। তবে ঘরের ঠিক সামনেই ছিল একটা আতা গাছ। ছোট্ট চড়ুই, টুনটুনি, শালিক, দোয়েল পাখি মাঝে মাঝে বসত সে গাছে। বুলবুলিও বসত কখনও-সখনও। তবে আমার ছোট্ট মন খুঁজত, ‘আতা গাছে তোতা পাখি’। বাড়ির গেটজুড়ে ছিল মধুমঞ্জরি লতা। সবুজ লম্বা বৃন্তে গোলাপি আর সাদা পাপড়ির ফুল বাড়ির চেহারাটাই বদলে দিয়েছিল। তখনও মনে হয় ঢাকার বাসিন্দারা বৃক্ষহীন বাড়ির কথা ভাবতে পারতেন না। বাড়ির বাইরের দেয়ালঘেঁষে ছিল সিমেন্টের সø্যাবে ঢাকা বাঁধানো ড্রেন। সø্যাবগুলোর দু’একটা মাঝেমধ্যে ভাঙ্গাও ছিল। সেই ভাঙ্গা অংশ দিয়ে নিচের পানি বেশ ভালভাবেই চোখে পড়ত। ড্রেনের পানির দিকে তাকিয়ে থেকে আবিষ্কার করেছিলাম ছোট ছোট মাছ। মাছগুলোর দলবেঁধে সাঁতার কাটার দৃশ্য বেশ উপভোগ করতাম। এখন ভাবি, ঢাকা শহরের ড্রেনগুলোতে আর কোন মাছ খুঁজে পাওয়া যাবে কি? নিদেনপক্ষে অন্য কোন প্রাণের অস্তিত্ব?

কিছুদিন পরে শুক্রাবাদ ছেড়ে চলে এলাম কলাবাগানে। গত উনিশ শতকের আশির দশকের কথা। এই কলাবাগান কিন্তু এখনকার ইট-পাথরের ঘিঞ্জি কলাবাগান নয়। ধানের বিস্তৃত মাঠ, খাল, গাছপালা, পাখি, বন্যপ্রাণী ভরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কলাবাগান। আমরা টিনশেডের যে বাসাটায় থাকতাম, তাকে বাসা না বলে বাড়িই বলা চলে। কারণ বাড়িওয়ালার বিরাট জায়গাজুড়ে যে বাসাগুলো ছিল তার প্রায় প্রতিটিতেই একটি ছোট্ট উঠানসমেত বাউন্ডারি ছিল। আমার মা তার মধ্যে শখের বাগান করতেন। সে বাগানে বিচিত্র ফুল ও পাতাবাহারের সঙ্গে ছিল ঋতুভিত্তিক শাকসবজিও। তখন ফুল দেখে আমি ঢেঁড়স গাছকে ফুলগাছই ভেবেছিলাম। শুধু গাছ নয়, ঘরের এক পাশে মা বেড়া দিয়ে খাঁচা বানিয়ে মুরগি পালাও শুরু করলেন। একদিন বুলু মামা মায়ের জন্য আটটা ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা নিয়ে এলেন। হলদে-সাদা বাচ্চা দেখে আমরা বুঝলাম এগুলো বিদেশী মুরগি। ঘরের সামনে লম্বা বড় বারান্দার এক কোণে একটা কাগজের কার্টনে মা ওদের থাকার ব্যবস্থা করলেন। এভাবে মুরগির বাচ্চাগুলো আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠল। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই মুরগির বাচ্চাগুলো একের পর এক মারা যাচ্ছিল। কী গভীর শোক যে ছিল আমার ওগুলোর জন্যে! আমাদের সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে ছিল একটি ডুমুরের গাছ। নারিকেল দিয়ে ডুমুরের ফল ভেজে খেতে খেতে ‘ডুমুরের ফুল’ বাগধারার অর্থ হাতে-কলমে শেখা হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির সামনের আরেকটি গাছ বেয়ে উঠেছিল ধুন্দলের লতা। অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করি, আমাদের গা ঘষার অদ্ভুত জিনিসটি আসে এ গাছ থেকেই।

আরও ছোট বয়সে জেনেছিলাম, আমার বাবা ডায়াবেটিস নামক আরোগ্যহীন এক রোগে আক্রান্ত। মা আমাকে একটি লতা গাছ চিনিয়ে দিলেন। ওটা নাকি ডায়াবেটিস রোগের মহৌষধ। বাসার আশপাশের ঝোপ-ঝাড় আর লেক সার্কাস স্কুলের কাঁটাতারের বেড়া থেকে লতাটি এনে দেয়া ছিল আমার দায়িত্ব। সেটা ছিল তেলাকচুর লতা, কেলাকুচা নামেও এ লতাকে চেনেন অনেকে। সত্যি তেল চকচকে পাতাগুলো দেখে মনে হয় কেউ বুঝি তেল দিয়ে মুছে দিয়েছে। তাতে সাদা ফুল ধরে। তবে সবচেয়ে আকর্ষক ছিল ফল- কাঁচা অবস্থায় সবুজ, আর পাকলে সিঁদুরের মতো লাল! মা তেলাকচুর পাতা পাটায় বেটে রোজ সকালে বাবাকে এক কাপ করে রস খাওয়াতেন। তেলাকচু পাতা দিয়ে মাঝে মাঝে শিং মাছের ঝোলও রাঁধা হতো। এ সুস্বাদু তরকারিটা অবশ্য বাবার সঙ্গে আমরাও খেতাম মজা করে। অবাক কা-, সে লতা এখন মাঝে-সাঝে বাজারে দেখলেও আশপাশে আর দেখি না।