২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুশকিল

  • কাজী নজরুল ইসলাম

আজ যে চারিদিকে এত কলহ কোলাহল, এর মানে হচ্ছে আমরা যতটা দেশের কল্যাণ চাইছি, তার চেয়ে বেশি চাইছি আত্মপ্রচার বা লোকপ্রতিষ্ঠা। কারণ যখনই আমরা বাইরের খোসা নিয়ে টানাটানি করি তখনই আমাদের অতৃপ্তির মাত্রা বেড়েই চলেÑ অবশেষে লাঠালাঠি করে নিজেরা রক্তাক্ত হই, আর শত্রুরা হাসে। বাঙ্গালীর ভাবোচ্ছ্বাস আছে, কর্মোন্মদনা আছে। কিন্তু যা নেই সে হচ্ছে জ্ঞান বা জিজ্ঞাসা; কিন্তু এই জিজ্ঞাসা না হলে ভেদ বিষাদের মীমাংসা কোনো কালেই হয় না।

আমাদের দেশের মূঢ় জড় জনসাধারণের, শুধু তাই কেন, তথাকথিত শিক্ষিতদের মনে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করারও সনাতন ধর্মের নামে পুরাতন সংস্কারের দাসত্ব করার মতন মতি, এমন ভীষণভাবে শিকড় গেড়েছে যে, আমরা সত্য ন্যায়ের অনুরোধেও বাধা বিপদের কাঁটাবন কেটে নতুন পথ খুলে নিতে পারলে মুক্তি ও মঙ্গলের পথ অবাধ ও অব্যাহত করবার মত প্রেরণাও প্রাণে জাগে না। আমাদের এই দেহ মনের আড়ষ্টতা- এই যে আমাদের হাতে পায়ে খিল ধরে গিয়েছে- একটু নড়ে চড়ে সত্যের বিরুদ্ধতার সাথে লড়ে এগোবার ক্ষমতা নেই, একে কি আমরা মানবতা বলতে রাজি আছি? আজ চাই আমাদের প্রতি কর্ম ও চিন্তায় জীবনের প্রকাশ, প্রাণে চাঞ্চল্য, আর পরিপূর্ণ জীবনের জন্য বিপুল ব্যাকুলতা।

আর আমাদের নিরাশায় মুষড়ে পড়ে থাকার সময় নেই, সবাইকে মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে জাগতে হবে, গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে হবে। আমাদের অন্তরে, বাহিরে, সমাজে, ধর্মে, রাষ্ট্রের মৃত্যুর বিষবীজ ছড়িয়ে আছে- সে করাল কবল থেকে আমাদের রক্ষা পেতেই হবেÑ আর তার জন্যে সর্বাগ্রে চাই স্বরাজ। মুক্তি-পাগল মহাপ্রাণ চিত্তরঞ্জনের কাউন্সিল প্রবেশের প্রস্তাব অসহযোগীর কানে বেসুরো বাজতে পারে কিন্তু শুধু চরকা খদ্দর সম্বল করে দেশ যে কত কাল কোন সুদূর ভবিষ্যতের দিনে স্বরাজের আশায় পথ চেয়ে থাকবে তা বুঝতে পারি না। আর ঐভাবে মদালস গমনে গোরুর গাড়ির চালে-চলনে আমাদের স্বাধীনতা আলেয়ার আলোর মতো দূরে আরো দূরে সরে যাবে, মুক্তিদেবী হাততালি দিয়ে বলবেন, ‘ও তোর হাতের ফাঁসি রইল হাতে আমায় ধরতে পারলি না’- আর খলখল করে উপহাসের হাসি হেসে চলে যাবেন। চরকা খদ্দরের আন্দোলন ও প্রচলনে দেশের লুপ্ত শিল্পের উদ্ধার হচ্ছে, এ দেশের রক্ত শোষণের কলটা বন্ধ হবার অনেকটা পথ হয়েছে বটে। কিন্তু কে না জানে যে, দানবী মায়ার অন্ত নেই, আর তার কুহক জালে জড়িয়ে পড়ে আমাদের সরলপ্রাণ ও শিশুর মতো অজ্ঞান জনসাধারণ আবার ঠুঁটো জগন্নাথ হবে না, মায়ার লোভে ভুলে অমৃত ভা-ের দিকে পেছন ফেরাবে না। গৌরগণ, কত যে প্রেম জানে, কত যে যাদু জানে, তা কি আমাদের জানা নেই? টাকাটা সিকিটা কম দিয়ে বিলেতি কাপড় পেলে অনেকেরই সে মাথা ঠিক থাকে না- অনেকেই সে ‘প্রেমে জল হয়ে যাই গলে’- এ আমরা কলকাতা মফস্বল সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। এর মানে কী? তাহলে তো গান্ধী চিত্তরঞ্জনের কাতর আহ্বান সকলের প্রাণকে আলোড়িত করেনি, অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ না হলেও, আজো তা সার্থক হয়েছে বলে মনে হয় না। আজ এদেশের প্রত্যেকের প্রাণের প্রদীপ মুক্তির অগ্নিস্পর্শে জ্বলে ওঠা চাই, সমস্ত দেশে আজ নতুন করে নবজাগরণের বিপুল সাড়া জাগিয়ে তুলতে হবে, আজ এমন প্রচ- আগুন জ্বালা চাই, স্বাধীনতার শান্তিবারি ছাড়া যার প্রশমন হতে পারে না। স্বরাজ-সাধনায় শিশুর মতো শুদ্ধি সরলতার আবশ্যকতা আছে, স্বীকার যাই, কিন্তু তার চেয়ে যার বেশি প্রয়োজন সে হচ্ছে যৌবনের শক্তি ও একান্ত নিষ্ঠা। আজ ছোট লোকটির মতো ‘চলি চলি পা পা’ করে খানিক দূর এগিয়ে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়লে চলবে না। আজ যদি আমরা মুক্তির আলো-ঝরনায় অবগাহন করে নবজন্ম ও নতুন চেতনা লাভ করে থাকি তাহলে আমাদের অহিরাবণের মতো বীরবিক্রমে যুদ্ধসাজে সজ্জিত হতে হবে।

আমলাতন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে আমাদের শক্তি পরীক্ষা করতে হলে কাউন্সিল ভেঙ্গে দেওয়া যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন, যারা পূর্ণ মুক্তির বিরোধী তাদের শাসনযন্ত্র হতে বেদখল করা এবং বুরোক্রেসি শাসন যে নেহাত ভুয়ো ছেলেখেলা ও আমাদের সকল অমঙ্গলের আদি নিদান তা প্রতিপন্ন করে গভর্নমেন্টের গিলটি করা, মুখোশ খুলে তার বিকৃত স্বরূপ ভালো করে দেখাতে পারা যে একান্ত দরকার আর তাতে যে অসহযোগীদের ভাগবত অশুদ্ধ হবে না- এই হচ্ছে এক দলের মতো। সত্যি মুক্তি সাধনকে একটি গৌণ কর্ম মনে করে আমরা যে সকলেই পুরানো থোড় বড়ি-খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়ের তালিম দিচ্ছিÑ এটি নিতান্ত অসহ্য ব্যাপার, কিভাবে আমাদের শক্তি, তেজ উঠে নিভে যাচ্ছে তাতে আমরা যে এগিয়ে না গিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিÑ তা অস্বীকার করা চলে না।

আর একদল হচ্ছেন পুরাতন পন্থী তাঁরা পরিবর্তন চান না, কাউন্সিলে গেলে দেশের কথা মনে থাকবে নাÑ মন সাহেবি খানায় বিগড়ে যাবে। তারপর কাউন্সিলের জন্য ভোট একচেটে করে দেওয়া, কর্তাদের কাউন্সিল বাতিল করে দেওয়া যাবে নাÑ ও এমন বিষয় নয়, যা নিয়ে শক্তি ক্ষয় করে কোন সুসার হবে। আর যে জিনিসকে অশুচি বলে বর্জন করা হয়েছেÑ তার সংস্রব থেকে দূরে না থাকলে আত্মা অশুদ্ধ হয়ে পড়বে।

কাউন্সিলে গিয়ে তার ফটক আটকে দিয়ে কেল্লাফতে যারা করতে চাইছেন, আর যারা বলছেন ও স্থান মাড়ালেই মহাপাপ, এদের দু’দলকেই জিজ্ঞাসা করছিÑ যে, তাঁরা দু’দশটি সুখের পায়রা, ননীর পুতুল কি মুক্তি সংগ্রামের জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা ধারণ করেন? তাঁরা লড়বেন যেসব লড়িয়ে সিপাইদের নিয়ে, তাদের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় আছে কি? তাদের অন্তরের বেদনার সন্ধান করে তার প্রতিকারের পথ দেখাবার জন্য তো অগ্রসর হতে হবে। তাদের শুষ্ক শূন্য জীবনের সুখ ও শক্তির রুদ্ধ উৎসটি তো খুলে দিতে হবে। শুধু নৈবিদ্যির চিনি দিয়ে তো দেবতার তৃপ্তি হবে না। আজ প্রচুর অন্নের ব্যবস্থা চাই, যারা দেশের শিরদাঁড়া তাদের শক্ত করতে হবে। নিচের মানুষদের টেনে উপরে তুলতে হবে তাদের মনে মুক্তি-প্রেরণা জাগিয়ে তুলতে পারলে পথ আপনি ঠিক হয়ে যাবে। কাউন্সিল করতে হবে কি না হবে তা নিয়ে আজ লাঠালাঠি করে ফল নেই, ও দড়ি এত শক্ত নয় যে, দু’দিকের অত ভীষণ টান সইতে পারে, এতে নিজেদের পতনের পথই প্রশস্ত হচ্ছে। এ ঝগড়া কি ধামাচাপা দেওয়া যায় না, কাউন্সিল স্বরাজের কি গয়ায় পি-িদান হয় না?

দেশের কাজ পল্লীগঠন করতে হবে। মূক মৌনমুখে মুক্তির কলরব জাগিয়ে তুলতে হবে। সকল প্রকার মিথ্যা অত্যাচারের বিরুদ্ধে যাতে জনসাধারণ অকুণ্ঠচিত্তে পরিপূর্ণ বিদ্রোহ করতে পারে, তার ব্যবস্থা চাই, আর তা না হলে শুধু ভদ্রলোকের জটলাতে স্বরাজের পাকা বুনিয়াদের প্রতিষ্ঠা হবে নাÑ এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার জন্য চাইÑ এই অগণিত জনসাধারণ যাতে পূর্ণ অধিকার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সজাগ হয়, ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল রকম অবিচার কদাচারের বিরুদ্ধে, অন্তরে ভগবত্তার স্পর্শ ও অনন্ত শক্তি অনুভব করে, মাথা খাড়া করে দাঁড়াবার মতো বল পায় সেই জন্য চেষ্টা ও আন্দোলন করা। এই ছত্রভঙ্গ ছিন্নভিন্নবিবাদ-ক্ষিপ্ত বিরাট জনশক্তিকে সঙ্ঘবদ্ধ ও চালিত না করতে পারলে অত্যাচারীর দম্ভকে স্তম্ভিত করা যাবে না। আজ সেই সাধক ও সিদ্ধ নেতা কোথায়, যিনি এই দীনহীন জীর্ণ মলিন আচ-াল ভারত সন্তানের বিষণœ মুখে হাসির ও তেজের আলো ফুটিয়ে তুলবেনÑ বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? তাই বলছিলাম মুশকিল।

লাঞ্ছিত

মানুষ চিরকাল মানুষের উপর যে অত্যাচার করিয়া আসিতেছে, তাহা পশুদের পক্ষে অসম্ভব। কারণ মানুষ একটি চিন্তাশীল পশু। তাহার বুদ্ধি বৃত্তি এত প্রবল যে, ইচ্ছা করিলেই সে তাহার ভিতরকার পশুটিকে দুর্দান্ত এবং নির্মম করিয়া তুলিতে পারে। পশুর চেয়ে তার সুখ আরামের স্পৃহা একবিন্দু কম নয় এবং এই নিমিত্ত সে পৃথিবী কেন সৌরজগতটাকে ধরিয়া বাঁধিয়া তাহার আরামের যন্ত্রে পরিণত করিতে চেষ্টা করিয়া আসিতেছে। তাই রেল স্টিমার, বিদ্যুৎ গাড়ি, কলকারখানা একটির পর একটি করিয়া মানুষের আরামের নিমিত্ত সৃষ্টি হইতে লাগিল এবং এই নিমিত্ত বায়ু, বিদ্যুৎ হইতে আরম্ভ করিয়া কোটি কোটি মনুষ্য পশুপক্ষী, অপেক্ষাকৃত মুষ্টিমেয় প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মনুষ্য-পশুর দাসখৎ লিখিয়া দিতে বাধ্য হইতে লাগিল। কেউ ধর্মের নামে, কেউ বা সমাজ, শান্তি ও শৃঙ্খলার নামে কোটি কোটি জীবনকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বদ্ধ করিতে লাগিল। ফলে আজ সাত সমুদ্র তের নদী পার হইয়া ইউরোপীয়গণ এশিয়া ও আফ্রিকার ধর্ম ও সমাজ শাসন করিতেছে, আবার আমাদের সমাজে কতকাল ধরিয়া মুষ্টিমেয় তথাকথিত উচ্চজাতীয় নিম্নজাতির ধর্ম ও সমাজ রক্ষা করিয়া তাহাদের পরলোকে সম্পত্তি করিতেছে। গৃহ শিল্প নষ্ট করিয়া ধনী কল স্থাপন করিলেন, অংশীদারেরা শতকরা পঞ্চাশ টাকা লাভ করিয়া স্বদেশীর কল্যাণ হোক বলিয়া আশীর্বাদ করিলেন। কিন্তু সহস্র সহস্র শিল্পী কলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতে না পারিয়া জাত ব্যবসায় ছাড়িয়া দিয়া স্ত্রী পুত্রের হাত ধরিয়া রাস্তায় দাঁড়াইল। তাই আজ শত সহস্র তাঁতী জোলা, কামার-কুমার বৈরাগী হইয়াছে। সহস্র লোক স্ত্রী পুত্র লইয়া কুলির কাজ করিতেছে। দিন দিন চুরি-ডাকাতি বৃদ্ধি পাইতেছে। লক্ষ লোকের অন্ন সংস্থানের সর্বনাশ করিয়া চার পাঁচশত লোক ধনী হইলেন এবং বিলাস ব্যসনে অর্থব্যয় করিলেন।

উকিল দেখিতেছে মক্কেলের কত খাওয়া যায়। মহাজন দেখিতেছে দেনাদারের ভিটেমাটিটুকু কী করিয়া নেওয়া যাইতে পারে ভদ্রলোক ভাবিতেছে ঢং দেখাইয়া কত বোকা ঠকানো যাইতে পারা যায়। কেউ বা বুদ্ধি বিক্রয় করিতেছেন, কেউ বা দেশনীতির মেলা খুলিয়া বসিয়া আছেন। সবাই কে কার মাথা খাইবেন ভাবিয়া অস্থির। পরের ভাবনা ভাবিবার তিল মাত্র সময় নাই। এই যে সারাদিন এত ব্যস্ততা সে শুধু কি করিয়া দুর্বলকে পেষণ করিয়া আর একটু বড় সঞ্চয় করা যায় তাহার চেষ্টার নিমিত্ত।

ভারতবর্ষে শতকর সত্তরজন চাষী। তারা আজ অহরহ পরিশ্রম করিয়া দু’বেলা খাবার অন্ন যোগাড় করিতে পারে না। মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেরা অসদুপায়েও স্ত্রী পুত্রের মুখে ভাত তুলিয়া দিতে পারে না। রোগ লইয়া দুর্ভিক্ষ ঘরে ঘরে মহাজনের মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে এদিকে উচ্চজাতি মৃত্যুকালেও নিম্নজাতিকে এক ধাপ উপরে উঠিতে দিবে না। জমিদারের জমি নিলামে, তবুও সে প্রজার হাত ধরিবে না। বাবুরা ছোটলোকদের এখনও দূরে রাখিতেছেন। এ দেশী বড়লোকেরা ধর্ম সমাজ এমনকি রাজনীতির ক্ষেত্রেও আভিজাত্য ও কালচারের গর্বটুকু ভুলিতে পারিতেছেন না। সমস্ত জাতিটা যেন মরণের দিকে ছুটিয়া চলিয়াছে।

এমনি সময় যত দেশের যত লাঞ্ছিত, তাহাদের ব্যথা বুকে লইয়া মহাত্মা ভারতের শহরে শহরে ঘুরিতে লাগিলেন। আর বলিতে লাগিলেন, ‘কে আছো লাঞ্ছিত পতিত! ওঠো! জাগো মুক্তি তোমার দুয়ারে। তুমি উঠিয়া তোমার প্রাপ্য বুঝিয়া লও।’

স্বরাজের আশায় নাকে রুমাল দিয়া বাবুর দল ন্যাংটা সন্ন্যাসীর কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। মহাত্মার কথায় সায় দিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু অস্পৃশ্যতা আর নীচু জাতির উন্নতির কথায় বিশেষ কান দিল না। এমনকি খদ্দর জিনিসটাকেও সুবিধা মত মিশ্র খদ্দর করিয়া লইতে দ্বিধা করিল না।

নিম্ন জাতিÑ জাতির অধিকাংশ লোকÑ যেখানে ছিল, বাবুর সমাজ তাহাদিগকে সেইখানেই চাপিয়া রাখিল। আর যেই আন্দোলনে মন্দা পড়িল অমনি বাবুর দল ক্ষেপিয়া উঠিল ‘খদ্দরে স্বরাজ হইবে না।’ নিম্ন জাতির কথা বলাও যা, ভূতের কাছে রাম নাম করাও তাই।

তাই মহাত্মা জেলে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, লক্ষ্মী কেমন আছে? লক্ষ্মী মহাত্মার পালিতা নীচ জাতীয়া কন্যা। তিনি লক্ষ্মীর নামে সকল নীচ জাতির কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন।

কে আছো পতিত, লাঞ্ছিত, কে আছো দীন, হীন, ঘৃণিত, এসো। যে শক্তি বলে তোমার ভাইরা ফরাসির হাজার বছরের অত্যাচার ও আভিজাত্য দুইদিনে লোপ করিয়া দিয়াছিল, যে অন্যায় সাইবেরিয়ার লক্ষ বন্দী সন্ত্রাসদাতা দুর্ধর্ষ সুপ্রতিষ্ঠিত শাসন ভাসিয়া গিয়াছিল, যে শক্তিময়ীর বিকট হাস্য সমস্ত জগতের অত্যাচারকে উপহাস করিয়া ধনগর্বিতদের গৃহে গৃহে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, সেই শক্তিময়ী সেই সর্বনাশের বন্যা লইয়া তোমার দুয়ারে উপস্থিত, ওঠো, ভাই, মাকে বরণ করিয়া লও।

নিশান-বরদার

[পতাকাবাহী]

ওঠ ওগো আমার নির্জীব ঘুমন্ত পতাকাবাহী বীর সৈনিক দল। ওঠো, তোমাদের ডাক পড়েছেÑ রণদুন্দভি রণভেরী বেজে উঠেছে। তোমার বিজয়-নিশান তুলে ধর। উড়িয়ে দাও উঁচু করে ধরে; তুলে দাও যাতে সে নিশান আকাশ ভেদ করে ওঠে। পুড়িয়ে ফেল ঐ প্রাসাদের উপর যে নিশান বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে তোমাদের উপর প্রভুত্ব ঘোষণা করছে ভেঙ্গে ফেল ঐ প্রাসাদশৃঙ্গ। বল আমি আছি। আমার সত্য আছে। বল আমরা স্বাধীন। আমরা রাজা। বিজয়-পতাকা আমাদের; আর কারো জন্য নয়। মনে প্রতিজ্ঞা কর যে, নিশান ওড়াবো আমরা। আমাদের বুকের উপর ও নিশান আর কাউকে ওড়াতে দেব না। ও নিশান জ্বালিয়ে দেব। শপথ কর, যদি ও নিশান আবার তুলে ধরতে চায় তবে এমন শাস্তি দেব, যা তারা মরণের পরপারে গিয়েও তার জ্বালা ভুলতে না পারে। শয়তানকে জয় করে দেশত্যাগী করতে হলে, তাদের বুকের উপর রক্ত উড়িয়ে দিতে হবে।

আমাদের বিজয়-পতাকা তুলে ধরবার জন্যে এসো সৈনিক। পতাকার রং হবে লাল, তাকে রং করতে হবে খুন দিয়ে। বল আমরা পেছাব না। বল আমরা সিংহশাবক, আমরা খুন দেখে ভয় করি না। আমরা খুন নিয়ে খেলা করি, খুন নিয়ে কাপড় ছোপাই, খুন দিয়ে নিশান রাঙ্গাই। বল আমি আছি, আমি পুরুষোত্তম জয়। বল মাভৈঃ মাভৈঃ জয় সত্যের জয়।

আমি আছি বলে নিশান হাতে তুলে নাও। এসো দলে দলে নিশানধারী বীর সৈনিক ভাইরা আমার। নিজেকে সৈনিক বলে প্রচার করি, এসো। এসো, শয়তানকে অর্ধেক পুঁতে ফেলে তার মাথার উপর তাদেরি মাথার মগজের চর্বি দিয়ে চেরাগ জ্বালাই। শয়তানকে দগ্ধ করে করে মারতে হবে। এই কথা বলে বেরিয়ে এসোÑ আমি আছি, আমাতে আমিত্ব আছে, আমি পশু নই, আমি মনুষ্য, আমি পুরুষসিংহ। আমাদের বিজয়ী হতে হবে। বিজয়-পতাকা ওড়াতে হলে খুন খোসরোজ খেলা খেলতে হবে। ধর ধর এক হাতে ভীম খড়গ সর্বনাশের ঝা-া আরÑ আর এক হাতে ধর রক্তমাখা পতাকা। আামদের এই বিজয়-মঙ্গলের সময় যদি কেউ বাধা দিতে আসে তবে তাকে বড় থেকে অর্ধেক ছাড়িয়ে নিয়ে অর্ধেক সাগর জলে ভাসিয়ে দাও আর অর্ধেকখানা সেখানে পড়ে দু’পায়ের গিঁটে গিঁটে যেন ঠোকাঠুকি করে।

আঘাতের দেবতাকে এনে তোমার মগজের ভিতর বসিয়ে নাও। কালী করালীর হাত থেকে ভীম খড়গ ছিনিয়ে আন। উচ্চ প্রাসাদ-শিরে যে পতাকা উড়ছে তাকে উপড়ে ফেলে সেখানে আমাদের বিজয়-পতাকা উড়িয়ে দেব বলে বেরিয়ে পড়। চেয়ে দেখ তোমার মা ‘মেয় ভুখা হু’ বলে চিৎকার করে করে বেড়াচ্ছে সর্বনাশী বেটিকে শান্ত কর। না হলে সে নিজের ছেলের রক্ত খেতে কুণ্ঠাবোধ করবে না।

যে নরনারায়ণের বক্ষে পদাঘাত করে, ভীরুতা শিখিয়ে দাস করে রেখে দেয়, তাকে তোমরা ক্ষমা করো না। তার কণ্ঠ চিরে উষ্ণ রক্ত পান কর। তোমাদের পূর্ব স্থান তোমরাই দখল করে তার উপরে তোমাদের বিজয়-পতাকা উড়িয়ে দাও।

তোমার পণ কি

নিবিড় অরণ্য মধ্যে গভীর নিশীথে শব্দ হইল, ‘আমার মনস্কামনা কি সিদ্ধ হইবে’ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া কে প্রশ্ন করিল, তোমার পণ কি? আবার শ্রুত হইল, ‘পণ আমার জীবন সর্বস্ব’।

Ñজীবন তো তুচ্ছ কথা, আর কি দিবে?

Ñআর কি আছে? আর কি দিব?

Ñআর কি আছে? আর কি দিব?

উত্তর হইল, ভক্তি!

ওরে আমার তরুণ সাধক আজ ঐ শোন আঁধার ভেদ করিয়া কার প্রশ্ন শোনা যাইতেছে, ‘তোমার পণ কি? তুমি কি সিদ্ধিলাভ করিতে চাও? পিশাচের অত্যাচারে তোমার বুকে কি রণলিপ্সা জাগিয়া উঠিয়াছে? দুর্বৃত্ত দলনের নিমিত্ত সংহার মূর্তি লইয়া ভগবান কি তোমার হৃদয়ে আসিয়াছেন? পদ মদ মত্ত রাক্ষসের কণ্ঠনালী ছিন্ন করিবার লোভ কি তোমার হৃদয়ে জাগিয়াছে? ওরে আমার বাংলার সাধক! তোমার প্রাণে কি রুদ্র বিষাণ বাজিয়া উঠিয়াছে? তাহা হইলে বল, তোমার পণ কি?

ঐ দেখ অত্যাচার তার সহস্র ফণা দোলাইয়া বিশ্বতরু গ্রাস করিতে উদ্যত, প্রাণে প্রাণে পদাহতা দেবতার তপ্ত শ্বাস, ঘরে পীড়িতের ক্রন্দন। তুমি এ কালনাগকে পিষিয়া মারিতে পারিবে? তুমি কি বুকে বুকে আগুন জ্বালাইতে পারিবে? তাহা হইলে বল, বীর, ‘তোমার পণ কি?’ বল, ‘পণ আমর জীবন সর্বস্ব’ দুয়ারে আঘাত করিয়া বল- ‘ওগো, কে আছ পতিত, কে আছ শূদ্র, তোমরা ওঠ, এ বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে হবে। এ সংসার যে ভেঙ্গে ফেলতে হবে। তোরা জয়, কার কাঁচা প্রাণটা বলি দেবার লোভ হয়েছে আয়, তোরা আয়’।

একবারÑ ওরে একবার তোরা ঐ তন্দ্রালসের বুকে আঘাত কর, একবার তোরা চেঁচিয়ে বল, ‘পণ আমার জীবন সর্বস্ব’। আবার প্রশ্ন হইল, জীবন তো তুচ্ছ কথা, আর কি দিবি? ওরে তরুণ, ওরে মাতাল, প্রাণ তো তুচ্ছ কথা, আর কি দিবি? তোদের দয়া, তোদের মায়া, তোদের আশা, তোদের ব্যথা- তোদের আর কি দিবি? তোদের মনের কোণে কি সুখের আশা আছে? ওরে দুঃখী, ওরে হিংস্র, তা ভেঙ্গে ফেল। সে যে সবটুকু চায়।

আর কি দিবে?

বাংলার ছেলে তুমি বল, ‘আমি সব দেব, আমি সব নেব’। পারিবে কি? যখন অগ্রসর হইতে হইতে একটি একটি করিয়া সেনাপতি আহত হইয়া পড়িবে, তখন সেই শ্মশানে নিজ স্থান অধিকার করিয়া থাকিতে পারিবে কি? শত্রুর সেনা যখন তোমার ঘরে রক্তস্রোত বহাইয়া দিবে, তখন তোমার চক্ষু, পশ্চাতে ফিরিবে না তো? প্রিয়তম বলির করুণ ক্রন্দনে হৃদয় কাঁপিয়া উঠিবে না তো? তাই বুঝি সে কঠোর স্বরে বলিতেছে, ‘আর কি আছে, আর কি দিবে!’ ভীষণ দুর্দিন। শত্রুরা একবার শেষ চেষ্টা করিতেছে। দেশে দেশে দানবরাজেরা ভীষণ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছে। যুগবাণীর কণ্ঠ রোধ করিয়া ফেলিবার জন্য তাহাদের রক্তাক্ত নখর প্রসারিত। ওগো, মরণ পথের পথিক, তোমরা পারিবে কি? ক্ষত-বিক্ষত দেহে ও তাহার বক্ষে আঘাত করিতে পারিবে কি?

একে একে সেনাপতি সরিয়া যাইতেছে। অন্ধকার, ওরে চারিদিকে অন্ধকার। তোমরা এ অন্ধকারে চলিতে পারিবে তো? পথবাহক যদি হাত ছাড়িয়া দেয় তবে পথ ভুলিবে না তো? মাতার ক্রন্দন, প্রিয়ার ব্যাকুলতা- দলিত করিয়া একা এই অন্ধকারে পথ চলিতে পারিবে তো? তবে বল, তোরা বল-

ওরে চারিদিকে মোর

একি কারাগার ঘোর

ভাঙ্গ ভাঙ্গ ভাঙ্গ কারা

আঘাতে আঘাত কর।