২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গারোদের নবান্ন উৎসব

  • গৌরব জি. পাথাং

নতুন শস্য ঘরে তোলার আনন্দ সবার মধ্যেই রয়েছে। নবান্ন উৎসব সেই শস্যভিত্তিক ও কৃষিভিত্তিক একটি উৎসব। শস্য সংগ্রহকে কেন্দ্র করেই এ উৎসব পালিত হয়। সমতলভূমির আদিবাসী গারো, হাজং, ওরাও, সাঁওতাল, পার্বত্য এলাকার আদিবাসী ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা জুম কাটার পর নবান্ন উৎসব পালন করে থাকে। তাদের প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীরই নিজস্ব নাম রয়েছে; গারোদের ওয়ানগালা, হাজংদের নয়াখাওয়া, সাঁওতালদের সোহরায়, ত্রিপুরাদের মাই কত্চাঃম, মারমাদের ককস্বইচাঃপোয়ে, ম্রোদের চামোই নাচ প্রভৃতি। খ্রীস্টান হওয়ার পূর্বে গারোদের আদি ধর্ম সাংসারেক অনুসারী থাকাকালীন ওয়ানগালা ছিল সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। বর্তমানে এর গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে।

গারোদের ওয়ানগালা পালিত হয় অক্টোবর মাস থেকে নবেম্বর মাসের যে কোন দিন। তাদের কৃষিভিত্তিক বর্ষের শেষ মাস ‘জাবিলসি’ মাসে। ওয়ানগালা শব্দকে ভাঙলে দুটি শব্দ পাই, ওয়ানা আর গালা। ওয়ানা মানে পাতা ও নৈবেদ্য, গালা মানে ঢালা, ফেলা এবং উৎসর্গ। তাই ওয়ানগালা মানে হলো পাতা বা পত্রে নৈবেদ্যের বস্তু রেখে ‘চু’ বা মদজাতীয় পানীয় ঢেলে সালজং দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ বা নিবেদন করা। ওয়ানগালা নিয়ে গারোদের মধ্যে একটি লোককাহিনী প্রচলিত রয়েছে। আঃনি আফিলফা নামে আদি পুরুষ বন্যআলু স্থেং আমফং খুঁজতে খুঁজতে যখন ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন মিসি সালসং দেবতা যিনি শস্য দেবতা ও ভূমি উর্বরতার দেবতা। তিনি আফিলফাকে প্রশ্ন করেন, তুমি কি কখনও ভাত খেয়েছ? আফিলফা বলেন, না। তার উত্তর শুনে করুণাবশত হয়ে মিসি সালজং তাকে ধান দিয়ে বলেন, তুমি এ বীজ বপন করবে আর ফসল উৎপাদনের কিছু শস্য আমাকে উৎসর্গ করবে। সেই আদেশ অনুসারে ঘরে শস্য তোলার পর সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ওয়ানগালা উৎসব পালিত হয়। এ অনুষ্ঠানে গারো মেয়েরা দমকান্দা পরে, মাথায় দ’মি দিয়ে কৃষ্টিগত নাচ, গান, গীতিনাট্য রে-রে, সেরেনজিং প্রভৃতি পরিবেশন করে। গারোদের বাদ্যযন্ত্র রাং, দামা, আদুরু প্রভৃতি বাজিয়ে তারা নৃত্য করে। ‘চু’ (মদ) বা পানীয় খেয়ে আনন্দ উৎসব করে। গ্রামের সবাই মিলে দিনরাত আনন্দ-ফুর্তি করে।

তাদের কণ্ঠে তখন বেজে ওঠে ওয়ানগালার গান-

ওয়ানগালা ওয়ানগালা ওয়ানগালা

গিত্তেল খ্রিস্ট রাজা হাই ওয়ানগালনা।

সালজং মিত্তে মিংগিপা দংআনা

স্রেং আমপেংনি পালো মিখো চানা

মিবিচ্রিখো গি’না খাসায়ে অন্নানা

চেংঅ আচ্চু আনি আফিলফানা।

ওয়ানগালা উৎসব আদিতে অর্থাৎ খ্রীস্টান হওয়ার পূর্বে ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত পালিত হতো। আজ নানান কারণে তা শিথিল হয়ে এসেছে। আগের মতো আর পালিত হয় না। তারপরও উৎসবের গুরুত্ব ও আনন্দ হ্রাস পায়নি। এখন একদিনের জন্য অনুষ্ঠান হলেও আগের অনুষ্ঠানগুলো একদিনেই পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠান সাধারণত কয়েকটি ভাগে অনুষ্ঠিত হয়।

চু-রুগালা ॥ এ অনুষ্ঠানে উৎপাদিত সামগ্রী অর্ধেক কেটে বিছানো কলাপাতায় রেখে মদ ঢেলে শুচি করা হয় এবং সৃষ্টিকর্তা বা দেবতার নামে সেই সামগ্রী উৎসর্গ করা হয়।

থককা ॥ চালের গুঁড়ি দিয়ে কোনকিছুর উপর চিহ্নিত করাই থককা। চু রুগালার পর ঘরবাড়ি চিহ্নিত করা ও সাজানোর জন্য থককা ব্যবহৃত হয়।

সাসাৎসআ ॥ এ অনুষ্ঠান ধূপারতির অনুষ্ঠান। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে এ অনুষ্ঠানে ধূপারতি দেয়া হয়।

জলওয়াত্তা ॥ উসবের সমাপনী দিন। এ অনুষ্ঠানের দ্বারা সালজং দেবতাকে বিদায় জানানো হয়।

হাজংদের নবান্ন উৎসবের নাম নয়াখাওয়া। নতুন ফসলের ধান থেকে চাল, চাল থেকে ভাত রান্না করে খাওয়াকে নয়াখাওয়া বলা হয়। নয়াখাওয়ার সময় ঢেঁকিতে নতুন ধানের চিড়া তৈরি করা হয়, এ উৎসবে মদ্যপান ও মাংস আহার করা হয়। নয়াখাওয়ার সময় দেবভোগের জন্য পৃথক বীজতলায় চারা তৈরি ও রোপণের ব্যবস্থা থাকে। এ ধরনের চারাকে ‘কামিজালা’ আর ধানকে ‘কামিধান’ বলা হয়। নয়াখাওয়া উৎসবে দেবভোগে কামিধানের চালের ভাত অবশ্যই প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পয়লারোয়া রোপণের পূর্বেই হাজং সম্প্রদায়ের নারীরা কলাগাছের চারা, ধান-দূর্বা ক্ষেতের উত্তর-পশ্চিম কোণে পুঁতে এবং একমুঠো ধানের চারা দিয়ে ক্ষেতের ধানের চারা রোপণের সূচনা করে। ধান কাটা শেষ হলে তারা কাঁচিধোয়া ও ধানদুকা উৎসব পালন করে। ধান কাটা শেষের দিনে শেষ পর্যায়ে তারা ছোট ছোট চারটি আঁটি বেঁধে না কেটেই জমিতে রেখে দেয়। এই আঁটিগুলোকে বলা হয় চইতন ধান আর কাটা ধানগুলোকে বলা হয় হালধান। যারা ধান কাটে তাদের কাস্তেগুলোকে চইতন ধানের নিচে জড়ো করে রাখে। পরে বাড়ির গৃহিণীরা এসে ঘটিতে জল ও তুলসী পাতা এনে আঁটি ও কাস্তেগুলো ভিজিয়ে দেয়। এই অনুষ্ঠানকেই কাঁচিধোয়া বলা হয়। যারা ধান কাটে তারা কাটা ধানগুলো নিয়ে যায়। আর নারীরা চইতল ধান নিয়ে গোলায় ভরে রাখে। ধান কাটা সমাপ্তি উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যাকে ধানদুকা বলা হয়।

রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান পাহাড়ী ভূমির মধ্যে মারমা, চাকমা, তঞ্চংগ্যা, ত্রিপুরা সম্প্রদায় নবান্ন উৎসব পালন করে থাকে। তাদের জুম চাষ শুরু হয় মার্চ-মে মাসের মধ্যে। তবে এর আগে থেকেই জমি প্রস্তুত, গাছ কাটা, জঙ্গল পরিষ্কার ও পোড়ানোর কাজ করতে হয়। তাদের নবান্ন উৎসব শুরু হয় আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আর শেষ হয় সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবরের মধ্যে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে তারা জুম থেকে মারফা, আলু, কচু, ধান, তিল প্রভৃতি সংগ্রহ করে থাকে। শস্য সংগ্রহ শেষ হলে যার যার সুবিধামতো তারা এ উৎসব পালনের আয়োজন করে থাকে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের যে কোন দিন ত্রিপুরাদের ‘মাই কত্্চাঃম’ বা নবান্ন উৎসব পালিত হয়। ধনের দেবী লক্ষ্মী বা মাইনজুকমা। দেবীর উদ্দেশে জুমের ফসল সংগ্রহ করার পর ‘নুখুংনি মাতাই’ নামে ঘরের উঠানে কাঁচা বাঁশ দিয়ে বেদি সাজিয়ে পূজা দেয়া হয়। ত্রিপুরা ও পার্বত্য এলাকার আদিবাসীরা জুমে চারা, ধান, মারফা ও যে কোন ফসল রোপণের আগে জমিতে বেদি প্রস্তুত করে প্রার্থনা করে। সৃষ্টিকর্তার নিকট আশীর্বাদ যাচনা করে। তারা প্রার্থনা করে যেন সকল অমঙ্গল হতে রক্ষা করেন, বন্যশূকর ও পোকামাকড়ের হাত থেকে ফসল রক্ষা করেন। কারণ ফসলের সময় অনেক বন্যশূকর ও পোকামাকড় আক্রমণ করে। তাই তারা সৃষ্টিকর্তার নাম দিয়ে জুমে ফসল উৎপাদনের কাজ শুরু করেন।

ফসল কাটার পর ‘মাই কত্্চাঃম’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। জুমের নতুন ধান দিয়ে আরাও (মদ) প্রস্তুত করা হয়। তাদের জুমের চাল দেখতে লালচে। এ অনুষ্ঠানে তাদের কুষ্টিগত নাচ-গান ও বিশেষ নৃত্য, যাকে বলা হয় ‘গড়াইয়া’ নৃত্য তা পরিবেশিত হয়। মেয়েরা কৃষ্টিগত পোশাক ‘থাবিন’ পরে ঘুরে বেড়ায়, নাচ-গান করে আর আনন্দ করে। যে কোন অনুষ্ঠানে তাদের আরাও লাগবেই। আরাও বিনিময়ের মাধ্যমেই তারা একে অপরকে আশীর্বাদ করে, আশীর্বাদ যাচনা করে, আপ্যায়ন করে। কেউ মাচাংঘরে উঠলেই তাকে আরাও দিয়ে আপ্যায়ন করার রীতি রয়েছে। ত্রিপুরাদের আশীর্বাদ দান ও গ্রহণের সুন্দর কৃষ্টি রয়েছে। আশীর্বাদ গ্রহণকারী ব্যক্তি আরাও ও প্লেটে কিছু চাল ও তুলা নিয়ে এসে প্রণাম করবে। আশীর্বাদ দানকারী ব্যক্তি প্লেট থেকে হাতে কিছু চাল নিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণকারী ব্যক্তির মাথার ওপর রেখে প্রার্থনা করবে এবং বাইরে অমঙ্গলের প্রতীকরূপে ফেলে দেবে। তারপর হাতে তুলা নিয়ে তা মাথার ওপর রেখে আশীর্বাদ দেবে। তুলা হলো আশীর্বাদের প্রতীক, মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতীক। তুলা হলো উর্বরতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রতীক। মারমাদের নবান্ন উৎসবের নাম ককস্বইচাঃপোয়ে। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বলে বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারেই ককস্বইচাঃপোয়ে পালন করে থাকে। জুমে ফসল উৎপাদনের আগে বেদি তৈরি করে বুদ্ধের নিকট প্রার্থনা করে এবং ফসল কাটার পর সবাই মিলে উৎসব পালন করে।

এই নবান্ন উৎসবগুলোর দুটি দিক আছে। একটি দিক হলো ধর্মীয় দিক। সকল দয়া দানের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো। এর মধ্য দিয়ে তার কৃপা লাভ হয়। অপরটি হলো সামাজিক দিক। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা যেমন সৃষ্টিকর্তার সংোগ মিলিত হই, তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলি; তেমনি মানুষের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলি। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে সহভাগিতা করি। আনন্দ উপভোগ করি। মিলেমিশে নাচ-গানের মধ্য দিয়ে আনন্দ-উল্লাস করি। দ্বন্দ্ব-কোলাহল, হিংসা-ঘৃণা ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই।