১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিত্রকলার বিদ্রোহী গায়ক

  • আক্তারুজ্জামান সিনবাদ

বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলা জগতের অন্যতম পথিকৃৎ শিল্পী পটুয়া কামরুল হাসান। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরেই তাঁর নামটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। শুধু চারুশিল্পের ক্ষেত্রেই নয় বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিম-লেই কামরুল হাসান এক উজ্জ্বল ও অসংবাদিত নাম।

জীবনের সর্বক্ষেত্রে যেমন এদেশের শাশ্বত বাঙালী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা চেয়েছেন, তাঁর চিত্রকলাতেও চেয়েছেন বাংলার শৈল্পিক ঐতিহ্যের যথার্থতা ঘটাতে। তিনি সর্বতোভাবে একজন আধুনিক মানুষ ছিলেন, শিল্পী হিসেবেও আধুনিক শিল্পী ছিলেন। তিনি ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতা তিলজলা গোরস্থান কোয়ার্টারে জন্মগ্রহণ করেন। গোরস্থান বোর্ডের সেক্রেটারি বাবা আবদুল হাসেম গোড়া না হলেও ছিলেন রক্ষণশীল। কলকাতা মডেল এম-ইতে প্রাথমিক শিক্ষা অতঃপর রক্ষণশীলতার বিপরীত বাতাসে প্রকৃত মানুষের মতো লড়াই করে ভর্তি হলেন কলকাতা আর্ট স্কুলে। ৩০ দশকের পত্র-পত্রিকায় প্রচ্ছদ আর অঙ্গসজ্জা তাকে মুগ্ধ করে রেখেছিল, যার জন্য ১৯৩৮ সাল থেকে ৯ বছর কাটালেন আর্ট স্কুলের পরিচর্যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে নিরবচ্ছিন্নভাবে শিল্পচর্চার পাশাপাশি শিল্প আন্দোলনসহ এদেশের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও আন্দোলনের সঙ্গে তিনি আমৃত্যু জড়িত ছিলেন। সতত নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে, শিল্পকলার নানা মাধ্যমের বৈচিত্র্য অনুধাবনে, বহুমাত্রিক ভাষা সৃষ্টিতে, লোককলার স্বতঃস্ফূর্ত রেখা ও আধুনিক চিত্রকলার জ্যামিতিকে রেখার মেলবন্ধনে তিনি এমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন যা তাকে বাংলাদেশের শিল্পকলা জগতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সফল ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ১৯৩৯ সালে ব্রতচারী শিবিরে যোগদান, মণিমেলা ও মুকুল ফৌজে সংগঠকের ভূমিকা পালন, শরীর চর্চাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি কলকাতা পর্বে যেমন যুক্ত ছিলেন, তেমনি ঢাকা পর্বে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সব সাংস্কৃতিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় থাকার মধ্য দিয়ে নিজের দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনাকেই উজ্জ্বলতর করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ পুনর্গঠনে এবং গণতান্ত্রিক চেতনা প্রসারে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূ।ি গুরু সদয় দত্তের প্রছন্ন আশীর্বাদ তাকে লালিত স্বপ্নের স্বদেশী শিল্পী, পরিপূর্ণ কামরুল হাসানের দিকে নিয়ে যায়। দীর্ঘ চার দশক অনবরত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব শিল্প আঙ্গিক গড়ে তুলেছেন। আদর্শ যামিনী রায় ও গুরু সদয় দত্তের সংগ্রহ কালীঘাটের পটই তাকে ধাবিত করল পটুয়া হওয়ার চিন্তায়। তিনি আগাগোড়াই একজন জীবনধর্মী শিল্পী এবং সেখানে বিমূর্ততা বলতে গেলে কোন স্থান নেই। তিনি এতটাই জীবনধর্মী যে, তাঁর চিত্রকলার প্রধান বিষয় ছিল মানুষ এবং মানুষের আশপাশের প্রাণীজগৎ।

মানুষের ছবি আঁকতে গিয়ে তিনি পক্ষপাত দেখিয়েছেন নারীর প্রতি এবং যে নারী স্নেহময়ী, প্রেমময়ী, রূপলাবণ্যময়ী, লাস্যময়ী। গ্রাম্য নারী ও তাদের দুর্দশার ওপর তিনি অজস্র ছবি এঁকেছেন। বেশির ভাগ ছবিতেই নারীদের দলবদ্ধভাবে দেখা যায়। তিনি অঙ্কনে প্রেম ও বাস্তবের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। এই সমাজের নানা পরিবেশে গাঁয়ের সাধারণ বধূকে তিনি বিভিন্নভাবে সাজিয়েছেন যাতে লোকশিল্পের বিভিন্ন গড়ন ও বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

তাঁর ছবি সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা থেকে ভিন্ন। ছবির করণকৌশল এবং গঠনগত দিক একেবারেই আলাদা রকমের। বাংলার পটের রেখা, শখের হাঁড়ি, মাটির পুতুল ও লক্ষ্মীর সরার বেগবান রেখাকে নিজের লব্ধ জ্ঞানে ব্যবহার করেছেন। রং ব্যবহার করেছেন পটচিত্রকরদের মতো করে। মিশ্র রঙের পরিবর্তে তিনি একক রং ব্যবহারকেই প্রাধান্য দেন। তাঁর ছবির রেখা সব সময়ই আমাদের বাংলার লোকশিল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। লোকশিল্পের রচনাধারা যা পুঁথি আকারে অলংকরণ, উজ্জ্বল লাল, নীল, হলুদ, কালো ও সবুজ রঙের ব্যবহারও কামরুলের ছবিতে স্পষ্ট। তাঁর ছবি লোকচিত্রধর্মী হলেও তা একান্তই তাঁর। এখানেই তিনি স্বতন্ত্র। উজ্জ্বল রং ও বলিষ্ঠ রেখার ছবিকে অলংকরণধর্মী করলেও তা শিল্পরস বর্জিত নয়। লোকশিল্পের আলোছায়া বর্জন এবং অমিশ্র রঙের প্রাধান্যও তাঁর ছবিতে বিদ্যমান। বিষয় এবং আকারের নির্দিষ্ট গতি সমতল ভূমির ওপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গেই অলংকৃত করেছেন তিনি। যেমনটি দেখা যায় বাংলার পটচিত্রে এবং শাড়ির পাড় রচনায়। রেখা এবং আকারের পরস্পরছেদী অধিক্রমণ তাঁর ছবিতে দেখা যায়। ছবির মূল উপস্থাপনাতে তা কখনই ব্যাঘাত ঘটায় না।

তাঁর কাজে পিকাসো এবং কিউবিক ধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়। তিনি কিউবিক এবং লোকচিত্রকলার সমন্বয় ঘটিয়ে নিজস্ব এবং নতুন শৈলীর রূপ দেবার চেষ্টা করেন। সমতল রঙের ব্যবহার থেকে আবিষ্কার করলেন বাংলার লোকচিত্রের সরলতা ও সমতলভাবে রঙের ব্যবহার। পশ্চিমে পিকাসো, মাতিস, ভারতবর্ষে যামিনী রায় যেমন উপজাতীয় এবং লোককলার প্রতি দৃষ্টি ফিরিয়েছিলেন, তেমনি কামরুল হাসান বাংলাদেশের পোড়ামাটির ভাস্কর্য, লোকশিল্প ও পটের জগতে উপস্থিত হয়েছেন। যা সমতল ভূমির ওপর ফুল, পাখির-আকার নকশার রূপ নিয়ে বিষয়ের পরিবেশগত অনুভূতিতে কাব্যিক ছন্দ দুলিয়ে তোলে।

জয়নুল আবেদিনকে অনুসরণ আর যামিনী রায়ের লৌকিক চেতনায় তিনি বাংলার লোকশিল্পের চেতনা ও সৌন্দর্যের প্রতি ঝুঁকেছিলেন। তাইতো তাঁর কাজে যামিনী রায় ও জয়নুল আবেদিনের কাজের অনেক মিল পাওয়া যায়। জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে তাঁর মৌলিক পার্থক্য ছিল শিল্পাচার্য বাস্তববাদী আর কামরুল হাসান প্রধানত রোমান্টিক। যামিনী রায়ের রেখার মতো তিনি রেখা টেনেছেন। অথবা বলা যায় কামরুল হাসানের রেখার ঐতিহ্য আরও প্রাচীন, অজন্তার গুহা প্রাচীরে যার অস্তিত্ব। মুঘল কিংবা রাজপুত চিত্রকলার রেখার সঙ্গেও তাঁর রেখার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এদেশের কমার্শিয়াল শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

তাঁর আঁকা বেশকিছু ছবিতেই তিনি দেশ প্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন। শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদের আগুন কিভাবে ছড়িয়ে দিতে হয় বিষয়টি তিনি ভালভাবেই আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। শিল্পী হিসেবে সমাজে সচেতনতা তৈরিতে এখানেই তাঁর সার্থকতা। একাত্তরের অগ্নিঝরা সেই দিনগুলোতে বাঙালী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে আর সারা বিশ্বকে সচেতন করতে আঁকলেন তাঁর সেই বিখ্যাত পোস্টার ‘করষষ ঃযবংব উবধসড়হং’ (এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে) শীর্ষক ইয়াহিয়া খানের সেই বীভৎসতার প্রতীক মুখ থেকেই তিনি স্পষ্টত তাঁর চিত্রকলার রাজনৈতিক বক্তব্য সংযোজিত করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা তাঁর অন্যতম অবদান। রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে ছুটে গেছেন, রং-তুলি দিয়ে যুদ্ধ করে গেছেন আজীবন। স্বৈরশাসকের সেই ক্রান্তিদিনে দিলেন আরেক যুগান্তকারী পোস্টার ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে’।

অস্থির আজন্মার কালে যে কৃষকরা অনিন্দ ফসল তুলে আনে বিমুখী ধরণী হতে, যারা উদাহরণ হয়ে জানিয়ে যার স্বপ্নের জন্য লড়ে যাও আমৃত্যু, তাদেরই একজন কামরুল হাসান।