১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইসাবেল আলেন্দের ‘দ্য জাপানিজ লাভার’ বইটি নিয়ে লিখেছেন আরিফুর সবুজ

ভালোবাসা কি ফুরিয়ে যায়? পেলাম না, তাই বলে কি হারিয়ে যায় ভালোবাসা? না, হারায় না। ভালোবাসা টিকে থাকে। অন্তরের গহীনে যুগ যুগ ধরে গোপনে লালিত হতে থাকে ভালোবাসা। বাস্তবতার বেড়াজালে হয়তো সেই ভালোবাসা পেখম মেলে হাজির হতে পারে না। তবে উঁকি-ঝুঁকি মারার চেষ্টা যে করে না, তা কিন্তু নয়। ভালোবাসার ধর্মই এই। এই বিষয়টিকেই উপজীব্য করে ইসাবেল আলেন্দে লিখেছেন ‘জাপানিজ লাভার’ বইটি। সেই ১৯৩৯ সালের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামায় যখন ভীতসন্ত্রস্ত সব, তখনই প্রেমের বীজ রোপিত হয়েছিল দুজন কিশোর-কিশোরীর মাঝে। সেই প্রেমের পরিণতি বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি। জীবন বাস্তবতার কাছে হেরে তাদের দু’জনের পথ আলাদা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে আলাদা হয়ে যায়নি তাদের ভালোবাসার সত্তা। সত্তর বছর পরেও আলমা তার প্রেমিককে ঠিক আগের মতোই অনুভব করে। অদম্য সেই ভালোবাসারই চিত্রায়ন করেছেন আলেন্দে।

পোল্যান্ডের ম্যান্ডেল পরিবারের সহায়-সম্পদের কমতি ছিল না। ঝলমল আনন্দে জীবনও কাটছিল বেশ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাদের সেই আবেগ আনন্দঘন জীবনকে সন্ত্রস্ত করে তোলে। ম্যান্ডেল বুঝতে পারেন পোল্যান্ড তাদের জন্য নিরাপদ নয়। কিন্তু বিশাল ব্যবসায়-বাণিজ্য ছেড়েও যাওয়া যায় না। তাই তিনি ছেলে মেয়েদেরকে নিরাপদে রাখার জন্য অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আলমা বেলাস্কোর তখনও শিশু। সেই শিশু বয়সেই তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল সমুদ্রতীর ঘেঁষা সানফ্রান্সিসকো শহরে তার খালা-খালুর কাছে। বাচ্চা মেয়েটি বাবা-মা ছেড়ে এসে কেবলই কাঁদত। ওয়ারড্রোবে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদত বাবা, মা আর ভাইয়ের জন্য। খালা-খালু শিশুটিকে নিজেদের মেয়ের মতোই আদর করতো। খালাতো ভাই নাথানিয়েল ব্যালাস্কো ছিল তার খেলার সঙ্গী। তবে ততদিন পর্যন্ত শিশুটির কান্না থামেনি, যতদিন না সে খুঁজে পেয়েছিল ইচিমেই ফুকুদা নামের আরেক খেলার সঙ্গীকে।

এই সঙ্গীটি ছিল খালা-খালুদের বাগানের মালির ছেলে। তারা ছিল জাপানি আমেরিকান। ইচিমেইয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতেই হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। কৈশোরে পর্দাপণ করলে বন্ধুত্ব ভালোবাসায় পরিণত হয়। দু’জনের হৃদয়ে অজানা ভালোলাগার ঢেউ আছড়ে পড়ে। নিত্য দেখা হলেও চিঠি চালাচালির মাঝে খুঁজে পেয়েছিল অনিন্দ্য এক সুখ। দু’জনে মিলে দেখা শুরু করে প্রজাপতির ডানায় আঁকা রঙ্গিন স্বপ্ন। দুর্ভাগ্য, তাদের এই প্রাণোচ্ছল ভালোবাসার জোয়ারে ভাটা হয়ে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাপান যখন পার্ল হার্বার আক্রমণ করে, তখনই বদলে যায় তাদের জীবনের দৃশ্যপট। ইচিমেইকে পরিবারসহ নিয়ে যাওয়া হয় আমেরিকার সরকারী ক্যাম্পে। পুরো দেশে যত জাপানি আমেরিকান ছিল তাদেরকে ‘ইন্টারমেন্ট’ নামের ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। কারণ, আমেরিকানরা তখন প্রত্যেক জাপানিকেই অতি সন্দেহের চোখে দেখত। সেই ক্যাম্পের দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়েছিল ইচিমেইয়ের পরিবারকে। নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে ইচিমেইয় যখন ক্যাম্পে জীবন কাটাচ্ছিল, তখন বিশাল প্রাসাদে থেকেও আলামা তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছিল। ইচিমেইয়ের ভালোবাসা তাকে ব্যাকুল করে তুলেছিল। অহোরাত্র ইচিমেইয়ের স্মৃতিতে ডুবে ছিল আলামা। কিন্তু জীবন তো আর একভাবে যায় না কিংবা নিজের ইচ্ছানুযায়ীও জীবন সবসময় চলে না। অনেক সময় পরিবারের চাওয়াকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে, পরিবারের সদস্যদের সুখের জন্য নিজের ভালোবাসাকে বির্সজন দিতে হয়। এই বির্সজন মানে মনের গহীনে অজানা অন্ধকারে পাঠিয়ে দিতে হয় লালিত রঙ্গিন স্বপ্নময় ভালোবাসাকে। আলামাকেও তাই করতে হয়েছে।

খালাতো ভাই নাথানিয়েল ব্যালাস্কোকে বিয়ে করতে হয়েছিল তাকে। যুদ্ধ শেষে ইচিমেইয়ের পরিবার ফিরে এসেছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দু’জনকেই লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল তাদের ভালোবাসার কথা। অনেক বার দু’জনে চোখাচোখি হয়েছিল, সেই চোখে দু’জনে দু’জনার জন্য আগের ভালোবাসাই দেখতে পেত। কিন্তু অন্য কেউ তা জানত না। আলামার বয়স যখন আশি, তখনও সে ঠিক আগের ভালোবাসাই অনুভব করে ইচিমেইয়ের প্রতি। আলামা তার ভালোবাসার গল্প বলে যায় তার কেয়ারটেকার আইরিনা বাজিল্লির কাছে। ইসাবেলা আলেন্দে তাঁর ‘জাপানিজ লাভার’ বইটিতে আলামা প্রধান চরিত্র হিসেবে দাঁড় করালেও আইরিনাকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। লার্ক হাউস নামের একটি নার্সিং হোমে আইরিনার সঙ্গে আলামার পরিচয় হয়। আইরিনাকে আলামা পছন্দ করে ফেলেন। তাই নিয়োগ দেন নিজের কেয়ারটেকার হিসেবে। আইরিনার অতীত জীবন ছিল তীব্র যন্ত্রণার। সে অতীত জীবনের দুঃসহ সময়কে অতিক্রান্ত করতে চায়। সেই অনুপ্রেরণা আইরিনা খুঁজে পায় আলামা ব্যালেস্কোর মাঝে।

দুই নারীর জীবনের দুঃখগাথা এবং ভালোবাসার অমিয়ধারার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন ইসাবেল আলেন্দে। তাইতো নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন, ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল, এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি, কসমোপলিটন, হার্পার বাজার, পাবলিশার্স উইকলি, হাফিংটন পোস্টসহ খ্যাতিমান সকল সাহিত্য সাময়িকীর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘দ্য জাপানিজ লাভার’ বইটি। পাঠকের হৃদয় জয় করা বইটি তাই অবস্থান করছে নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের তালিকার শীর্ষে।