২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোটি টাকার সফটওয়ার এখন গলার কাঁটা

  • আবারও যান্ত্রিক ত্রুটি

অপূর্ব কুমার ॥ ধুমধাম করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নতুন সফটওয়ার চালুর পরে সার্ভার সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। নামীদামী প্রতিষ্ঠানের কাক্সিক্ষত সফটওয়ারটি বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। একইসঙ্গে ব্রোকারেজ হাউসসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে এই সফটওয়ারটি। মাঝেমধ্যেই দেরিতে লেনদেনসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে প্রধান বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে।

জানা গেছে, গত রবিবারে সার্ভার জটিলতায় ডিএসইতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে লেনদেন শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকালে ডাটা আপলোড না হওয়ার কারণে ডিএসইর অনেক ব্রোকারেজ হাউসে লেনদেনে বিঘœ ঘটে। ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিএসইর সার্ভারে গ্রাহকের শেয়ার লিমিট এবং ক্যাশ লিমিটেড তথ্য আপলোড করতে গিয়ে তারা বিপত্তির মধ্যে পড়েন। ক্যাশ লিমিট আপলোড করতে পারলেও শেয়ার লিমিট আপলোড করতে পারছিলেন না। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসে গ্রাহকরা শেয়ার ক্রয় করতে পারলেও শেয়ার বিক্রি করতে পারছিলেন না। কমপক্ষে ৫০টি ব্রোকারেজ হাউস এ ধরনের সমস্যার মুখে পড়লেও ডিএসই নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে দশটায় লেনদেন শুরু করে দেয়। এতে ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা ও গ্রাহকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সার্ভার সমস্যার কারণে লেনদেনে বিঘœ ঘটা একটি ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা বলেন, বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে আমরা ডাটা আপলোড করতে সমর্থ হয়েছি এবং স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হয়েছে। কিন্তু এক ঘণ্টা আমাদের গ্রাহকরা শেয়ার বিক্রি করতে পারেননি। এতে তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন। তিনি বলেন, এর আগেও ডিএসইর সার্ভারে ত্রুটি দেখা দেয়ায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর লেনদেন হয়েছিল। বৃহস্পতিবার একই ধরনের সমস্যা সত্ত্বেও ডিএসই লেনদেন শুরু করে দেয়।

জানা গেছে, গত এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পাঁচবার কারিগরি ত্রুটির শিকার হয়ে লেনদেন বন্ধ রাখতে হয় লেনদেন। ডিএসইর এ কারিগরি ত্রুটির কারণে বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সব মহল থেকে এ নিয়ে ডিএসই কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলেও প্রতিষ্ঠানটি এ সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান করতে পারছে না। ত্রুটি সংশোধনের পর কয়দিন যেতে না যেতেই ফের একই ঘটনা ঘটছে।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ লোক ছাড়া চলছে বিশাল এই বাজারের তথ্য প্রযুক্তি (আইটি) বিভাগ। ফলে বার বার লেনদেনে বিঘœ ঘটছে। চিফ টেকনিক্যাল অফিসারকে (সিটিও) কর্মকর্তা ছাড়াই চলছে ডিএসই। জানা গেছে, ডিএসইর তথ্য প্রযুক্তি (আইটি) বিভাগেও খুব বেশি দক্ষ লোক নেই। ফলে দফায় দফায় একই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু বিষয়গুলো ব্যবস্থাপনা পরিচালক গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

জানা গেছে, ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ আইটি বিভাগ নিয়ে খুবই বিরক্ত। একজন স্বাধীন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান এমডিকে এ বিষয়ে বারবার উদ্যোগ নিতে বলেও কাজ হয়নি। বার বার লেনদেনে বিঘœ ঘটছে। শুধু তাই নয়, এক সপ্তাহে দ্বিতীয় বারের মতো এমন সার্ভার বিকলের ঘটনা প্রথম ঘটল। যেটি বাজারের জন্য খুবই হতাশার। এই সব কারণেই বাজারের স্বাভাবিকতায় বাধা ঘটে।

এর আগে ১২ আগস্ট ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট পরে শুরু হয়েছে লেনদেন। কারিগরি ত্রুটির কারণে ডিএসইর লেনদেন বিঘœ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের ১৩ এপ্রিল লেনদেন শুরুর ৫ মিনিটের মধ্যে ডিএসইর সার্ভার থেকে ব্রোকারেজ হাউসের সার্ভার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ২০১২ সালের ৫ ও ৯ ডিসেম্বর এবং ২০১৩ সালের ২০ মার্চ নতুন কোম্পানির লেনদেনের শুরুর দিনেও লেনদেন বিঘিœত হয়েছিল। এছাড়া চলতি বছরের ২৪ ও ২৫ মে দুই দিনও লেনদেন চরম বিঘœ ঘটেছিল। এমন ঘটনায় ডিএসইর ম্যানেজমেন্টের ওপর ব্রোকারেজ হাউস এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ চরমে। এ ব্যাপারে কোন ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে বিএসইসিকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

ট্রেডিং সফটওয়ার ॥ অটোমেশনের নামে সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেন সফটওয়্যার আধুনিকায়ন করেছে ডিএসই। ১০ বছরব্যাপী প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকার উপরে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক একজন প্রেসিডেন্টের সম্পৃক্ততা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কেনা হয়েছে এ সফটওয়্যার। এক্ষেত্রে ট্রেডিংয়ের প্রতিটি সদস্য হাউস থেকে টাকা নেয়া হয়। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত প্রতিষ্ঠান নাসডাক এবং ফ্লাক্স ট্রেড এ সফটওয়্যার দিয়েছে। এই সার্ভারের মূল স্টেশন ফ্রান্সের প্যারিসে। সাবস্টেশন সিঙ্গাপুরে। ফলে কোনো সমস্যা হলে প্যারিস থেকে সমাধান করতে হচ্ছে।

অদক্ষ নিয়ন্ত্রক ॥ স্বাভাবিকভাবে অটোমেশনের কন্ট্রোল প্যানেলে আইটি বিশেষজ্ঞ রাখতে হয়। কিন্তু নাসডাকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে চুক্তিতে চিফ টেকনিক্যাল অফিসারকে (সিটিও) কর্মকর্তাকে কন্ট্রোল প্যানেলেই রাখা হয়নি। এ কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন। এরপর আর নতুন কোন সিটিও নিয়োগ দেয়া হয়নি।

প্রকল্প ব্যয় ॥ প্রাথমিকভাবে ৩২ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে সার্ভার নেটওয়ার্কের ১৩ কোটি ৩৭ লাখ, নেটওয়ার্ক ইক্যুপমেন্ট ৫ কোটি ৪২ লাখ, এএমসি নেটওয়ার্ক ৫৫ লাখ ৫০ হাজার, ডাটা সেন্টার ইক্যুপমেন্ট ১ কোটি ৬৮ লাখ, টেস্ট এ্যান্ড সাপোর্ট ৭৬ লাখ ৬০ হাজার, প্রশিক্ষণ ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, রিক্যুরিং ইস্যু ৯ লাখ ৯৮ হাজার, লিগ্যাল ইস্যু ১৫ লাখ এবং অন্যান্য ৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, এত টাকা খরচ করে যে সফটওয়্যার কেনা হলো, তা বিনিয়োগবান্ধব নয়। কারণ আমার নিজের চোখে দেখছি, ৮শ’ কোটি টাকার উপরে লেনদেন হলে আর অর্ডার নিতে চায় না। ফলে বিষয়টি বিএসইসিকে তদন্ত করে দেখতে হবে।