২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের সূচনা

(২৭ নবেম্বরের পর)

৩১ জানুয়ারি বার লাইব্রেরি হলে সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক হলো যাতে সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী। নতুন করে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো এবং তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে ২১ ফেব্রুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ হবে এবং প্রাদেশিক পরিষদের কাছে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার দাবি পেশ করা হবে। ২২ তারিখ কি কারণে নির্দিষ্ট হলো তার একটি ব্যাখ্যা আছে। ২০ তারিখে প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশন শুরু হবার কথা ছিল তাই ২১ তারিখই নির্ধারিত হয় প্রতিবাদের দিন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বা কার্যকরী কমিটি যেটা প্রতিষ্ঠা পেল তার সদস্য ছিল ২৮ জন। বদরুদ্দিন উমর আজাদ পত্রিকার সূত্র ধরে বলেন যে, সদস্যসংখ্যা ছিল ৪০ কিন্তু কোন সময়েই ৪০ জনের নাম নির্দিষ্ট করা যায়নি। আটাশ সদস্য ছিলেন নিম্নোক্ত (১) আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী, (২) খেলাফতের রাব্বানির আবুল হাশেম, (৩) আওয়ামী লীগ সম্পাদক শামসুল হক, (৪) সৈনিকের সম্পাদক তমদ্দুন মজলিশের আবদুল গফুর, (৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম, (৬) আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, (৭) শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আইনজ্ঞ কামরুদ্দিন আহমদ, (৮) আওয়ামী মুসলিম লীগের সংসদ সদস্য খয়রাত হোসেন, (৯) আওয়ামী মুসলিম লীগের সংসদ সদস্য আনোয়ারা খাতুন, (১০) নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী মুসলিম লীগের আলমাস আলী, (১১) নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী মুসলিম লীগের আবদুল আওয়াল, (১২) রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সৈয়দ আবদুর রহিম, (১৩) যুবলীগের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা, (১৪) যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ, (১৫) অল ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সামসুল হক (টেনু) চৌধুরী, (১৬) ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান, (১৭) ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কাজী গোলাম মাহবুব যিনি হলেন পরিষদের আহ্বায়ক, (১৮) সিভিল লিবার্টি কমিটির মীর্জা গোলাম হাফিজ, (১৯) সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের সহ-সভাপতি এম. মুজিবুল হক, (২০) সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত হোসেন চৌধুরী, (২১) ফজলুল হক হল ইউনিয়নের সহ-সভাপতি শামসুল আলম, (২২) ফজলুল হক হল ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক খান (২৩) মেডিক্যাল কলেজ ইউনিয়নের সহ-সভাপতি গোলাম মাওলা, (২৪) ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের এ. এস. এন. নুরুল আলম, (২৫) ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মোহাম্মদ নুরুল হুদা, (২৬) মুগলটুলির পূর্ব বাংলা কর্মী শিবিরের শওকত আলী, (২৭) সুপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সংগ্রাম কমিটির আবদুল মতিন এবং (২৮) অল ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আখতার উদ্দিন আহমদ। (আমার ইংরেজী গ্রন্থ ঝঃধঃব খধহমঁধমব গড়াবসবহঃ রহ ঊধংঃ ইবহমধষ ১৯৪৭-১৯৫৬ সালে ঢাকার ইউপিএল প্রকাশিত পৃষ্ঠা ৭১ ও ৭৫ থেকে প্রাপ্ত তথ্য)। এদের কয়েকজন ছাড়া সবাই ছিলেন ছাত্রনেতা। বাস্তবেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শেষ পর্যন্তই ছিল একটি ছাত্র আন্দোলন। অবশ্য তার সুযোগ নিয়ে অনেক মুসলিম লীগ নেতা তাদের রাজনৈতিক জীবন এগিয়ে নিয়ে যান আবার কেউ কেউ একেবারেই বরবাদ হয়ে যান।

একই সময়ে বিভিন্ন জেলা শহরেও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালে যারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তারাই স্বাভাবিকভাবে এইসব সংগ্রাম কমিটিতে বিভিন্ন দায়িত্ব পান। সিলেটে তখন এর আহ্বায়ক হিসেবে নিযুক্ত হলেন প্রাক্তন ছাত্রনেতা পীর হাবিবুর রহমান, যিনি পরবর্তীকালে ন্যাপের একজন জাতীয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ঢাকায় একুশের প্রস্তুতি হিসেবে ৪ ফেব্রুয়ারি আর একটি সভা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তারপর একটি শোভাযাত্রা সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। এইসব প্রতিবাদ সত্ত্বেও সাধারণ জীবনপ্রবাহ কিন্তু স্বাভাবিক ছিল। ১২ তারিখে যেমন সলিমুল্লাহ হল ইউনিয়নের কার্যকরী পরিষদের অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি ২০ তারিখে প্রাদেশিক ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট শুরু হয় এবং একই দিনে ঢাকা কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঘোষণা করল যে, ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি হবে পতাকা দিবস অর্থাৎ এইসব দিনে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের জন্য চাঁদা আদায় করা হবে এবং স্বেচ্ছাসেবীদের উৎসাহিত করা হবে। সরকারের ঔদ্ধত্য ফণাও কিন্তু একসঙ্গে পরিলক্ষিত হয়। ১৩ তারিখে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তার মালিক হামিদুল হক চৌধুরী এবং সম্পাদক আব্দুস সালাম গ্রেফতার হন। সহসা ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করল যে, ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ছাত্র সমাবেশ ও ৫ জনের বেশি মানুষের শোভাযাত্রার ওপর ১৪৪ ধারার ক্ষমতাবলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। ছাত্রমহলে মনে হলো এই হুকুমটি একটি উদ্দেশ্যমূলক প্ররোচনা। বিভিন্ন মহলে আগামীকাল কি হবে তা নিয়ে আলোচনা-কানাঘুষা চলল। যেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জড়ো হলো সেখানেই সিদ্ধান্ত হলো যে, আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যে প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়েছে সেখানে সকলেই দলবেঁধে যোগ দেবে। অনেকেই আশঙ্কা করে শোভাযাত্রা বের হলে পরে পুলিশ বাধা দেবে এবং ছাত্রদের গ্রেফতার করবে। তখন একটি রেওয়াজ ছিল যে, গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের ঢাকা শহরের কয়েক মাইল দূরে নিয়ে টাকা-পয়সা সব জব্দ করে ছেড়ে দিত। শাস্তি ছিল যে, তারা পায়ে হেঁটে কষ্ট করে নিজেদের আস্তানায় ফিরে আসবে। ২০ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারার অধীনে জারি করা নিষেধাজ্ঞাটি কিন্তু ছাত্রমহল ভাল চোখে দেখল না। সংগ্রাম পরিষদ তড়িঘড়ি করে একটি সভা ডাকল যেখানে ছাত্রমহল থেকে এই নিষেধাজ্ঞা না মানার দাবি উঠল। সংগ্রাম পরিষদের এই সভায় সভাপতিত্ব করেন আবুল হাশেম। সেখানে ব্যাপক আলোচনার পরে ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হলো যে, সংগ্রাম কমিটি ১৪৪ ধারার অন্যায় নিষেধাজ্ঞা ভাঙ্গবে না। তবে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যে সভা করবে সেখানে এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেবেন সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সামসুল হক। সেখানে প্রধান যুক্তি ছিল যে, প্রদেশে অদূর ভবিষ্যতে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হবে এবং কোনমতেই সেই নির্বাচনের পরিবেশ বিঘিœত করা উচিত নয়। এজন্য সরকারের সঙ্গে ঝগড়ায় যাওয়াটা পরিষদ যথাযথ মনে করে না। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্রনেতারা সকলেই অবস্থান নেন। শুধুমাত্র মোহাম্মদ তোয়াহা তার বক্তব্যে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কথা বললেও তার দলের হুকুমে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেন। এজন্য মোহাম্মদ তোয়াহাকে অনেক দিন অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয় এবং তার প্রতি ছাত্রদের আস্থা অনেকটা কমে যায়।

২১ ফেব্রুয়ারিতে সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা শোভাযাত্রা করে কলা ভবনের আমতলায় সমবেত হতে শুরু করে। আমরা কতিপয় বন্ধু দলবেঁধে ১০টার আগেই কলাভবনের দিকের হাঁটতে শুরু করি। প্রায় সকলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, সেদিন সাইকেল ও পকেটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা-পয়সা নেয়া সঠিক হবে না। অর্থাৎ আমরা গ্রেফতার হয়ে শহরের বাইরে তেজগাঁও বা গাজীপুরে ছাড় পাওয়ার আশা করি। আমতলার সভাটি সম্ভবত ১১টায় শুরু হয়। তখন আমরা জানতাম না কিন্তু পরে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, এই সভাটি কিভাবে পরিচালনা করা হবে সেই বিষয়ে ফজলুল হক এবং ঢাকা হলের পুকুর পাড়ে ১১ জন ছাত্রনেতা সমবেত হয়ে আগেভাগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন। এই ১১ জন ছাত্রনেতা ছিলেন গাজীউল হক, হাবিবুর রহমান শেলী, মোহাম্মদ সুলতান, এম আর আখতার মুকুল, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মুমিন, এস এ বারী এটি, সৈয়দ কামরুদ্দিন শহুদ, আনোয়ারুল হক খান, মনজুর হোসেন এবং আনোয়ার হোসেন। (এই তথ্যটি পাওয়া যায় অলি আহাদের রচিত ‘জাতীয় রাজনীতি- ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ যে বইটির তৃতীয় সংস্করণ খোশরোজ কিতাব মহল ১৯৯৭ সালে প্রকাশ করে)। আগে থেকেই নির্ধারিত ছক অনুযায়ী সভায় এম আর আখতার মুকুল প্রস্তাব করলেন যে, গাজীউল হক এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন এবং এই প্রস্তাবটি কামরুদ্দিন শহুদ সমর্থন করলেন। সভাপতির অনুরোধে জাতীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার জন্য সামসুল হক বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন। সামসুল হকের বক্তৃতা নানাভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে শেষ হলো। তখন আব্দুল মতিন বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে বললেন যে, সংগ্রাম কমিটি যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে তা হলোÑ বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাটি কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং তারা যদি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত না মানে তাহলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে। তারপরে আরও কিছু বক্তব্য আসে এবং সভাটিতে তেমন শৃঙ্খলা বজায় থাকেনি। অবশেষে ছাত্রনেতা আবদুস সামাদ (পরবর্তী সময়ে আবদুস সামাদ আজাদ নামে পরিচিত) প্রস্তাব করলেন যে, ছাত্রেরা ১০ জন করে দলবেঁধে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে রাস্তায় নামবে এবং রাস্তায় পুলিশের মোকাবেলা করবে। এই সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হলে সভা সমাপ্ত হয় এবং দলবেঁধে রাস্তায় নামবার প্রস্তুতি শুরু হয়। পরিকল্পনামত প্রথম দিকে যারা আইন অমান্য করে রাস্তায় নামবেন তাদের তালিকা প্রস্তুত হতে থাকে। কিন্তু এই তালিকা প্রণয়ন মোটেই এগুতে পারল না। শুধু প্রথম ২/৩ দলেই তা সীমাবদ্ধ রইল। প্রথম দলে নেতৃত্ব দিলেন শেষবর্ষ এমএ’র ছাত্র (যারা এরই মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছিলেন) হাবিবুর রহমান শেলী এবং মেয়েদের থেকে সাফিয়া খাতুন (পরবর্তীকালে কোন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা)। পুলিশ যখন লাঠিচার্জ করতে শুরু করল এবং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে টিয়ার গ্যাস ছুড়তে শুরু করল তখন কিন্তু দলবেঁধে রাস্তায় নামার কার্যক্রমও বাতিল হয়ে গেল। যে যেভাবে পারে দলবেঁধে অথবা একা রাস্তায় নামতে শুরু করল এবং লক্ষ্য হলো মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাকে পৌঁছে যাওয়া। সকলে জানত যে, আসল কাজটি হলো যখন অপরাহ্ণে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে তখন সংসদ সদস্যের কাছে ছাত্রদের দাবিটি পেশ করা। চলবে...