২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুকুরগুলো দখল করে ভরাট

  • বগুড়ায় নির্মিত হয়নি বড় ধরনের আগুন নেভানোর জরুরী জলাধার

সমুদ্র হক ॥ অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা নগরী বগুড়ায় কোথাও বড় ধরনের আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সীমিত পানি শেষ হয়ে গেলে জরুরী প্রয়োজনে দ্রুত পানি পাওয়ার আধার নেই। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদী কার্যত মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। শহরের পুকুরগুলো কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ভরাট করা হয়েছে। তার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন ও মার্কেট। হাতেগোনা দুয়েকটি পুকুর যাও আছে, তাও দিনে দিনে প্রভাবশালীদের বেদখলে চলে যাচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বগুড়া শহর কমার্শিয়াল নগরীতে পরিণত হওয়ার পালায় অগ্নিনির্বাপণের সুবিধার্থে হাতের কাছেই পানির আধার পাওয়ার জন্য নগরীতে কয়েকটি ওয়াটার হাইড্রেন্ট (ভূগর্ভস্থ জলাধার) নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছিল। তা তো হয়ই-নি দিনে দিনে শহর সম্প্রসারিতই হচ্ছে। পৌর এলাকার আয়তন পাঁচগুণ বেড়ে গেছে। শহরের প্রধান দুটি রাস্তা চওড়া। বাকি সকল রাস্তা ও ফিডার রোড পরিসর নয়। এর মধ্যেই ঘিঞ্জির মতো বহুতল বাড়িঘর, একের পর এক আধুনিক শপিং মল, শো-রুম নির্মিত হচ্ছে। এ অবস্থায় শহরের ভেতরে বাণিজ্যিক ভবন মার্কেট ও বাসাবাড়িতে আগুন লেগে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা নেভানো কঠিন হয়ে পড়ে। অবস্থা এমনই যে, অনেক গলিপথ ও ফিডার রোডের ভেতরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতেও বেগ পেতে হয়।

এ ছাড়াও শহরের শাহ্ ফতেহ আলী বাজার, নিউমার্কেট, রাজাবাজার, চুড়িপট্টি, কাঁঠালতলা এলাকা, বড়মসজিদ এলাকা, মেরিনা রোডসহ কয়েকটি মার্কেট ভয়ানক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এলাপাতাড়িভাবে যেসব বহুতল ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে সেখানেও কোন জলাধারের ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে বেশিরভাগ বহুতল ভবনে মাটির নিচে গ্যারেজের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। লিফট তো আছেই। সবই আধুনিকায়ন হচ্ছে অথচ ব্যক্তি উদ্যোগেও জলাধার নির্মিত হচ্ছে না। ভয়াবহ অগ্নিকা-ে দ্রুত আগুন নেভানো বা নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে যারপরনাই ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

ফায়ার সার্ভিসের এক হিসাবে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে জেলায় প্রায় নয় শ’ অগ্নিকা-ের ঘটনায় অন্তত একুশ কোটি টাকার সম্পদ পুড়েছে। এ হিসাব সরকারী। তবে এর বাইরেও ঘটনার পরের হিসাবেও বড় অঙ্কের অর্থের সম্পদ পুড়েছে। কাছে জলাধার থাকলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমত। এখনই জলাধার নির্মিত না হলে আগামীতে বড় আগুনে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বেÑ এমন মন্তব্য ফায়ার সার্ভিসের এবং সুধীজনের।

বছর ছয়েক আগে (২০০৯ সালে) ফায়ার সার্ভিস শহরের ভেতরে নিদেনপক্ষে দশটি জলাধার জরুরীভিত্তেতে নির্মাণের পরামর্শ দেয়। জেলা প্রশাসনের উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির বৈঠকে জলাধার নির্মাণের জোর সুপারিশ করে। একই সঙ্গে বহুতল ভবন, শো-রুম, শপিং মল, ডিপার্টমেন্ট শপ মার্কেটগুলোতে জরুরী প্রয়োজনে অন্তত এক শ’ বর্গফুট করে জলাধার নির্মাণের পরামর্শ দেয়া হয় এবং সুপারিশও করা হয়। বাস্তবতার আলোকে যুক্তি দেখানো হয়, বড় অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির পানি ফুরিয়ে গেলে রিচার্জ করার সময় পর্যন্ত ওই সব জলাধার থেকে পানি টেনে নেভানোর কাজ চালু রাখা যাবে। এ সুপারিশটি কয়েক দফায় উত্থাপন করা হয় জেলা প্রশাসনের সমন্বয় কমিটির সভায় এবং বিভিন্ন ফোরামে।

এদিকে শহরের অভ্যন্তরে এ্যাডওয়ার্ড পার্কের ভেতরে একটি পুকুর আছে। রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিমে যে বড় পুকুর ছিল তা ভরাট করেছে প্রভাবশালী এক চক্র। এ পুকুরটি রেলের অধীনে। নিয়মের কোন তোয়াক্কা না করেই তা ভরাট করা হয়। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী কোন পুকুর ভরাট করতে হলে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতির প্রয়োজন। বগুড়ার শতাধিক পুকুর ভরাট করা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই। একটা সময় শহরের বড় অগ্নিকা-ে ফায়ার সার্ভিসের পানি ফুরিয়ে গেলে পুকুরের পানি নেয়া হতো। বর্তমানে সেই পথ রুদ্ধ। জলাধার না থাকেল কী হয় তার প্রমাণÑ দুই বছর আগে (২০১৩) ডিসেম্বরের একটি ঘটনা। ওই দিন রাজাবাজারের পাইকারি আড়তে বড় ধরনের আগুন লাগে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের দুটি গাড়ির পানি ফুরিয়ে গেলে কাছাকাছি কোথাও পানি না পেয়ে রিচার্জের জন্য অফিসে যেতে হয়। ততক্ষণে আগুনে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এ ধরনের অনেক ঘটনাই আছে। সাধারণত চড়া মৌসুমে আগুনের ঘটনা বাড়ে। তবে বর্তমানে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের শর্টসার্কিট, গ্যাসের চুলাসহ নানা কারণে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় শহরে জলাধার নির্মাণ জরুরী হয়ে পড়েছেÑ সরাসরি এমন মন্তব্য ফায়ার সার্ভিসের। এদিকে বহুতল ভবনের মালিক ও প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ীরা জলাধার নির্মাণের গুরুত্ব অনুভব করেন, তবে এগিয়ে আসছেন না। প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ নীরব।