২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হাতেখড়ি পাঠশালা ॥ বেড়ায় ঘেরা খড়ে ছাওয়া ঘর

পাঠশালা, শিশুশিক্ষা, কর কর কর কর খর খর খর খর... পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল কাননে কুসমকলি সকলি ফুটিল... বারো মাস তিথি যত একে একে হয় গত... এক কড়া পোয়া গ-া দুই কড়া আধা গ-া... মনের দামের বামে ইলেক মাত্র দিলে... এইসব শব্দ ও কথা প্রজন্মের কাছে একেবারেই অপরিচিত। প্রবীণ ও মধ্যবয়সীরা স্মৃতির পাতা মেলে ধরলে ছায়াছবির ফ্রেমের মতো একের পর এক সাজানো দিনগুলি চলে আসে। স্মৃতির এই পাতাগুলো আবির মেখে রং ছড়ায়, যেন বিবর্ণ হতে দেয় না মণিকোঠায়।

একটা সময় গ্রামের পাঠশালা ছিল হাতেখড়ির অধ্যায়। এই পাঠশালাতেই শুরু হতো বর্ণমালা শেখার পাঠের সঙ্গে স্লেট পেনসিলে লেখা। মদন মোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগ ও ধারাপাত বই দিয়ে শুরু জীবনের প্রথম পাঠ সঙ্গে নিয়ে চলার পথ। পাঠশালা বলতে পাকা ঘরের কথা ভাবনাতেও আসেনি। কোথাও চাটাই ও বেড়ায় ঘেরা খড়ে ছাওয়া ঘর। খুব বেশি হলে টিনের চালায় বেড়ায় ঘেরা ছোট্ট ঘর। এই ঘরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাদুর বিছিয়ে বসতে দেয়া হতো শিশু শিক্ষার্থীদের। কালেভদ্রে কোথাও শুধু বেঞ্চ। হাইবেঞ্চ ছিল না। ছোট্ট টেবিলের পিছনে হাতলওয়ালা চেয়ারে বসতেন গুরুমশাই। হাতে তার বেত সঙ্গী। ব্লাক বোর্ড ঝুলানো থাকত। চকে হাতমাখা। গ্রীষ্মে গাছতলার বাতাসে এবং শীতে মিঠা রোদে শিক্ষার্থীদের বসিয়ে গুরুমশাই হাতে বেত নিয়ে বলতেন ‘এই ছেলেরা পড় একেককে এক দুই এককে দুই...।’ কোরাসের সুরে শিশুরা নামতা পড়েছে। শিশুশিক্ষার স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ পরিচয়ের পর সহজে বাক্য তৈরিতে পড়ানো হতো কর কর কর কর খর খর খর খর গড় গড় গড় ঘড় ঘড়...। এই পাঠের সময় শিশুদের অনেকে হেসে লুটোপুটি খেলে গুরুমশাইয়ের স্নেহের সুরে শাসনের পর চুপ হয়ে যেত। বাক্য গঠন আয়ত্তে আনার পর শিশুশিক্ষার বড় একটি পাঠ যার শুরু এ রকম— তুমি কি লোক, তোমার নাম কি, তোমার বাড়ি কোথায়। আমার নাম... আমার বাড়ি...। আমি য ফলা পড়ি...। শিশুশিক্ষার এই অধ্যায়ে সৎ চরিত্রাবলি, সততা, মানবতা, ন্যায়নিষ্ঠতা, নম্র ভদ্র শিষ্টাচারসহ মানুষের সকল গুণাবলি নিয়ে পরিপূর্ণ মানুষ গড়ে তোলার পাঠ দেয়া হয়েছে। তারপর ছিল তিনটি কবিতা। প্রতিটিতে ছিল মানুষের সুন্দর মন সৃষ্টির সৃজনশীলতার মধ্যে প্রকৃতি প্রেমী হিসাবে গড়ে তোলার ছন্দ। যেমন পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল... ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি, আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।

বাংলা এই পাঠের সঙ্গে সংখ্যা গণনা, একক দশক শতক সহস্রের হিসাবের পর শতকিয়া কড়া কিয়া কাঠা কিয়া গ-া কিয়া পাঠ। পরের অধ্যায়ে নামতা পাঠ। প্রথম পর্বে একের ঘর থেকে দশের ঘর। পরের পর্বে দশ থেকে কুড়ির ঘর। নামতা মুখস্থ করতে হতো। তারপর গুরু মশাই প্রশ্ন করতেন- বল তো তিন সাত্তা কত? পাঁচ দ্বিগুণে কত? এ সময় মনে মনে বিড়বিড় করে ওই ঘরের নামতা মুখস্থ সঠিক উত্তর দিলে কথা নেই। উত্তর ভুল হলে কোন খাতির নেই। গুরুমশাই ডেকে বলতেন হাত পাত। তারপর বেতের ধপাধপ। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় এ ধরনের শাস্তির বিধান নেই। ধারাপাতের কাঠা কিয়া গ-া কিয়ার হিসাবে কার্যত জমি জিরাতের হিসাব মাপজোকের প্রাথমিক পাঠ দেয়া হতো। ধারাপাতের শেষ অধ্যায়ে গত শতকের শুরুতেই মেট্রিক পদ্ধতির প্রাথমিক ধারণা দেয়া ছিল। সেদিনের গ্রামের সেই পাঠশালা আজ আর নেই। পূর্বসূরিদের কাছে পাঠশালা ছিল বিদ্যা ভা-ারের প্রথম সোপান। এই পাঠশালায় গুরুমশাই প-িতমশাইদের হাতে গড়া কত শিক্ষার্থী পরবর্তী জীবনে দেশ বিদেশের নামী দামী ব্যক্তিত্ব হয়ে দেশ-দশের মর্যাদা বাড়িয়েছে। সেই মহীরুহরা যখন গ্রামে গিয়ে চেনা পাঠশালার সামনে গেছে তখন স্মৃতির অতলে ধূসর মধুর স্মৃতির দিনগুলো তাদের চোখে ভেসে উঠেছে। যদি তখনও সেই গুরুমশাই বেঁচে থাকতেন, ততদিনে অশীতিপর বৃদ্ধ। কোন রকমে ঘর থেকে বের হয়ে অপার স্নেহের মমত্বে সন্তানতুল্য ছাত্রের কন্ঠ শুনে আবেগে বুকে জড়িয়ে তিনিও ফিরে পেতেন সেই দিনগুলো। কত কথা মনে পড়েছে তখন...। হৃদয় নিংড়ানো আশীর্বাদ দিতেন গুরুমশাই।

আজ যারা প্রবীণ মধ্য বয়সী তাদের কাছে পাঠশালা অর্থ মানুষ হওয়ার পীঠস্থান। জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়। হোক না যতই জীর্ণ কুটির। বর্তমানে এই পাঠশালার চিহ্নমাত্র নেই। সবই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার অনন্ত পথ। সেদিনের পাঠশালায় যেতে মাটির পথ, কখনও জমির আইলের ওপর দিয়ে হাঁটা, হাতে স্লেট পেন্সিল শিশুশিক্ষা ধারাপাত ও কালেভদ্রে খাতা। বর্ষায় হাঁটু পানি ডিঙানো। তবু যেতে হবে পাঠশালায়। সেদিনের এই চিত্রের সঙ্গে বর্তমানের কোন মিলই নেই। গ্রামের প্রাথমিক স্কুলগুলো এখন পাকা। নিভৃত গ্রামের হাতেগোনা দু’য়েকটি স্কুল বিল্ডিংয়ে টিনের চালা। আলাদা শ্রেণী কক্ষ। হেড মাস্টার, সহকারী শিক্ষক। চেয়ার টেবিল বেঞ্চ ডেস্ক সবই উন্নত। বর্তমানে কাঠের ব্লাক বোর্ডও নেই। মার্কার পেনে লেখা সাদা প্লাস্টিকের শিট। বিদ্যুতায়িত গ্রামের স্কুলেও বিদ্যুত। শিশুশিক্ষা ধারাপাত পুস্তক নেই। উন্নতমানের বই। স্লেট পেন্সিল সহজে কেউ চেনে না। পেন্সিলের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এখন খাতা বলপেন। শহুরে জীবনে সেদিনের পাঠশালার কথা শুনলে শিশুরা হাসে। শিশুদের স্কুলগুলোতে এখন মাঠের আকাল। কালেভদ্রে কোথাও থাকলেও তা এতই ছোট যে প্রাণখুলে ছুটোছুটি করার জায়গাও নেই। শহরে প্রাইভেট স্কুলগুলোর বেশিরভাগই বহুতল ভবনে। যেখানে প্রকৃতির ছোঁয়া নেই। নার্সারি প্লে নামের ক্লাসগুলোতে ছোট্টমণিদের বই খাতা কলমের ওজনে ব্যাগ এতটাই ভারি যে কখনও তা বহন করতে হয় অভিভাবককে। এভাবে শ্রেণী পাঠের বিষয় বাড়ানো হয়েছে, শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে অনেক উন্নত আধুনিক ধারায় গড়ে উঠছে। তারপরও কথা থাকে, তা হলো-পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে শিশুরা নিজেদের জগত সৃষ্টিশীলতার আলাদা জগত, মননশীলতা মানবিকতা মেধার সামগ্রিক ব্যবহারে সৃষ্টি করার জায়গাগুলো পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তার কালজয়ী হীরক রাজার দেশে ছবিতে হীরক রাজা রূপী উৎপল দত্তের কণ্ঠে সেই সংলাপটির কথা নিশ্চই অনেকের মনে আছে। যেখানে বলা হয় ‘মন্ত্রী তোমারে সুধাই-আজ থেকে পাঠশালা বন্ধ। ওরা যত বেশি পড়ে তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ ছবির এই অংশের ভাবার্থ হলো- একটি জাতি গড়ে ওঠার সবচেয়ে উঁচু স্তর পাঠশালা। এই পাঠশালা প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার শিক্ষা ও দীক্ষা দুই-ই দেয় পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি সামগ্রিক শিক্ষায়।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে