২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের সূচনা

(২৮ নবেম্বরের পর)

দাবিটি ছিল যে, প্রাদেশিক পরিষদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত দেবে এবং এই সিদ্ধান্ত যাতে গণপরিষদে কার্যকর হয় তার ব্যবস্থা নেবে। আমার মনে হয় আমরা কয়েকজন বন্ধু জোট বেঁধে কোন এক ফাঁকে রাস্তায় নেমে পড়লাম এবং পুলিশের লাঠির বাড়ি এড়িয়ে মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে যাওয়ার উদ্যোগ নিলাম। দুর্ভাগ্যবশত কয়েকজন পুলিশের লাঠির আঘাতে মাটিতে পড়ে যায়,ন কেউ কেউ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। তাদের ধরাধরি করে মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেই কাজে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা মূল্যবান ভূমিকা রাখে। আমাদের দলে যেমন সিদ্দিকুর রহমান (পরবর্তীকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল, দেওয়ান আহমদ কবির চৌধুরী লাঠির আঘাতে আহত হল। আহমদ কবীর চৌধুরী ছিল মজার মানুষ ভাল ছাত্র এবং আবাসন শিল্পের পথিকৃত।

বনজঙ্গল এবং বাগান তার খুব প্রিয় ছিল। তার সম্বন্ধে আরও কথা পরে বলছি। যাই হোক, একুশের কাহিনীতে ফেরা যাক। বেশিরভাগ ছাত্র যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমতলা এবং মধুর দোকানে সমবেত হয়েছিল তাদের প্রায় সবাই বেলা একটা দেড়টার মধ্যে মেডিক্যাল ছাত্রাবাস এলাকায় পৌঁছে গেল। সেখানে ব্যারাকের ছাত্রাবাস নতুনভাবে নির্মাণ করার জন্য অনেক ইট, পাথর, বালি সংগৃহীত ছিল। এই ইটই হয়ে গেল ছাত্রদের যুদ্ধাস্ত্র। আছাড় দিয়ে ইট ভেঙ্গে ইটের টুকরো হলো পুলিশকে আক্রমণ করার অস্ত্র। সম্ভবত দুপুর ১টার আগেই পুলিশের প্রতি ইষ্টক বৃষ্টি ব্যাপক আকার ধারণ করল। পুলিশ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে আশ্রয় নেয় এবং মাঝে মাঝে বেরিয়ে এসে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে অথবা লাঠি নিয়ে ছাত্রদের দিকে ধেয়ে যায়। কতিপয় উদ্যোগী ছাত্রের কল্যাণে মেডিক্যাল কলেজছাত্র হোস্টেলে সম্ভবত ২টা বাজার আগেই মাইক্রোফোন একটি এসে গেল এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বক্তৃতা দেয়া শুরু হলো।

রাস্তা থেকে ২/১ জন সংসদ সদস্যকেও ধরে নিয়ে এসে তাদের দিয়ে বক্তৃতা প্রদানেরও উদ্যোগ হলো। আমার মনে হয় আমি যে দলটির সঙ্গে ছিলাম আমরা সম্ভবত ৩টার দিকে ক্লান্ত হয়ে মেডিক্যাল কলেজের রেস্তরাঁতে আশ্রয় নিই। মেডিক্যাল কলেজের রেস্তরাঁ তখন ছাত্রমহলে সবচেয়ে উন্নত রেস্তরাঁ ছিল। সেখানে একটি রেফ্রিজারেটরও ছিল বলে ঠাণ্ডা পানিও পাওয়া যেত। আমরা যখন চা-পানি খাচ্ছি তখন হঠাৎ গুলির আওয়াজ শোনা গেল এবং ত্রস্তে আমরা রেস্তরাঁ থেকে হোস্টেলের গেটের দিকে ধাবিত হলাম। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, মিনিট দুয়েকের মধ্যেই আমরা দেখলাম যে, রক্তাক্ত অবস্থায় শায়িত মানুষ একজনকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খুলিহীন মরদেহটাও দেখবার সুযোগ আমার হয়। গুলিবর্ষণের পরে পরিস্থিতিটি একেবারে বদলে যায়। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ সম্ভবত গুলিবর্ষণের আগেই মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং বক্তব্য রাখেন। গুলিবর্ষণের পরেই তিনি সংসদ অধিবেশনে চলে যান। সেখানে তারই নেতৃত্বে সংসদে গুলিবর্ষণের বিষয়টি উত্থাপনের প্রচেষ্টা চলে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় আওয়ামী লীগের কতিপয় সংসদ সদস্য সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেন। তাদের কেউ কেউ এসে মেডিক্যাল প্রাঙ্গণ থেকে বক্তব্য রাখেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেডিক্যাল কলেজ থেকে মাইক্রোফোনে বক্তৃতা দেয়া এবং হোস্টেল প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া চলতে থাকে। অবশেষে আগামীকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়া হলো এবং আরও জানানো হলো যে, আগামীকাল ১১টায় হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য গায়েবী জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

সম্ভবত সেদিন বিকেলেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলেও একটি মাইক্রোফোন বসানো হয় এবং সেখান থেকেও বক্তৃতা চলতে থাকে। পরদিন সকাল থেকেই মেডিক্যাল কলেজে জনসমাবেশ হতে থাকে এবং ১১টায় বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাজায় শেরে বাংলা ফজলুল হক যোগ দেন। মওলানা ভাসানী সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন, কারণ, তিনি তখনও ঢাকার বাইরে দলের প্রচারণাকার্যে ব্যস্ত ছিলেন।

জানাজা শেষে বিরাট জনসভা হাইকোর্টের দিকে ধাবিত হয়। হাইকোর্ট পেরিয়ে পুরনো পল্টন হয়ে এই শোভাযাত্রা রেলওয়ে ক্রসিং পেরিয়ে নবাবপুর রোডে যায় এবং সারাটি শহর প্রদক্ষিণ করতে থাকে। ২২ তারিখেও পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় গুলিবর্ষণ করে। যেমন- হাইকোর্টের প্রবেশ পথে, পুরানা পল্টনে, নবাবপুর রেলওয়ে জংশনে এবং জনসন রোডে মুকুল সিনেমা হলের সামনে। ২১ এবং ২২ ফেব্রুয়ারি মোট কতজন শহীদ হন সেই তথ্য কিন্তু আজ পর্যন্ত সঠিকভাবে বলা চলে না। কোন কোন ক্ষেত্রে পুলিশ আহত বা নিহতদের তুলে নিয়ে চলে যায়। কোন কোন জায়গায় অপরিচিতদের যেনতেনভাবে দাফন করা হয়। নাম যাদের পাওয়া যায় তাদের সংখ্যা দুই অঙ্কের নিচেই আছে।

শহীদ আবুল বরকত ছিলেন এমএ ক্লাসের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। শহীদ আব্দুল জব্বার মেডিক্যাল কলেজের একজন রোগীকে দেখতে এসেছিলেন। কেউ কেউ তাকে রিক্সাচালক অথবা ছাত্র হিসেবে শনাক্ত করেন। কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন গফরগাঁও থেকে আসা একজন দর্জি। রফিক উদ্দিন আহমেদ ছিলেন মানিকগঞ্জ কলেজের একজন ছাত্র এবং তার খুলিটি পুলিশের গুলিতে উড়ে যায়। ওহিউল্লাহ নামে একজন কিশোর মুকুল সিনেমা হল এলাকায় গুলিতে নিহত হন। আব্দুস সালাম ছিলেন একটি দফতরের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী এবং তিনি আহত হয়ে কয়েকদিন পরে মৃত্যুবরণ করেন।

২১ তারিখ বিকেলেই আজাদ পত্রিকা একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে এবং ২২ তারিখে াাগের দিনের আন্দোলনের একটি বিস্তৃত বিবরণ প্রদান করে। সেখানে বলা হয়, ৪ জন নিহত হয় এবং ১৭ জন আহত হয় যাদের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। আজাদের সংবাদে আরও ছিল যে, সালাউদ্দিন নামে একজন এমএ ক্লাসের ছাত্র নিহত হয়। কিন্তু এই বক্তব্য প্রমাণ করা যায়নি। ২২ তারিখের একটি সরকারী প্রেসনোটে বলা হয় যে, মাত্র একজন অকুস্থলে মারা যান এবং আরও ২ জন হাসপাতালে মারা যান এবং মোট ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন।

সরকারী প্রেসনোটে একেবারেই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলা হয় যে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় অছাত্র দুষ্কৃতকারীদের এবং এই অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পর্ক ছিল না (এই মিথ্যা প্রেসনোটটি বশির আল হেলালের ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে’ উদ্ধৃত করা আছে পৃষ্ঠা ১৫১-১৫৩)। ২২ তারিখে শোভাযাত্রার উপর নানা জায়গায় গুলিবর্ষণ এবং লাঠিচার্জ হলেও তা উপেক্ষা করেই শোভাযাত্রাটি নবাবপুর, সদরঘাট, ইসলামপুর, বাবুপুরা, আরমানিটোলা, বংশাল, সেন্ট্রাল জেল হয়ে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে গিয়ে শেষ হয় অপরাহ্ণের শেষ দিকে। বলা হয় যে, শোভাযাত্রার কারণেই জনসন রোডের মর্নিং নিউজ এবং বংশালে সংবাদ অফিস আক্রান্ত হয়। এই ২টি সংবাদ মাধ্যম সরকারী ক্রোড়পত্র হিসেবেই পরিচিত ছিল। তারা ২১ ফেব্রুয়ারিতে ধর্মঘট পালন করেনি বলেই সবাই তাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। চলবে....