২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এনবিআরের দাবি তারা এখন করদাতাবান্ধব

  • বদলে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বদলে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগে করদাতা ও ব্যবসায়ীদের কাছে এক ধরনের আতঙ্কের নাম ছিল এ প্রতিষ্ঠানটি। হয়রানি, ঘুষ দুর্নীতি ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন আসছে। করদাতাবান্ধব হয়ে উঠছে এনবিআর। সুশাসন ও উন্নততর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্টেক হোল্ডারদের সর্বোচ্চ মানের সেবা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চলছে। শুধু তাই নয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নেও চলছে জোর প্রস্তুতি। জনকল্যাণে রাজস্ব আহরণ এবং সেবাধর্মী করদাতাবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে কাজ করছেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। তিনি বলেন, আমার কাজ হচ্ছে সুশাসিত, স্বচ্ছ এবং জনসেবার আদর্শে উজ্জীবিত এনবিআর প্রতিষ্ঠা করা। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সেটিই করে যাচ্ছি।

সূত্র জানায়, দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। মোট গৃহীত রাজস্বের সিংহভাগই এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আদায় হয়ে থাকে, যার পরিমাণ মোট রাজস্বের ৮৩ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গত পাঁচ বছরের কার্যক্রমের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট আদায় ছিল ৫২ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ১৩০ শতাংশ। ইতোমধ্যেই গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকার বিপরীতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা আদায় করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

এ বিষয়ে নজিবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারের সার্বিক ব্যয় নির্বাহ ও জনসাধরণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সরকারী আয় বৃদ্ধি অপরিহার্য। এই অপরিহার্যতা বিবেচনা করে চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বাজেট ইমপ্লিমেন্টেশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় এ অর্থবছরও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করছি। এক প্রশ্নের জবাবে নজিবুর রহমান বলেন, আমার ব্রান্ড হচ্ছে টিমওয়ার্ক করা। স্টেকহোল্ডারদের সর্বোচ্চ মানের সেবা দেয়া। প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের কাজের উপযুক্ত মূল্যায়ন করে তাদের সঠিক পদায়ন ও পদোন্নতি দেয়া। তাদের যে কোন ভাল কাজের জন্য পুরস্কৃত করা। জনগণকে কেউ সেবা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে তিরস্কার করা। এজন্যই আমাদের পলিসি হচ্ছে দুর্নীতি, হয়রানি ও বিশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স। মূলমন্ত্র হচ্ছে দুষ্টের দম, শিষ্টের পালন। তিনি বলেন, যারা সৎ ব্যবসায়ী তাদের প্রণোদনা ও অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম ব্যবস্থা নেয়া হবে। সুশাসিত, স্বচ্ছ এবং জনসেবার আদর্শে উজ্জীবিত এনবিআর প্রতিষ্ঠা করা।

সূত্র জানায়, শুধু রাজস্ব আদায়ই নয়, ইন্টারন্যাশনাল গুড প্রাকটিসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং কর প্রশাসনকে আধুনিক, প্রযুক্তি নির্ভর ও যুগোপযোগী কর তোলার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসব কার্যক্রমের অনেকাংশই ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কিছু বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব কর্মপরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যুগোপযোগী করনীতি প্রণয়ন, দলিল নির্ভর পদ্ধতি পরিহার করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক হিসাব সংরক্ষণ ও অনলাইন পদ্ধতিতে কর পরিশোধের ব্যবস্থা করা, প্রযুক্তি নির্ভর তথ্য ভান্ডারকে কাজে লাগিয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-শুল্ক ও কর কর্মকর্তা-বাংলাদেশ ব্যাংক ও করদাদের মধ্যে পারস্পারিক নেটওয়ার্কিং বৃদ্ধির মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ, করদাতা ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন নিশ্চিতকরণসহ ট্যাক্সপেয়ার্স সার্ভিস নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

যুগোপযোগী করনীতি প্রণয়নের বিষয়ে সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২ প্রণীত হয়েছে, যা ২০১৬ সালের জুলাই হতে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। কাস্টমস আইন-২০১৫ এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং হয়েছে এখন মন্ত্রিপরিষদের উপস্থাপন করার প্রস্তুতি চলছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছর হতে এটি বাস্তবায়ন করার প্রস্তুতি রয়েছে। ডাইরেক্ট ট্যাক্স কোডের খসড়া প্রণীত হয়েছে, যা প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ এবং রোড ম্যাপ তৈরি হয়ে এখন চূড়ান্তের পর্যায়ে রয়েছে।

অন্যদিকে কাস্টমস এর আধুনীকরণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী কাস্টমস ব্যবস্থায় অনুসৃত সর্বোত্তম পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পণ্যের শুল্কায়ন ও পণ্য ছাড়করণ প্রক্রিয়া অটোমেশনের লক্ষ্যে কাস্টমস স্টেশনে ইতোপূর্বে ব্যবহৃত অটোমেটেড সিস্টেম ফর কাস্টমস ডাটা পদ্ধতির সর্বশেষ ভার্সন অটোমেটেড সিস্টেম ফর কাস্টমস ডাটা ওয়াল্ড প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ব্যাংকসমূহের সঙ্গে ঋণপত্রের (এলসি) তথ্যাদি বিনিময়ের লক্ষ্যে ই-এলসি বাস্তবায়ন কাজ চলছে। পণ্য খালাসের সঙ্গে জড়িত একাধিক সংস্থার কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে একটি উইন্ডোর আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে একাধিক দেশে কার্যকর ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে নজিবুর রহমান বলেন, শুভ চক্র তৈরি করতে হবে। যেমন জনগণকে উৎসাহ দিলে আয়কর আদায় হবে এবং রাজস্ব বাড়লে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আওতায় ভাল বাজেট তৈরি হবে। বাজেট বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে গতি বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, ব্যাংকে আমানত বাড়বে। সেই আমানত থেকে উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে ভাল ভাল শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। ফলে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্র্য বিমোচন হবে। এতে অর্থনীতি গতিশীল হবে। আরও রাজস্ব বাড়বে। সেই রাজস্ব উন্নয়নে ব্যবহার করে বাংলাদেশের যে রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ তা বাস্তবায়িত হবে।

তিনি জানান, করদাতাদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, কুমিল্লা ও বরিশালে কর তথ্য ও সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডাটা ফরেনসিক ইক্যুপমেন্ট ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে আয়কর বিষয়ক রায়ের রেফারেন্স, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক বিভিন্ন সময় জারিকৃত প্রজ্ঞাপন, অর্থ আইন এবং আয়কর বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য আয়কর কর্মকর্তাদের নিকট ডিভিডি আকারে সরবরাহের লক্ষ্যে ইনকাম ট্যাস্ক কেস ল ডাইজেস্ট তৈরির কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতোমধ্যেই ই-টিআইএন পদ্ধতি চালু হয়েছে। ফলে করদাতাগণ বিশ্বের যে কোন স্থান হতে ঘরে বসেই ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে ই-টিআইএন নিবন্ধন করতে পারছেন।

এসব কর্মকা-ের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে সম্পৃক্ত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের লক্ষ্যমাত্রা ভিত্তিক কার্য সম্পাদন, কর্মদক্ষতা এবং সম্পাদিত কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান ভিত্তিক মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং অর্থমন্ত্রীর পক্ষে (অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান) আমার একটি বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কার্যাবলী সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য মাঠ পর্যায়ে ইতোমধ্যেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।