২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আইসিডিডিআরবির কিছু কর্মকর্তার কারণে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক মান

  • অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের কর্মী মঙ্গল সংস্থার

নিখিল মানখিন ॥ আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) কতিপয় কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এমন অভিযোগ তুলেছেন ওই প্রতিষ্ঠানেরই বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কর্মীমঙ্গল সংস্থার ব্যানারে তারা চীফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) পদ বিলুপ্তিসহ নয়দফা পূরণ দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। তারা অভিযোগ করছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারছে না। ইমারত নির্মাণ, বীমা জালিয়াতি, জার্নাল বিক্রিসহ বিভিন্ন প্রকল্পের বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাত করেছে প্রতিষ্ঠানটির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী অসম চুক্তির মাধ্যমে ব্র্যাককে এক টাকার বিনিময়ে সাড়ে ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গা লিজ দিয়েও অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে। অস্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতাহীন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সাজানো নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। বৈষম্য ও বর্ণবাদের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সর্বোপরি, এই প্রতিষ্ঠানের জনবল, মান ও সম্মান উপেক্ষা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে পড়েছে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র। এসব অভিযোগ সম্পর্কে নিয়ম অনুযায়ী যোগাযোগ করেও আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি কর্মীমঙ্গল সংস্থার ব্যানারে বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে আইসিডিডিআরবির অডিটরিয়ামে। সমাবেশে প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন। তারা বলেন, আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বার্থ নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের এই প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করাটাই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠান রক্ষায় তারা ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হচ্ছে আইসিডিডিআরবি’র অর্ডিন্যান্স-১৯৭৮ মোতাবেক বেতন-ভাতা জাতিসংঘ বেতন কাঠামো অনুসারে প্রদান, বাতিলকৃত সুযোগ-সুবিধা পুনর্বহাল, মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তার পদ বিলুপ্ত করে প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য নির্বাহী পরিচালক, উপ-নির্বাহী পরিচালকের মাধ্যমে সকল প্রকার প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা, সকল প্রকার অবৈজ্ঞানিক আন্তর্জাতিক পদ বিলুপ্ত করে সেসব পদে জাতীয় পেস্কেল অনুসারে উর্ধতন কর্মকর্তাদের ‘নতুন পদ’ সৃষ্টি, ১৯৭৮ সালের অর্ডিন্যান্স সংশোধন, অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করা, শর্তহীনভাবে ব্র্যাকের সঙ্গে চুক্তি বাতিল, ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার অধ্যাপক ডাঃ সোহরাব আলীর অবমাননার সুবিচার ও আইসিডিডিআরবির ঐতিহ্যবাহী জার্নাল অব হেলথ, পপুলেশন এ্যান্ড নিউট্রিশন (জেএইচপিএন) চালু করা।

আইসিডিডিআরবির কর্মীমঙ্গল সংস্থার নেতারা অভিযোগ করেন, বড় বড় পদে যারা বসে আছেন তাদের নজিরবিহীন দুর্নীতির রেকর্ড আমাদের হাতে এসেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আন্দোলনে বিজয়ী না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফেরা যাবে না। কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন কর্মীমঙ্গল সংস্থার নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, বাংলাদেশ সরকার আইসিডিডিআরবিকে প্রায় ৪.১০ একর জমি গবেষণা প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য দান করে। এই স্থানে নির্মিত হাসপাতাল সেবার মান উন্নয়ন, হাসপাতাল ভবন বর্ধিতকরণ ও কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ৯৯ কোটি টাকা প্রদান করে। কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা পরস্পরের যোগসাজশে প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাত করে। আইসিডিডিআরবির বোর্ড অব ট্রাস্টি সরকারের তদন্ত প্রতিবেদন উপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট দোষী কর্মকর্তাদের দায়মুক্ত করে।

আইসিডিডিআরবির স্বার্থবিরোধী অসম চুক্তির মাধ্যমে ব্র্যাককে এক টাকার বিনিময়ে সাড়ে ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গা লিজ দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে স্থানের অভাবে আইসিডিডিআরবি (কলেরা হাসপাতালে) রোগীদের তাঁবু টাঙ্গিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এবং সংস্থার কতিপয় বিভাগের প্রায় ৩শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিষ্ঠানের মূল ভবনের বাইরে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বহুদিনের পুরনো ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া মূল ভবনে অবস্থিত ল্যাবরেটরি সার্ভিসেসের জন্য প্রদত্ত অপ্রতুল স্থানে গবেষণায় সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে এবং গবেষণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি বারান্দায় রাখতে হচ্ছে। যা জৈব-নিরাপত্তা পলিসি, অগ্নিনির্বাপণ পলিসি এবং বিল্ডিং সেফটি কোডের পরিপন্থী। ব্র্যাকের সঙ্গে সম্পাদিত এই অসম ও অনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে কতিপয় কর্মকর্তা বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

২০০৯-১০ সালে বাংলাদেশ সরকার আইসিডিডিআরবিকে এর ঢাকা হাসপাতাল সংস্কার ও জলাধার নির্মাণের জন্য ৯ কোটি ৮৮ লাখ ৩৪ হাজার ৪০ টাকা এবং সার্ভিস বিল্ডিং নির্মাণের জন্য ৭ কোটি ২৪ লাখ ১৫ হাজার ১৫ টাকা অনুদান প্রদান করে। সর্বমোট ১৭ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৫৫ টাকার সংস্কার ও নির্মাণকাজ পরিপূর্ণভাবে শেষ না করেই কর্তৃপক্ষ সরকারকে এই মর্মে প্রত্যায়ন করে যে, প্রকল্পের কাজ পরিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। তদন্ত হলেই সব বেরিয়ে আসবে।

২০১২ সালের নবেম্বরে আইসিডিডিআরবিতে একটি বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনা প্রকাশিত হয়। তদন্তে বীমা কোম্পানি-সংক্রান্ত এই জালিয়াতির ঘটনাটি জানা যায়, প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ৭৭৭ টাকার বীমা জালিয়াটি হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইসিডিডিআরবি প্রশাসন এখনও দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

‘দ্য জার্নাল অব হেলথ, পপুলেশন এ্যান্ড নিউট্রিশন (জেএইপিএন) আইসিডিডিআরবির একটি আন্তর্জাতিক মানের ত্রৈমাসিক পিয়ার রিভিউড জার্নাল। এই জার্নালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশসহ প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের গবেষণালব্ধ ফল নিবন্ধ আকারে প্রকাশ করা হয়। একটি অর্থলোভী গোষ্ঠী আইসিডিডিআরবির এই প্রকাশনাটি ‘বায়োমেড সেন্ট্রাল লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯৫৪ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণালব্ধ তথ্য প্রকাশে ব্যাপক ধস নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ সরকারের জারিকৃত ১৯৭৮ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী আইসিডিডিআরবিকে একটি সাংবিধানিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উন্নত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণার লক্ষ্যে আমদানি কর ও অন্যান্য শুল্কমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আইসিডিডিআরবিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব সুবিধাসহ গবেষণার কাজে ব্যবহৃত জৈব নমুনা বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রেরণের সুবিধা ভোগ করে আসছে। অথচ বিভিন্ন সময়ে এসব সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অর্জিত সুনামের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য আইসিডিডিআরবি কর্তৃক অনুমোদিত ডিলারকে পূর্বে কার্যাদেশে উল্লিখিত পরিমাণের তুলনায় কম এবং কিছু নষ্ট মালের সমপরিমাণ মাল সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানি থেকে পুনরায় আমদানির জন্য কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। কার্যাদেশ প্রাপ্তির পর কোম্পানি দুটির যোগসাজশে কার্যাদেশে উল্লেখিত পরিমাণের চেয়ে অধিক মালামাল আমদানি করে আইসিডিডিআরবির কর রেয়াত সুযোগের আওতায় তা খালাস করার চেষ্টা চালায়। ঘটনাটি তৎকালীন প্রকিউরমেন্ট প্রধানের নজরে আসে। আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরবর্তীতে সকল পক্ষের উপস্থিতিতে তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটিকে সুস্পষ্ট অনিয়মের মাধ্যমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মালামাল আনার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। এ তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করে মাল ছাড় করতে দীর্ঘসময় কন্টেনারটি কাস্টমস হাউসের গোডাউনে থাকা বাবদ প্রায় ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আইসিডিডিআরবির এক কর্মকর্তা বর্তমান অর্ডিনেন্সে প্রদত্ত শুল্কমুক্ত সুবিধার উল্লেখ করে নৌ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর কাছে জরিমানা মওকুফের জন্য আবেদন করেন এবং মওকুফের ব্যবস্থা করেন। এতে একদিকে আইসিডিডিআরবি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে সরকার জরিমানার টাকাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠান দু’টির অনিয়মে কন্টেনার ছাড় করাতে ব্যর্থ হওয়ায় আইসিডিডিআরবি সময় মতো কাজ শেষ করতে পারেনি।

প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী যোগাযোগ করেও এ বিষয়ে আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়ার জন্য জনকণ্ঠের সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে প্রশ্নপত্র সাজিয়ে ই-মেল করতে বলেন আইসিডিডিআরবির মিডিয়া ম্যানেজার। মেল পাঠানোর তিন দিনের মধ্যেও কোন বক্তব্য দেননি আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ।