২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সবাইকে রাগ শিখতে হবে না, শিখতে হবে সঙ্গীত

সবাইকে রাগ শিখতে হবে না, শিখতে হবে সঙ্গীত
  • অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় প-িত অজয় চক্রবর্তী

মোরসালিন মিজান ॥ একটু দেরি করে এসেছিলেন। তাই দুঃখ প্রকাশ করে শুরু বললেন, আমি যথাসময়ে পৌঁছার চেষ্টা করেছি। কিন্তু হয়েছে কী, ঢাকার রাস্তা ভীষণ ব্যস্ত। যানজট না বলে বললেন ব্যস্ত রাস্তা। এই বলার মধ্য দিয়ে কঠিনকেও সহজ করে দেখার একটা ইঙ্গিত দেন প-িত অজয় চক্রবর্তী। তার পর আসেন রাগ সঙ্গীতের আলোচনায়। সাধারণ্যে প্রচার- এই ধারার সঙ্গীত ভারি খুব। ভীষণ কঠিন কর্ম। অনেকেই ভয়ে দূরে থাকেন। মঞ্চে প-িত অজয় চক্রবর্তীকে শুনলে সে ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। অথচ ঘরোয়া আড্ডায় এমন ধারনাকেও ভেঙে খান খান করে দিলেন তিনি! রাগকে একদমই বাঘ করে উপস্থাপন করলেন না। বরং তার সহজ বলা বিশ্লেষণ গানের মতোই গিলতে হলো উপস্থিত শ্রোতাদের। শনিবার সকালে শিল্পকলা একাডেমিতে চমৎকার এই প্রীতি সম্মিলনীর আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ আলোচনা। আড্ডা। পুরোটাই বলা চলে সহজ পাঠ।

প্রথমেই জানালেন, তিনি বাংলাদেশের মানুষ। বাবা মা দুজনই এই দেশের। সঙ্গীতের টানে বাবা ভারতে স্থায়ী হয়েছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই ছেলেকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। পিতার উৎসাহেই এতদূর আসা বলে জানান অজয় চক্রবর্তী। বলেন, ‘বাবা একটা প্রাইমারী স্কুলে সামান্য বেতনের চাকরি পেয়েছিলেন। আমি তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেতনের চাকরি পেলাম স্টেট ব্যাংকে। অথচ তিনি আমার নিয়োগপত্র ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। বললেন, তুই চাকরি কইর‌্যা আমারে হাজার টাকা দিলেও লাথ্যি মাইর‌্যা ফালায়্যা দিমু। তুই গান নিয়া থাক।’ নিজের গড়ে ওঠার সময়টির কথা জানিয়ে অজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘২ বছর বয়সে আমি গাইতে শুরু করেছিলাম। একটা সময় মনে হলো গান ছাড়া আমার নিষ্কৃতি নেই। অনেকে বিশ্বাস করবেন না, আমি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্ট রেওয়াজ করেছি। এভাবে সাড়ে সাত বছর। অনেক কষ্ট করেছি।’ এর ফলও ছিল মিষ্টি খুব। তিনি একা ভোগ করেননি। বরং লাভবান হয়েছে বাংলা সঙ্গীত। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইতিহাসটাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘এক সময় বাংলা রাগ সঙ্গীতের কোন পরিচিতি ছিল না। সব ছিল মহারাষ্ট্র দিল্লী জয়পুর গোয়ালিয়ার আগ্রার। আমি অহঙ্কার করছি না, কলকাতা থেকে রাগ সঙ্গীতের বাংলা রেললাইন আমি একলা পেতেছি।’ কথা শেষ করার আগেই করতালি। বাংলার এই এগিয়ে যাওয়াকে আরও একবার উদ্যাপন করেন শ্রোতারা। তবে, খুব প্রশংসা নিতে রাজি নন শিল্পী। এখন তার বিপুল খ্যাতি। কত কত পুরস্কার। রাষ্ট্রীয় পদক। অথচ তিনি বললেন, ‘অনেকে এখন অজয় চক্রবর্তী নাম বললে ঠিক চিনতে পারেন না। পাল্টা প্রশ্ন করেন, প-িত অজয় চক্রবর্তী তো?’ এভাবে সহজ করে আকর্ষণীয় করে বলেন বাকি কথাগুলোও।

আলোচনায় ঘুরে ফিরেই আসে বাংলাদেশের কথা। এখানে বেশ অকৃপণ অজয় চক্রবর্তী। বলেন, ‘বাংলাদেশ ঈশ্বরের কৃপাধন্য স্থান। বাংলার মাটি বাংলার জল পূণ্য হোক আমরা বলি। এখানে কিন্তু কণ্ঠস্বর এমনিতেই ঈশ্বর দিয়ে পাঠান। অসাধারণ। বাংলাদেশের মাটিতে, প্রত্যেকটি কণায় সঙ্গীত আছে।’ উদাহরণ টেনে বলেন, আলী আকবর খাঁ সাহেব, আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব, এনায়েত খাঁ সাহেব এই মাটির সন্তান।’ যন্ত্রসঙ্গীতে বাংলাদেশের অবদান অনস্বীকার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, রাগ সঙ্গীত সবাইকে শিখতে হবে না। শিখতে হবে সঙ্গীত। এ জন্য প্রসেস অব লার্নিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ বা ভারতেও সঙ্গীতের ‘প্রসেস অব লার্নিং’ বিষয়ে কোন রিসার্চ হয়নি। এটা খুবই জরুরী ছিল। একজন শিল্পীকে জানতে হবে কীভাবে শিখলে কণ্ঠ সঙ্গীত উন্নত হতে পারে, কী কী প্র্যাকটিস করলে সাহিত্যের উচ্চারণ সঠিক হয়, কোন অভ্যেস করলে সুরের সঠিক স্থান জানা যায়, ঈশ্বরের দেয়া তাল লয়ের সেন্স জাগ্রত হয়। কিন্তু সেটি হচ্ছে না বললেই চলে।’ কিছুটা সমালোচনার মতো করেই তিনি বলেন, ‘বিখ্যাতরা যেভাবে শিখেছেন, সেভাবে তাদের ছাত্রদের শেখান। এভাবে একটা ঘরানার তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রসেস অব লার্নি উন্নত করতে কোন রিসার্চ হয়নি।’ নিজের প্রসঙ্গে ফিরে এসে তিনি বলেন, ‘আমি সমস্ত ধরনের সঙ্গীতজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করেছি। পল্লীগীতি সম্পর্কে আরও আরও শিখেছি পরেশ দেব, নির্মলেন্দু চৌধুরীর কাছ থেকে। রবীন্দ্রনাথের গান শিখেছি সুচিত্রা মিত্র, মায়া সেন, সুমিত্রা সেন, অরবিন্দু বিশ্বাস, সুবিনয় রায়ের কাছ থেকে। কীর্তন সম্পর্কে শিখেছি পঞ্চানন ভট্টাচার্য, ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে থেকে। প্রত্যেকের কাছে গিয়ে ১০টা ২০টা গান শিখেছি।’

আজকের আলোচনায় এসে দুঃখ করে তিনি বলেন, ‘সঙ্গীতটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। আমরা বলি, ধ্রুপদ একটু উপরে এসো। খেয়াল একটু নেমে এসো। নজরুলগীতি কোনায় যাও। রবীন্দ্রনাথের গান ওই দিকে যাও। এ ধরনের চর্চা সম্পূর্ণ ভুল। সঙ্গীতের তো সাতটা স্বর। এর বাইরে পৃথিবীতে কোন সঙ্গীত নেই। স্বরের স্থান শেখানোর প্রসেস দরকার।’ এসব চিন্তা থেকেই তিনি শেখানোর দিকে ঝুঁকে যান। আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি গড়ে তুলেন। সেখানে দারুণ সব কাজ হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি শিল্পী হিসেবে তখন যে স্ট্যান্ডার্ডে ছিলাম সেখান থেকে শেখানোর জন্য সময় দেয়ার চিন্তা করাও অনুচিত ছিল। এর পরও বৃহত্তর স্বার্থের চিন্তায় শেখানোর কাজ শুরু করি।’ বাংলাদেশেও তিনি শেখাতে চান। বলেন, পাসপোর্ট অন্য দেশের হলেও, বাংলাদেশ আমার নিজের জন্মভূমি। এর জন্য তো কিছু করতেই হবে।’ অনলাইনে শেখানোর সে প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা যায় আলোচনা থেকে।

প্রাণবন্ত আলোচনায় অজয় চক্রবর্তীর সঙ্গে ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, কবি তারেক সুজাত প্রমুখ। শিল্পী শ্রোতা ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে উপভোগ্য।