১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জয়ন্তীর বীণার ইন্দ্রজালে মোহাচ্ছন্ন ঢাকার শ্রোতা

জয়ন্তীর বীণার ইন্দ্রজালে মোহাচ্ছন্ন ঢাকার শ্রোতা
  • সংস্কৃতি সংবাদ

মনোয়ার হোসেন ॥ সরস্বতী বীণা বাদ্যযন্ত্রটি এদেশের সঙ্গীতানুরাগীদের কাছে তেমন পরিচিত নয়। অপরিচিত এই বাদ্যযন্ত্রের সুরের ঝর্ণাধারায় শনিবার মোহাচ্ছন্ন হলো আর্মি স্টেঢিয়ামের শ্রোতা-দর্শক। জয়ন্তীর অঙ্গুলিস্পর্শে সরস্বতী বীণার সুরের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ বনানীর আর্মি স্টেডিয়াম। ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী ড. জয়ন্তী কুমারেশের তোলা সুর লহরীতে তখন দুলছিল দর্শকের হৃদয়তন্ত্রী। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবের দ্বিতীয় রজনীতে ঢাকার শ্রোতাদের এমনি করেই রাঙালেন জয়ন্তী। চেন্নাই মিউজিক একাডেমি থেকে ৫ বার সেরা বীণা পুরস্কারজয়ী জয়ন্তী সরস্বতী বীণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, প্যারিস, সুইজারল্যান্ডসহ গোটাবিশ্ব চরে বেরিয়েছেন। তাঁর প্রথম ঢাকা সফরও হয়ে রইল স্মরণীয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত পৌনে আট। মঞ্চে এলেন জয়ন্তী কুমারেশ। পরম মমতায় কোলের ওপর রাখলেন বাদ্যযন্ত্রটি। ছন্দে ছন্দে জয়ন্তীর দশটি আঙুল ঘুরে বেড়াল বীণার তারে। ছড়ালেন সুরেলার ইন্দ্রজাল। মুগ্ধতায় ঝরল শ্রোতার করতালি। ঘণ্টাব্যাপ্তির বাদনে একে একে উপস্থাপন করলেন দক্ষিণ ভারতের রাগ কাফিসহ নানান রাগ-রাগিনী। শিল্পীর সঙ্গে পাখোয়াজে সঙ্গত করেন শংকরানারায়ণ, ঘটম বাজান এস কৃষ্ণাস্বামী।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উৎসবের দ্বিতীয় দিন শনিবারের অধিবেশন শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটায়। শুরুতেই ধ্রুপদ পরিবেশন করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ কুন্ডু। তিনি রাগ ভূপালি পরিবেশন করেন। শিল্পীর সঙ্গে পাখোওয়াজে সঙ্গত করেন প্রতাপ আওয়াদ। তাঁকে উৎসব স্মারক তুলে দেন পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের গুরু প-িত উদয় ভাওয়ালকর।

তৃতীয় পরিবেশনায় খেয়াল উপস্থাপন করেন সুষ্মিতা দেবনাথ। খেয়ালের পর ধ্রুপদ পরিবেশন করেন প-িত উদয় ভাওয়ালকর। কণ্ঠের অনবদ্য পারঙ্গমতায় ঘণ্টাব্যাপ্তির পরিবেশনায় আলাপের সঙ্গে উপস্থাপন করেন দু’টি বন্দিশ। তবলায় বোল তুলে একক বাদন পরিবেশন করেন প-িত সুরেশ তালওয়ালকর। এবারেই প্রথমবারের মতো উৎসবে এসেছেন খ্যাতিমান কর্ণাটকী কণ্ঠশিল্পী পদ্মবিভূষণ বালমুরালীকৃষ্ণ। এবারের আসরের এই প্রবীণতম শিল্পীর পরিবেশনাটিও সুরপিপাসুদের অন্তরে ছড়িয়েছে মুগ্ধতার বীজ। তাঁর সঙ্গে বাঁশির যুগলবন্দীতে অংশ নেন প-িত রণু মজুমদার। এস্রাজ বাজিয়ে শোনান শুভায়ু সেন মজুমদার। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসবে টানা চতুর্থবারের এসেছেন প-িত অজয় চক্রবর্তী। তাঁর মোহাচ্ছন্ন খেয়াল পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দ্বিতীয় দিনের অধিবেশন।

দ্বিতীয় দিনে শিল্পীদের প্রতিটি পরিবেশনাই উপভোগ করেছে দর্শক-শ্রোতারা। পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে রোমাঞ্চিত গানপ্রেমীদের করতালিতে মুখরিত হয়েছে আর্মি স্টেডিয়াম। পরিবেশনা শেষে শিল্পীদের শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানাতে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে সঙ্গীতানুরাগী যখন হর্ষধ্বনির সঙ্গে করতালি দিচ্ছিল সেই দৃশ্যটিও অনন্য সুন্দরের প্রতিচ্ছবি।

উৎসবের আবহ ॥ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত নিয়ে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এ উৎসব উপলক্ষে আর্মি স্টেডিয়াম সেজেছে বর্ণিল সাজে। মাঠের মাঝখানে শামিয়ানা ঘিরে মায়াময় আলোকসজ্জা-শোভিত বিশাল মঞ্চ। তাতে সঙ্গীতের ভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ফেলা হয়েছে চোখে প্রশান্তি ছড়ানো আলোর ঝলকানি। মঞ্চের ব্যাকগ্রাউন্ডে সুর ও নৃত্যের সঙ্গে নান্দনিক দৃশ্যের উপস্থাপনা। ছিল অনুপম শব্দ সঞ্চালন। সব মিলিয়ে এ উৎসব উপভোগ্য ও আকর্ষণীয়। উন্মুক্ত প্রান্তরে কুয়াশা, আলোর ঝলকানি আর সুরের ইন্দ্রজালে বারবার মোহাবিষ্ট হচ্ছিল ঢাকার শ্রোতারা।

মাঠের বিভিন্ন পাশে সঙ্গীতের গুণী শিল্পী ও পৃষ্ঠপোষকদের পরিচিতিমূলক কর্নারটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আছে মাঠের বাইরে প্রবেশ পথে গত আসরের শিল্পীদের আলোকচিত্র। আছে বরেণ্য শিল্পীদেরও আলোকচিত্র। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওয়াহিদুল হক, বিলায়েত খাঁ, আলী আকবর খাঁ, প-িত উদয়শঙ্কর চৌধুরী, প-িত রবিশঙ্কর, এনায়েত খাঁ, অন্নপূর্ণা দেবী, বাহাদুর হোসেন খাঁ, আয়েত আলী খাঁ, বুলবুল চৌধুরী, তুলসী লাহিড়ীসহ ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রায় সব গুণী শিল্পী ও পৃষ্ঠপোষকের ছবি ও তথ্য-পরিচিতি। রাত জেগে সঙ্গীতসুধায় অবগাহন করতে করতে ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’ হওয়ারও নেই শঙ্কা। মঞ্চের পাশেই রয়েছে খাবারদাবার ও চা-নাশতার ব্যবস্থা। খেতে খেতে আছে গান শোনার ব্যবস্থাও। আছে মাঠে ঘুরতে ঘুরতে সঙ্গীত উপভোগের আয়োজন। কারণ মাঠের বিভিন্ন কর্নারে রয়েছে সুদৃশ্য কয়েকটি বড় পর্দা।

আজকের সূচী ॥ আজ রবিবার উৎসবের তৃতীয় দিন। এদিনের অধিবেশন শুরু যথারীতি সন্ধ্যা সাতটায়। অনুষ্ঠানমালার সূচনাতেই পরিবেশিত হবে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পী ওয়ার্দা রিহাব ও তার দলের অংশগ্রহণে মণিপুরী নাচ। এদিনের সন্ধ্যার থাকছে ধ্রুপদ পরিবেশনা। পরিবেশন করবেন ওস্তাদ ওয়াসিফ ডাগর। সরোদ বাজিয়ে শোনাবেন ইউসুফ খান। ভারতের ‘সিংগিং ভায়োলিন’খ্যাত এন রাজমের নেতৃত্বে কর্ণাটকী ধারার তিন প্রজšে§র তিন শিল্পী সুর তুলবেন বেহালায়। খেয়াল পরিবেশন করবেন বিদূষী শ্রুতি সাদোলিকর। তৃতীয় রজনীর অন্যতম আকর্ষণ গুরু কড়াইকুডি মানি। পরিবেশন পরবেন মৃদঙ্গ। সর্বশেষে মঞ্চে আসবেন বিদূষী শোভা মুডগাল। তিনি পরিবেশন করবেন খেয়াল।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকা তৈরির উদ্যোগ ॥ দশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এ উপলক্ষে শনিবার জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাকক্ষে ইনভেন্টরি অব দ্য কালচারাল হেরিটেজ অব বাংলাদেশ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকা তৈরির জন্য দেশের কয়েকজন খ্যাতিমান লেখক, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সঙ্গীত শিল্পী, কারুশিল্পী, নৃত্যশিল্প, চারুশিল্পী উপস্থিত ছিলেন। এই বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, ড. এনামুল হক, রামেন্দু মজুমদার, মোবারক হোসেন খান, রুবি গজনবী, ওয়াদুদুল বারি চৌধুরী, ড. জিনাত মাহরুখ বানু, জনাব মফিদুল হক, সাইদুর রহমান বয়াতি, আহমেদ মাজহার, শাওন আকন্দ, সুশান্ত পাল, শম্ভু আচার্য, সুশান্ত বণিক, আশুতোষ পাল, মানিক সরকার, সৌভূত পাল, মনু ইসলাম, সাইমন হাসান, সাদাফ সাজ সিদ্দিকী, ড. ফিরোজ মাহমুদ প্রমুখ। আমন্ত্রিত অতিথিদের পাশাপাশি জাদুঘরের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। গোলটেবিল বৈঠকটি পরিচালনা করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।

বিসমিল্লাহ খানকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী ॥ ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। সানাইকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বাদনের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে ওস্তাদ উপাধিতে ভূষিত হন এই অমর শিল্পী। আট দশকের বেশি সময় ধরে অনবদ্য সানাই বাদনে তিনি মুগ্ধ করেছেন ভারতবর্ষসহ বিশ্বের কোটি দর্শকের হৃদয়। ভারতের বিখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ তার জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র ‘মিটিং অব মাইলস্টোন-ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁন’। বাংলাদেশ প্রামাণ্যচিত্র পর্ষদের নিয়মিত প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে প্রামাণ্যচিত্রটি শনিবার বিকেলে শাহবাগের সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের সেমিনার কক্ষে প্রদর্শিত হয়। প্রদর্শনী শেষে তথ্যচিত্রটি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচিত সংবাদ